(প্রথম পর্ব)

ষোলোর প্রশ্ন। পাতলা একটা কবিতার বই। কবি শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন সত্তর দশকে। লিখেছিলেন জীবনের লড়াইয়ের কথা। টালমাটাল রাজনৈতিক দিনরাতের কথা। লিখেছিলেন পিকনিক পার্ক নামের এক পাড়া, চারপাশের মানুষ-সমাজ, ভবানীপুরের দিদির বাড়ির যৌথ পরিবার, পূর্ণিমা মুখোপাধ্যায় নামের এক গানের যুবতী ও তাঁর গানের খাতার গল্প আর দারিদ্রর কথা। জীবনের লড়াই লড়তে লড়তে এরপর কিছু নাটক লেখেন শ্যামল। কিছু বিচ্ছিন্ন কবিতা। তারপর অন্য পেশায় চলে যান। লেখালেখি থমকায় জীবনের চাপে। সুটকেসে বন্দি হয়ে পড়ে থাকে তাঁর সমস্ত লেখা।

আজ, বহু বছর পর, সে সব খাতা খুলে পড়তে গিয়ে পেলাম এভাবেই এক হারানো সময়কে। হারানো রোজনামচা। যা চাইলেই আর ধরা যাবে না। অসংখ্য জীবন্ত মুখ। অনেক অনেক হারিয়ে যাওয়া গল্প, দ্রোহ, হাসি, রাগ আর অভিমানকে…
আমার বয়স ভরা ষোলো
এই বয়েসেই কি শুকিয়ে গেছে
যৌবনের সেই সুন্দর কোষগুলি?
হয়ত তাই।
যখন আড়শিতে নিজেকে পরখ করি
দেখি চোখের দু পাশে কাজল জমেছে,
গাল ভাঙা-দেহের হাড় যায় গোনা
যেন পরিত্যক্ত হারমোনিয়ামের রিড ক’টা
আমি তো ওদেরই একজন,
বাড়ির পাশের অট্টালিকার
জীবদের তো এমন হয়নি…
বা,
ওরা ডাক ছাড়ে
লোহার গরাদের মাঝে যাদের বাস
ওরা ডাক ছাড়ে
গরাদের ফাঁক দিয়ে, ওরা বন্দী…

বন্দীত্ব দারিদ্র শ্যামলের কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। বোঝা যায়, সত্তরের পটভূমিকায় এক নিম্নবিত্ত পরিবারের যুবকের কথা। প্রসঙ্গ, নলশাল আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর তাঁকে জেলবন্দি হতে হয়। জেলের অত্যাচারও সহ্য করতে হয়। তাই এইসব কবিতায় বন্দিজীবনের অন্ধকার কেন ফিরে ফিরে আসে তার কিছুটা আঁচ মেলে।
শ্যামলের কবিতায় সাবান বা মৌমাছিদের প্রতিবাদের ধরণ পড়লে বোঝা যায়, এই কবিকে বারবার অনুপ্রাণিত করেছেম সুকান্ত ভট্টাচার্য। সুকান্ত স্মরণে একটি কবিতাও রয়েছে এ বইতে। সুকান্ত শ্রেণী বা ভেদাভেদের বিরুদ্ধে বাম আন্দোলনের কথাই নানাভাবে বলেছেন তাঁর সমস্ত লেখায়া। কাজেই সমাজ ও ব্যক্তির এই প্রতিবাদের ধ্বনি কাছাকাছি সময়ের অনুজ কবিকে অনুপ্রাণিত করবে তা স্বাভাবিক।

আগেই বলেছি, শ্যামলের কবিতা বা লেখালেখি কখনওই শুধু ব্যক্তির সুখ-দু:খের কথা না। বরং সমাজের নানা ঘটনাকে ঘিরে প্রতিবাদও। নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় সেটাই স্বাভাবিক। যেখানে কবিকে বা তাঁর পরিবারের অন্য বড়ভাইকে বারবার নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে। ভরা যৌবনে নেমে এসেছে কারাবরণ তথা দারিদ্রের হাহাকার। তাই মিঠু বা জয়শ্রী নামের মেয়েদের ‘লগ্নভ্রষ্টা’ বা ‘বেশ্যা’ উপাধি দিতে দেখা যায় সমাজকে তাঁর কবিতায়।
দেনা পাওনায় বর বেঁকেছে
লগ্ন বয়ে যায় তবু বরের নেই পাত্তা
সময় মতই গাড়ি বয়ে নিয়ে এলো এক বার্তা
দেনার শিকার মিঠু সেদিন হল লগ্নভ্রষ্টা
বা
নিটোল স্তন, বিউটি স্পট, প্রশস্ত বুক
যা আকর্ষণ করেছিল অনেক পুরুষকেই..
ষোলোর যৌবন রাঙা হতেই
ছুটে এলো এক ধনীর কুমার, ছিল তারও যৌবন
শুরুতে সে পেয়েছিল নারীর দেহ…
যে উপাধিবজন্মেই কেউ পায় না
সে উপাধি জয়শ্রী পেয়েছে, ‘বেশ্যা’…

