জীবনানন্দ আসলে একা মানুষের গল্প লিখে গেছেন। তা কখনও কবিতায় তো কখনও উপন্যাসে। ঠিক ব্যোদলেয়র বা দস্তয়ভস্কির মতই যারা লোকসংখ্যা যেন, কোনও আলাদা নাম পর্যন্ত নেই। নিজের সাথে নিজেরই দৈনন্দিন সংগ্রামের জীবন নামক এই সার্কাসকে দূর থেকে বাঁকা হাসি নিয়ে দেখে যাওয়াই যেন বা তাঁদের কাজ, এমনই জীবনানন্দের চরিত্ররা। তাদের মধ্যে অন্যতম মাল্যবানকে নিয়ে আলোচনায় প্রত্যূষা পান।

কলেজ স্কোয়ারের বসন্তে বইমেলায়, দে’জের স্টলের এক নির্জন কোণে হঠাৎ চোখে পড়ে যায় – ‘মাল্যবান’-এর সঙ্গে আমার আলাপ ঠিক এভাবেই। মেলার ভিড়ে, ধুলোমাখা বিকেলের শেষ আলোয় আমার হাতে উঠে আসে সুন্দর সবুজ রঙে মোড়া সংস্করণটি।
আমরা সাধারণত জীবনানন্দ দাশকে কবি হিসেবেই চিনি। ‘বনলতা সেন’ বা ‘রূপসী বাংলা’র কবি। তবে, বাঙালি তাঁকে এইসব কবিতাকে ঘিরে আপাত সুন্দরের কবি ভাবলেও তিনি কিন্তু বিপদজনক, ভয়াবহ। চোরাগোপ্তা খুনের মতই বিধ্বংসী। সেটা তাঁকে বারবার পড়লেই বোঝা যায়। তাঁর গদ্যের জগৎও সমান গভীর ও রহস্যময়। আর ‘মাল্যবান’ সেই গদ্যজগতের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ, সবচেয়ে অন্তর্মুখী সৃষ্টি। এখানে বড় কোনও ঘটনা নেই, নেই নাটকীয় মোড়। তবু বইটা পড়তে পড়তে এক ধরনের অদ্ভুত বিষণ্ণতা চারপাশে জমতে থাকে। যেন শীতের বিকেলে কলকাতার কোনও পুরনো ঘরে বসে আছি, বাইরে আলো কমে আসছে, আর ভিতরে একজন মানুষ নিজের জীবনটার সঙ্গেই অপরিচিত হয়ে উঠছে। প্রত্যেক পাতায় প্রকট একাকীত্বের আর্তনাদ, দাম্পত্যের ক্লান্তি আর শহুরে জীবনের নিঃশব্দ বিষণ্ণতা।
মজার ব্যাপার হল, এই উপন্যাসের অনেক অনুভূতিই আজকের সময়ে অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক। আজ আমরা প্রায়ই ‘অ্যালিয়েনেশন’, ‘আইসোলেশন’ বা ‘আরবান লোনলিনেস’ এসব শব্দ ব্যবহার করি। জীবনানন্দ অনেক আগেই সেই অভিজ্ঞতা লিখে ফেলেছিলেন। মাল্যবান যেন আধুনিক শহুরে মানুষের এক পূর্বসূরি, যে মানুষের ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। তাই আজকের দ্রুতগতির সময়ে এই উপন্যাস পড়া আরও জরুরি বলে মনে হয়। কারণ মাল্যবান আধুনিক শহুরে জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে আর অবক্ষয়কে চিনতে শেখায়।
উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে মাল্যবান নামে এক চরিত্র। সে চাকরি করে, সংসার করে, স্ত্রী উৎপলার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকে, কিন্তু যেন কোথাও কোন সংযোগ নেই। এই বিচ্ছিন্নতাই এ লেখার আসল চরিত্র। মাল্যবান নিজের জীবনকে বাইরে থেকে দেখতে থাকে, যেন সে নিজের অস্তিত্বের সঙ্গেও পুরোপুরি জড়িত নয়। চারপাশের মানুষ, সমাজ, দাম্পত্য, সবকিছু থেকেই সে একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। মাল্যবানের ভাবনা, তার অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ, তার ক্লান্তি— এগুলোই উপন্যাসের পট পরবর্তন করতে থাকে।
