রাত গভীর। গ্রামের পথ ধরে ফিরছেন এক পথিক। দূরে তালগাছের মাথা দুলছে, বাঁশবনের ভিতর থেকে হাওয়ার শব্দ। হঠাৎ যেন কেউ ডাকল। তিনি ফিরে তাকালেন। কেউ নেই। কিন্তু সেই মুহূর্তেই বাঙালির বহু শতাব্দীর পুরোনো এক কল্পনার জগৎ দরজা খুলে দেয়। সেই জগতের বাসিন্দারা মানুষ নয়, আবার পুরোপুরি অলীকও নয়। তারা ভূত।
ভূত আমাদের লোকবিশ্বাস, সাহিত্য, শিল্প, নাটক, সিনেমা, এমনকি দৈনন্দিন ভাষারও অংশ। ‘ভূতের মুখে রামনাম’, ‘ভূতের বেগার’, ‘ভূত ও ভবিষ্যৎ’ – এমন কত প্রবাদ-প্রবচনেই তো তারা দিব্যি ঘুরে বেড়ায়। আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্বের বহু সংস্কৃতিতে ভূতের ধারণা থাকলেও বাঙালির ভূতেরা যেন একেবারেই নিজেদের মতো। তারা ভয় দেখায়, আবার গল্পও শোনায়; কখনও প্রতিশোধ নেয়, কখনও হাসায়, কখনও বা মানুষের একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
লোকবিশ্বাসে ভূতের উৎপত্তি সাধারণত অপঘাতে মৃত্যু, অসম্পূর্ণ ইচ্ছা বা অকালপ্রয়াণের সঙ্গে যুক্ত। মৃত্যুর পর আত্মার মুক্তি না হলে সে প্রেত বা ভূত হয়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়, এমন ধারণা বহুদিন ধরেই প্রচলিত। বাংলার নদী, বিল, শ্মশান, বটগাছ, তালগাছ, বাঁশবন কিংবা জনশূন্য রাস্তা তাই লোককথায় হয়ে উঠেছে ভূতেদের প্রিয় আস্তানা।
এই লোকবিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য ভূতের চরিত্র। তাদের প্রত্যেকেরই যেন আলাদা পরিচয়, আলাদা স্বভাব।
সবচেয়ে পরিচিত সম্ভবত শাঁকচুন্নি – বিবাহিত অবস্থায় মৃত নারীর আত্মা, যাকে শাঁখা-পলা ও লাল শাড়িতে কল্পনা করা হয়। আবার পেত্নী সাধারণত অবিবাহিত বা অকালমৃত নারীর আত্মা। ব্রহ্মদৈত্য কিন্তু ভয়ের থেকেও বেশি সম্মান আদায় করে। বিশ্বাস করা হয় তিনি ব্রাহ্মণের আত্মা, বিশালদেহী, গাছের মাথায় থাকেন, কিন্তু অনেক সময় মানুষের উপকারও করেন। বাংলার জলাভূমি ও নদীঘেরা ভূগোল তৈরি করেছে মেছো ভূতের মতো চরিত্র, যে নাকি মাছ চুরি করতে ভালোবাসে। আবার নিশি গভীর রাতে পরিচিত মানুষের গলায় নাম ধরে ডাকে। লোকবিশ্বাস বলে, সেই ডাকে সাড়া দেওয়া বিপজ্জনক। মামদো ভূত, স্কন্ধকাটা, আলেয়া, কানাভুলো প্রত্যেকেই বাংলার লোকজ কল্পনার স্বতন্ত্র সৃষ্টি। বিশেষ করে আলেয়া নিয়ে আজ বিজ্ঞানীরা জলাভূমির গ্যাসের ব্যাখ্যা দিলেও, গ্রামের মানুষের গল্পে সেই রহস্যময় আলো এখনও পথভোলা মানুষের বিভীষিকা।
এই ভূতদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তারা আসলে সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। নারী-পুরুষ, জাতপাত, ধর্ম, পেশা সব কিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে ভূতের জগতে।
