
কলকাতার বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে শেষ সূর্যের আলো অদৃশ্য কোণগুলোতে জমা হতে থাকে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এই শহরে কেউ যেন কখনও কোথাও পৌঁছয় না… সময় আটকে থাকে এখানে। রাস্তার কোণে আটকে থাকে হাজার বছরের স্মৃতি। তিন শতকের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলা এই শহর যেন সমকালের প্রতি কিছুটা উদাসীন।
সন্ধ্যায় জ্বলে জানালাগুলো এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, আশ্বস্ত করে আমাকে। এই আশ্বাস শহরের হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। কলকাতা অজান্তেই যেন একটা খোলা সংগ্রহশালা যেখানে রোজকার ইতিহাস কিছুটা এলোমেলোভাবে জড়িয়ে থাকে। অতীত এখানে অজান্তেই মিশে থাকে প্রত্যেক সকাল সন্ধ্যায়। প্রবীণ নাগরিক মুখ যেমন অনায়াসে মিশে থাকে নবীন মুখে…এভাবেই সেজে ওঠে মিছিলের মুখ…
কলকাতা যেন একটা বিশাল বই। আর এই শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটার সময় মনে হত, যেন সেই বইটা পড়ছি ধীরে ধীরে, সে বইয়ের নাম হয়ত প্রতিরোধ, ছুটন্ত ভিড় বাসের ফুটবোর্ডে হাতে ভারী বোঝা নিয়ে সেই লড়াই করতে করতেই কেউ হাতলটা ধরে ফেলে, কেউ ফাঁকা পকেট নিয়েও ময়দানে বিকেলবেলা আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখতে পারে…কলকাতার সন্ধ্যার রাস্তায় তাই হাঁটতে হাঁটতে আমার ইতালির নেপলসের কথা মনে পড়ত, যেখানে সরু গলিপথগুলো এভাবেই মানুষকে আপন করে নেয়।
আমি এই দুই শহরকেই ভালোবাসি। দুটো শহরই যেন রঙের ক্যানভাস, যেখানে মানুষের উচ্ছ্বাস আনন্দ যেন এক চিত্রশিল্পীর প্যালেট, যে শক্তিশালী তুলির আঁচড়ে মানুষের অসংখ্য পথকে এক করে দেয়, নদীর ঘাটকে মিলিয়ে দেয় বাজারের ভিড়ের সাথে।
তবে, একসময় সেই ছবিতেও ফাটল ধরে। টিমটিমে আলোর নীচে দাঁড়ালেই যখন বৈদ্যুতিক তারের গুঞ্জন মিশে যায় দূরের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে, তখন বোঝা যায় ওই তুলির টানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পুরোনো দেওয়ালের ফাটল, আর সেই ফাটলের ফাঁকের না বলা কথাও…
কলকাতার গঙ্গাও আমাকে টানে। টানে স্টিমারঘাটের ভোঁ-ও…বাগবাজার ঘাট, শোভাবাজার ঘাট, আহিরিটোলা ঘাট যেন একেকটা স্থির হয়ে থাকা সময়। যেন ধার বেয়ে নদী মলিনভাবে বয়ে যায়। চুপ করে ঘাটে বসে থেকেছি আমিও, কোথা থেকে যে পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ে যেত অজান্তেই।
দূরে, রাতের গভীরে, ট্রামের ট্রিং ট্রিং ট্রিং আজও মনে পড়ে, যেন ঘুমপাড়ানি গান। আমার দূর বাড়ির কথা মনে পড়ত, মনে পড়ত মা বাবার কথা। যেন ট্রামটা ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে শোনাতো গোটা কলকাতাটাকে… কত কত বাড়ির রান্নাঘর দেখা যেত আমার জানলা দিয়ে, সে সব জানলা বৃষ্টির এলে ভিজে যেত, সেই জলে মিশে যেত ল্যাম্পোস্টের হলুদ আলো, ভিজে যেত পুরোনো পুরোনো বাড়ির দেওয়াল। মাঝরাতে তারপর হালকা রেডিও চলতে চলতে থেমে যেত, থেমে যেত ঝড়জলও, আমিও কখন অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়তাম বুঝতামই না, হঠাৎ ভোরের আজান আর রাস্তার আওয়াজ বলত ভোর হয়ে গেছে, দিন শুরু হয়ে গেছে আমার প্রিয় শহর কলকাতায়।

অনুবাদে প্রত্যূষা পান