এইসব কবিতা পড়লে একটা সমাজকে দেখা যায়। যে সমাজে অজস্র সংস্কার। অন্ধকার। দারিদ্র। আবার একইসাথে সেখানে প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এসে থাবা বসাচ্ছে সমাজের নানা স্তরে।
তাই কম্বোডিয়া বা চীনের বিপ্লবের কথাও আসছে। মাত্র ষোলো বছর বয়েসে এসব লিখছেন শ্যামল। বোঝা যাচ্ছে এ থেকে তাঁর অন্তর্লোক। বোঝা যাচ্ছে সেই দশকও বারবার জেগে উঠছে তাঁর চেতনায় সত্তর হয়ে…
শ্যামলের যে পাড়া অর্থাৎ পিকনিক পার্ক, কলোনি বাজার, তাও এক উদ্বাস্তু পাড়া। স্বাধীনতার সময়ে একদল মানুষ আসেন এখানে। এই এলাকা হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ভাবে উন্নত ধীরে ধীরে। এই পিকনিক পার্কেই থাকতেন শ্যামলের স্ত্রী পূর্ণিমা মুখোপাধ্যায়। তাঁর রবীন্দ্রগানও সমকালে সাড়া ফেলেছিল। তাঁর হাতেই শ্যামলের কবিতাগুলো একাধিক ডাইরিতে লিখে রাখা। শ্যামলের নাটক ‘আমি আদালত থেকে বলছি’ ও অন্যান্য নাটকও একইভাবে সুন্দর হাতের লেখায় ড্রাফট করা একাধিক খাতায়, পূর্ণিমার হাতের লেখাতেই।

আর হিসেব সেদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হল
কোনও একটা কাজে,
ফেরার পথে দেখতে পেলাম,
এক অন্ধ বসে আছে,
আমারই পথের মাঝে।
শ্যামলের কবিতায় খুব রাবীন্দ্রিকতা নেই। এই সে অন্ধ ভিখিরির কথা এলো, তা থেকে তো রবীন্দ্রনাথের বাউল দর্শনের দিকেও কবিতাটা চলে যেতে পারত? শ্যামলের প্রজন্ম, অর্থাৎ সত্তরে রবীন্দ্রনাথ চর্চাও চলত পাড়ায় পাড়ায়। কিন্তু তার বদলে শ্যামল বেছে নিচ্ছেন সুকান্ত কিংবা নজরুলের রাস্তা। কারণ তাঁর কঠিন বাস্তবের জীবনে সেভাবে ‘কাব্যি’ করার ফুরসত যে ছিল না, তা আগেই বলা হয়েছে।

আর এই বাস্তবের হাত ধরেই সমাজের নৈতিকতা খুঁজে চলেছেন শ্যামল। এক সদ্য যুবকের কবিতায় তো সমাজের নিয়ম ভাঙার কথা থাকবে। বদলে এত নৈতিকতার কথা কে? তাঁর সমকাল তো বরং হাংরি বা নকশাল আন্দোলনের হাত ধরে সমস্ত তথাকথিত ‘সভ্যতা’কে প্রশ্ন করছে। আন্তর্জাতিক পটভূমিকায় ভিয়েতাম যুদ্ধ, ফ্রান্স-৬৮, হিপি আন্দোলন থেকে চারু মজুমদার, বিটলস, বাদল সরকারের থিয়েটার, জরুরি অবস্থা, যৌথ পরিবার ভেঙে পড়া, ডিভোর্স বাড়তে থাকা মিলিয়ে যে সমাজটা গড়ে উঠছে ক্রমশ, তা থেকে কিছুটা দূরেই যেন-বা এই যুবকের কবিতাগুলি। বরং এই যুবক নিজের মত করে লিখে চলেছেন নিজের দারিদ্রময় অনিশ্চিত জীবনের সুখ দু:খের কথা, পাশের বাড়ির কান্নার কথা, নিজের স্বপ্ন এবং স্বপ্নের ভঙ্গের কথাও। অবশ্য কখনও সে সুবাদেই এসে গেছে ভিয়েতনাম বা স্পেনের কথাও।

এই তো সেদিন পথ চলেছ
একমনে একা
হঠাৎ চমকে গিয়ে থমমে গেলাম
দেওয়ালের গায়ে পোস্টার দেখে
কালো কালিতে লেখা হয়েছে পোস্টারটা
মন দিয়ে পড়লাম কি লেখা তাতে
দেখলাম এ দেশ আহ্বান করেছে
বিপ্লবী বুড়োকে।…
এই বিপ্লবী বুড়ো অনেকদিন পর বেরিয়েছে ভ্রমণে। সে অন্ধকার প্রদেশে গিয়ে আলো দেবে। এই যে সমাজের জন্য মঙ্গলকামনা, তা কখনও শ্যামলের কবিতায় শিক্ষকের প্রতি তো কখনও বিপ্লবীর বন্দুককে উৎসর্গ করে প্রকাশিত হয়েছে। কখনও নিজের মা, বা প্রেম বা দাদার প্রতিও লিখেছেন শ্যামল। প্রসঙ্গত মনে পড়ে যেতে পারে, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কথা। যেখানে সমাজের এই অন্যায় অবিচার দারিদ্রই বারবার জায়গা পেয়েছে।

দারিদ্র আর লড়াইয়ের কথা, একটা অসমান সমাজের কথা ফিরে ফিরে আসে শ্যামলের লেখায়।
কখনও তা আসে নাটকে, কখনও কাব্যনাট্যে, কখনও কবিতায়। বোঝা যায়, নানা মাধ্যমে নিজের বার্তা জানাতে চাইছেন তিনি। এবং সে বার্তা শুধু নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার নয়, বরং বারেবারেই সমাজের কথা আসছে সেখানে। এখানেই শ্যামলের কাব্যভাষা অজান্তেই হাত রাখে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা মনিভূষণের কাব্যভাষায়, যা বলে সমাজের দরকারেই কবিতা লেখা হবে। কবিতা কখনওই কোনও পরিস্থিতে নিরালম্বু বায়ুভূত হতে পারে না।
শ্যামলের কবিতায় বিপ্লব, দারিদ্র শব্দগুলো ফিরে ফিরে আসে। সমস্ত অস্তিত্ব দিয়েই শ্যামল সে সময়ের কবিতার সত্য।