অবশ্য বাঙালির ভূতেরা কেবল লোককথাতেই আটকে থাকেনি। বাংলা সাহিত্যের বড় অংশ জুড়েই তাদের বিচরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘মণিহারা’ কিংবা ‘নিশীথে’ ভূত কখনও বাস্তব, কখনও মানুষের মনস্তত্ত্বের প্রতীক। বিভূতিভূষণের গল্পে অরণ্য, নদী আর গ্রামবাংলার রহস্যময় প্রকৃতি ভূতের উপস্থিতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ও বিভূতিভূষণ দুজনেই পরলোকে বিশ্বাসী ছিলেন, এবং নিয়মিত পরলোকচর্চা করতেন।
সত্যজিত রায় ভূতের গল্পকে এক নতুন মাত্রা দেন। তাঁর ‘তারিণীখুড়ো’, ‘অনাথবাবুর ভয়’, ‘ব্রাউন সাহেবের বাড়ি’ কিংবা ‘খগম’-এর মতো গল্পে ভয়, রহস্য ও রসবোধ একসঙ্গে মিশে যায়। আবার তাঁরই চলচ্চিত্র ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর ভূতের রাজা তো বাংলা জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক অবিস্মরণীয় চরিত্র।
শিশুসাহিত্যেও ভূতেরা ভয়ের চেয়ে বেশি বন্ধু। সুকুমার রায়ের বিখ্যাত মা ভূতের আদরের ঠেলায় অতিষ্ট বাচ্চা ভূত, লীলা মজুমদার, শিবরাম চক্রবর্তী, কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্রর লেখায় ভূতেরা হাস্যরসের উৎস। ফলে বাঙালি ছোটবেলা থেকেই ভূতকে যেমন ভয় পেতে শেখে, তেমনই তাদের সঙ্গে হাসতেও শেখে।
বাংলা সিনেমা ও টেলিভিশনও এই ঐতিহ্যকে আরও জনপ্রিয় করেছে। ভৌতিক ছবির পাশাপাশি হাসির ভূতের গল্পও সমান জনপ্রিয়। অনীক দত্তর ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ যার অন্যতম উদাহরণ। দুর্গাপুজোর শারদীয়া সংখ্যায় নতুন ভূতের গল্প প্রকাশ যেন এখনও এক অলিখিত নিয়ম। গ্রামের উঠোন থেকে শহরের অ্যাপার্টমেন্ট, ভূতের গল্প শোনার আনন্দ এখনও ফুরোয়নি।
মজার বিষয়, আধুনিক বিজ্ঞান, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও ভূতেরা হারিয়ে যায়নি। বরং তাদের বাসস্থান বদলেছে। একসময় তারা থাকত বটগাছে, আজ তারা পরিত্যক্ত হাসপাতাল, পুরোনো জমিদারবাড়ি, মেট্রো স্টেশন কিংবা শহুরে কিংবদন্তির অন্ধকার করিডরে ঘুরে বেড়ায়। ইউটিউব, পডকাস্ট আর সামাজিক মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম আবার নতুন করে আবিষ্কার করছে পুরোনো ভূতের গল্প।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিন্তু মনস্তত্ত্বের দিক থেকে দেখলে ভূতেরা বাস্তবের চেয়েও বাস্তব। তারা মানুষের অজানাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা, মৃত্যু নিয়ে কৌতূহল, অপরাধবোধ, স্মৃতি, ভালোবাসা আর ভয়ের সম্মিলিত রূপ। ভূতের গল্প আদতে মানুষেরই গল্প। তাই আজও বর্ষার রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে, কিংবা শীতের সন্ধ্যায় কোনও পুরোনো বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প শুরু হয় একই প্রশ্ন দিয়ে – ‘ভূতে বিশ্বাস করেন?’