একসময় কমিকস মানেই ছিল সুপারহিরো। কেপ পরে কেউ উড়ে যাচ্ছে, কেউ পৃথিবীকে শয়তানের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে। মজার ছলেই যেন সময়ের কথা শুরুতে ধরে রাখতেন শিল্পীরা। ক্রমেই তা হয়ে উঠল আরও গভীর।
শিল্পীরা বুঝল ছবির ফ্রেম আর স্পিচ বাবলের ভিতরেও ইতিহাস লেখা যায়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা যায়, ব্যক্তিগত ক্ষতকে রাজনৈতিক করে তোলা যায়। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল গ্রাফিক নভেলের এক অন্য জগৎ।
আজকের পৃথিবীতে তাই গ্রাফিক নভেল শুধু সুপারহিরোর গল্প নয়। বর্তমানে তা সাহিত্য, সাংবাদিকতা, স্মৃতিকথা, রাজনীতির দলিল ও শিল্প-সহ সবকিছুরই এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। কখনও তা স্মৃতির আর্কাইভ, প্রতিবাদের পোস্টার, কখনও বা ব্যক্তিগত ডায়েরি। পুঁজিবাদ পরবর্তী সমাজের বিবর্তনের মুখোমুখি হয়ে হয়তো কিছু শিল্পীর মনে হয়েছে – কিছু গল্প কেবল লেখা যায় না, আঁকতেও হয়। আর সেই আঁকাগুলিই কখনও কখনও হতে উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর সাক্ষ্য।
গ্রাফিক নভেলের ইতিহাস যেন বদলে যাওয়া পৃথিবীর দলিল। ইউরোপের মধ্যযুগীয় চিত্রপাণ্ডুলিপি, এমনকি বায়ো ট্যাপেস্ট্রির মতো কাজেও ছবি ও লেখার মিশেলে গল্প বলা হত। পরে উনিশ শতকে রোডল্ফ টফার ধারাবাহিক ছবির মাধ্যমে আধুনিক কমিকসের ভাষা তৈরি করেন। অনেকেই তাঁকে আধুনিক কমিকসের জনক বলে মনে করেন।
তবে ‘গ্রাফিক নভেল’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অনেক পরে। সত্তরের দশকে আমেরিকায় মূলধারার কমিকসের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ ঘোষিত হয়। তার সূত্রেই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড কমিকস’র আন্দোলন যৌনতা, যুদ্ধ, মাদক, রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ – সব কিছু নিয়ে সরাসরি কথা বলতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম উইল এসনার। তাঁর ‘এ কন্ট্রাক্ট উইথ গড’ বইটিকে অনেকেই প্রথম আধুনিক আমেরিকান গ্রাফিক নভেল বলে মনে করেন। নিউ ইয়র্কের অভিবাসী ইহুদি জীবনের বিষণ্নতা, দারিদ্র্য এবং বিশ্বাসভঙ্গকে তিনি এমনভাবে এঁকেছিলেন, যা এর আগে কমিকসে দেখা যায়নি।

তারপর আশির দশকে গ্রাফিক নভেল যেন বিস্ফোরণের মতো বদলে দিল সাহিত্যজগৎ। আর্ট স্পেইগেলমানের ‘মাউস’ নাৎসি গণহত্যার ইতিহাসকে ইঁদুর ও বিড়ালের রূপকে বলেছিল। বইটি পুলিৎজার পায়। হঠাৎ পৃথিবী বুঝল, কমিকসও গুরুতর সাহিত্য হতে পারে। আর্ট তাঁর বাবার হলোকস্টের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করেছিলেন এক ভয়ংকর মানবিক দলিল হিসেবে। সেখানে ইহুদিরা ইঁদুর, নাৎসিরা বিড়াল। এই রূপক মানুষের বর্বরতাকে আরও নির্মম করে তোলে। ‘মাউস’ প্রমাণ করে দিল যে কমিকসও সাহিত্যের মত রাজনৈতিক এবং দার্শনিক হতে পারে।
মারজেন সাতরাপির ‘পারসিপোলিস’ ইসলামিক বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে বড় হয়ে ওঠা এক কিশোরীর গল্প। সেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আছে, ধর্মীয় মৌলবাদ আছে, একই সঙ্গে আছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। বইটি পশ্চিম বিশ্বের তৈরি মধ্যপ্রাচ্যের ধারণাকেও প্রশ্ন করে। মারজেন তাঁর শৈশবের ইরান, ইসলামিক বিপ্লব, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং নারীর স্বাধীনতা নিয়ে সাদা-কালো রেখাচিত্রে এঁকেছিলেন। ‘পারসিপোলিস’ ধর্মীয় মৌলবাদের স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে এক কিশোরীর বড় হওয়া গান শোনা, প্রেমে পড়া, বিদ্রোহ করার এমন এক গল্প, যেখানে বেঁচে থাকাই বিদ্রোহ হয়ে ওঠে।
জো সাকো গ্রাফিক নভেলকে সরাসরি সাংবাদিকতায় নিয়ে আসেন। ‘প্যালেস্টাইন’ বা ‘ফুটনোটস্ ইন গাজা’তে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের সাক্ষাৎকার এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে এঁকেছেন। অনেক পাঠকই তাঁকে কমিকস সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মনে করেন। সাংবাদিক হলেও তিনি সংবাদপত্রের মতো নির্লিপ্ত নয়, বরং অত্যন্ত মানবিক। জো সাকো দেখালেন, সাংবাদিকতাও ছবির মাধ্যমে করা যায়। রাষ্ট্র যেখানে ইতিহাস মুছে দেয়, গ্রাফিক নভেল সেখানে মুখগুলোকে আবার বাঁচিয়ে রাখে।