উপন্যাসের ভাষাতেও জীবনানন্দের গদ্যে একটা কাব্য আছে, কিন্তু সেটা কখনও সাজানো নয়। তাঁর বাক্য অনেক সময় অসম্পূর্ণ মনে হয়, বাস্তব আর স্মৃতির মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে আছি। এই ভাষা সহজ নয়, কিন্তু একবার তার ছন্দে ঢুকে পড়তে পারলে সেটা গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে।
অনেকে বলেন, জীবনানন্দ তাঁর উপন্যাসগুলোতে আরও নির্ভীক, আরও ব্যক্তিগত। আর ‘মাল্যবান’ সেই ব্যক্তিগত অন্ধকারেরই এক নির্মম দলিল, জীবনানন্দের নিজের জীবনবোধের প্রতিফলন। সেই নিঃসঙ্গতা, সমাজের সঙ্গে অসামঞ্জস্য, আর একাকীত্ব – সবই যেন লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। যদিও উপন্যাসকে সরাসরি আত্মজীবনী বলা যাবে না, তবু মাল্যবানের মধ্যে জীবনানন্দের ছায়া খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।
লেখক এবং অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় জানালেন, ‘মাল্যবান’-এর গোত্র বা ‘জঁরা’ নির্ধারণ করা কার্যত অসম্ভব। জীবনানন্দের সমসাময়িক তিন বন্দ্যোপাধ্যায় – মানিক, বিভূতি বা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার ধারার মধ্যে ‘মাল্যবান’ যেন অন্য কোথাও থেকে এসে পড়া কোনও প্রক্ষিপ্ত নক্ষত্রের টুকরো… তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র শশীর সঙ্গে মাল্যবানের একটা সাদৃশ্য খুঁজে পান সঞ্জয়বাবু, যদিও সেটাও যেন এক উল্টো মেরুর সম্পর্ক। শশী একজন বুদ্ধিজীবী, আমাদের কলকাতা শহরের হ্যামলেট যেন। কিন্তু মাল্যবান তাও নয়। মাল্যবান আরও নির্জন, আরও নিঃসঙ্গ, আরও পরিত্রাণহীন। সে যেন এক মৃত্যু-পথযাত্রী মানুষ, যার হাতে রয়েছে শুধু যন্ত্রণার ইস্তাহার।
মাল্যবান চরিত্রটি অনামী, পতিত মানুষের কথা বলে, এমনটাই মনে করেন সঞ্জয়বাবু। কলকাতার সেই অনামী রহস্যের সাক্ষর ‘মাল্যবান’ উপন্যাসটি, যার ভিতর থেকে উঠে আসে ঈশ্বর-পরিত্যক্ত, জীর্ণ নর-নারীর এক ছাড়পত্র। যে মানুষের কোনও ঈশ্বর নেই, যার জীবনে আশ্বাসের কোনও কোমল বাতাস নেই, যার হাতে শুধু কর্তৃত্বের সঙ্গে ফলহীন সংঘর্ষ – সে আর কী করতে পারে? ঠিক যেমন ফিওদর দস্তয়েভস্কি’র অনামী মানুষ নেভস্কি প্রসপেক্ট ধরে হাঁটত, তেমনই কেউ ক্লান্ত হয়ে হেঁটে যায় হ্যারিসন রোড দিয়ে। কিন্তু মাল্যবানের ট্র্যাজেডিরও কোনও মহিমা নেই।
‘মাল্যবান’ শেষ করার পর মনে থাকে না তাই কোনও বড় প্লট বা নাটকীয় দৃশ্য। মনে থাকে একটা আবহ। একটা ধূসর বিকেল। একটা মানুষ, যে নিজের জীবনটার দিকেই যেন দূর থেকে তাকিয়ে আছে। আর সেই তাকিয়ে থাকার মধ্যেই জীবনানন্দ বাংলা সাহিত্যে ব্যক্ত করেছেন জীবনের নিঃশব্দ ভাঙন, একাকীত্বের নিজস্ব ভাষা।
