প্রথম পর্ব
ছুটিতে উটি!
লেখাটা এভাবেই শুরু করব ভেবেছিলাম। তারপর আমার ক্লাস থ্রি-তে পড়া ভাইজি মনে করালো, ‘ছুটি কোথায়?’ উটিতে এসেও তো নাগাড়ে অনলাইনে কাজ করেই চলেছি। কাজেই, ‘ছুটি নেই, তবু উটি’ এরকম একটা নাম বেশি খাবে..তাহলে এ নামেই চলুন শুরু হোক, এ ট্রাভেলগ…

ওদিকে, সদ্য ভোট শেষ হওয়ার বাওয়ালের নানা খবর আর ভ্যাপসা গরমের কলকাতা পেরিয়ে যখন ব্যাঙ্গালোরে নামলাম, তখনও গরম বেশ চ্যাটচ্যাটেই। তারপর, সারাদিনের জার্নি উটির পথে, আগে থেকেই ঠিক। কিন্তু সে রাস্তা চলেছে তো চলেছেই…থামে আর না! ফিলস লাইক, মহাপ্রস্থানের পথে…
গাড়ির ভেতর এসি যে আছে, তা গাড়ির চালক বারবার বললেও, মোটে মালুম হচ্ছিল না…হাঁসফাস অবস্থায়, যখন ধরেই নিয়েছি, এই রোড ফিল্মে ‘দি এন্ড’ হবে না, তখনই, বিকেল নামল। রোদ পড়ল। তারপর অদ্ভুত এক হাওয়া দিল। সামনে বীরাপ্পানের জঙ্গল। বহু ছোটবেলায় একবার এসেছিলাম। সে কি ভয় বাপ রে! অদ্ভুত এক বাসযাত্রা ছিল সেটাও..

আজ অবশ্য বীরাপ্পানরা নেই। দুনিয়া যত সাফ হয়েছে এ ক’বছরে, তত বীরাপ্পানরা সভ্য ভদ্র পোশাকেই ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্রমে। তাঁদের তাই আর লুকোনোর জন্য এসব জঙ্গল দরকার নেই। চকচকে সভ্যতাই যথেষ্ট। সুভদ্র লুম্পেন সব। স্যুট টাইতে সেজেই দমাদম লটকেলট সভ্যতা ভ্যানিশ করে দিচ্ছে,অহো!
তো, জঙ্গলে তখন অন্ধকার। সন্ধ্যা নেমেছে। বেশ শীত শীত। চন্দন কাঠের গন্ধ আর উঁচু সব পাইন গাছ সারি সারি। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। শুনছি নাকি, আরও ঘন্টা তিনেক অন্তত লাগবেই হোটেল পৌঁছতে..শরীর ফুল কেস খেয়ে গিয়েছে নানা ব্যথায়।… হাত পা নড়ছে না, পেটে ছুঁচোরা ককরোচ জনতা পার্টি… এবারে পাহাড় বেয়ে গাড়ি পাকদণ্ডী পেরিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। ঠান্ডাও বাড়ল পাল্লা দিয়ে। আমাদের গন্তব্য উটির বিখ্যাত হোটেল মিঠুন চক্রবর্তীর ‘মোনার্ক’।
অবশেষে, রাত বাড়ল আরও। পৌঁছলাম মিঠুনের হোটেল। রাত ১১টার পাহাড়ি ঘন অন্ধকারেও আলো জ্বলে আছে বারান্দায়। দেখে বোঝা যায়, বছর চল্লিশ অন্তত বয়েস হবেই এই হোটেলের। আমরা নামতেই যিনি ব্যাগ ধরতে এগিয়ে এলেন, তিনিও এই হোটেলে কাজ পেয়েছেন মিঠুনের বদান্যতায়। তিনিও বাঙালি। এরপর থেকে, ক্রমেই টের পেতে থাকলাম, এ হোটেলে বাঙালি কর্মীরাই সর্বত্র। এবং, তাঁদের সবাইকেই কাজে নিয়ে এসে প্রাণে বাঁচিয়েছেন, সবার ‘মিঠুনদা’…যেন সবার অলিখিত মসিহা তিনি…

রাতে সেদিন আর দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না। পরের দিন ভোর ভোর উঠে লনে গিয়ে বসলাম। তখনও রোদ ওঠেনি। সামনে টিম টিম করে কুয়াশা পেরিয়ে দেখা যাচ্ছে, উটি শহর…পেছনে পাহাড়, ভাবছিলাম, এখানেই একদিন উত্তর কলকাতা থেকে আসা এক নকশাল যুবক যে বম্বেতে গিয়ে প্রবল খেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে তারপর এই হোটেল বানান! জার্নিটা ঠিক কতটা কঠিন ছিল তাঁর? কতটা পথ পেরোলে তবে মিঠুন হওয়া যায়…
ভাবছিলাম, এ যদি স্বপ্ন না হয়, স্বপ্ন তবে কি! খুবই অদ্ভুত, যেমন এই দক্ষিণ ভারতকে অন্যভাবে চেতনার আলো দিয়ে তুলে এনে ছিলেন একদা স্বামী বিবেকানন্দ, তাই আজও এখানকার অলগলিতে তাঁরও স্ট্যাচু…বাঙালিকে এসব মিলে এখনও এরা অন্য চোখে দেখে…
তো, নানা মানুষ এখানে তাঁদের মনে এভাবেই নানা ‘মিঠুন’দাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আলাপ হল তাঁদের সাথে। বাদকুল্লা থেকে এসে কেউ কুড়ি বছর সেলুন চালাচ্ছেন তো কেউ আবার বেহালার বাড়ি ছেড়ে পড়ে আছেন বারো বছর। সবাই নানাভাবে মিঠুনদার কাছে kritogyo…বছরে কয়েকবার তাই ‘মহাগুরু’ এলে এখানে, ঘিরে বসেন সবাই। তারপর চলে অনন্ত আড্ডা। চকিতে বেরিয়ে আসেন মুম্বইয়ের সুপারস্টারের আড়ালে আদত উত্তর কলকাতা সেই গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী… রাখঢাক থাকে না কথার…

উটি পাহাড় হিসেবে কিছুটা অবহেলিত। এত চার্চ, এত ফুল, এত গাছপালা দার্জিলিং বা মুসৌরি পাহাড়ে আরও অনেক যত্নের কিন্তু এখানে কিছুটা গা-ছাড়া সবই। তবে নয়া সরকার বেশ কড়া। তাই নেশার ব্যপারে কড়াকড়ি লেগেই দোকানে গুটখা ব্যানড। সিগারেটও কম মেলে। মদেরও তেমন প্রকাশ্য চল দেখলাম না।
উটি এসছি ক’দিন হয়ে গেল। পাহাড় মন শান্ত করে। এখন খানিক শান্তও লাগছে তাই। আমার কলকাতার কথা মনে পড়ছে। প্রিয় রাস্তার মোড়, প্রিয় মুখ সব মনে পড়ছে…এখান থেকে ক’দিন পর মালদ্বীপ যাব। বাকি গল্প সেই জনবচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকেই হবে…ততক্ষণ ব্রেক…
চলবে…