এই ধারার আর এক অনন্য শিল্পী শন ট্যানের ‘দ্য অ্যারাইভাল’ বইটিতে প্রায় কোনও শব্দই নেই। অভিবাসন, বিচ্ছিন্নতা এবং নতুন দেশে বেঁচে থাকার আতঙ্ককে তিনি এমনভাবে এঁকেছেন, যা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বইটির অদ্ভুত, স্বপ্নময় শহর আর অচেনা প্রাণীরা আসলে অভিবাসী মানুষের মানসিক অবস্থার প্রতীক। শন ট্যানের জগতে এই আপাত নীরবতাই প্রতিবাদ।
সাহিত্য যেখানে দীর্ঘ বর্ণনা দেয়, সিনেমা যেখানে বিপুল প্রযোজনার উপর দাঁড়ায়, সেখানে গ্রাফিক নভেল অনেক কম খরচে, অনেক বেশি ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলতে পারে। এটি একই সঙ্গে শিল্প এবং গল্প। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন থেকে নারীবাদ, লিঙ্গ-ধারণা থেকে বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলন, সর্বত্রই এই মাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ভি ফর ভেনডাটা’ বা ‘ফান হোম’-এর মতো কাজও দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই কখনও কীভাবে ব্যাপক রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে ওঠে। যেমন, জাপানে ‘বেয়ারফুট জেন’ হিরোশিমার স্মৃতি বহন করেছে। লাতিন আমেরিকাতেও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গ্রাফিক আখ্যান তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে একইভাবে যুদ্ধ ও নির্বাসনের গল্প এসেছে। এভাবেই ক্রমে আবিশ্ব ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাফিল নভেলের গল্পেরা।
ভারতেও এই ধারার আগমন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় কমিকস দীর্ঘদিন মূলত পৌরাণিক কাহিনি বা শিশুতোষ বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখানেও গ্রাফিক নভেল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করে। অনেকে অরিজিৎ সেনের ‘রিভার অফ স্টোরিজ’কে ভারতের প্রথম আধুনিক গ্রাফিক নভেল বলে মনে করেন। নব্বইয়ের দশকে প্রকাশিত এই কাজ নর্মদা আন্দোলন এবং উন্নয়নের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ ভারতীয় গ্রাফিক নভেলের জন্মই হয়েছিল এক প্রতিবাদের ভিতর দিয়ে।

তারপরেই আসে নবায়ন প্রকাশনীর যুগান্তকারী গ্রাফিক নভেল ‘ভীমায়াণ’। শিল্পী দুর্গভাই ভ্যম ও সুভাষ ভ্যম, এবং লেখক শ্রীবিদ্যা নটরাজন ও এস. আনন্দ মিলিতভাবে আম্বেদকরের জীবনকে একেবারে নতুন শিল্পভাষায় তুলে ধরেন। গোন্ড শিল্পরীতিকে ব্যবহার করে তৈরি এই বই শুধু জীবনী নয়, এটি ভারতীয় জাতপাত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক দৃশ্যমান প্রতিবাদ।

একইভাবে ‘কারি’ তে আম্রুতা পাটিল শহুরে এক নারীর নিঃসঙ্গতা, যৌনতা, সমকামীসত্তা কে জলরঙের সহজ টানে এঁকেছেন। আরও সাম্প্রতিক সময়ে জ্যোতিরাও ফুলের জীবন নিয়ে লেখা গ্রাফিক নভেল ‘আ গার্ডেনার ইন দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং জাতীপ্রথাকে নতুনভাবে পড়তে শেখায়। এভাবেই গ্রাফিক নভেল হয়ে ওঠে দলিত রাজনীতি, নারীবাদ এবং ইতিহাস পুনর্লিখনের মাধ্যম।

বাংলা বহুদিন ধরেই চিত্রকাহিনির সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু আমাদের কমিকস সংস্কৃতি দীর্ঘদিন শিশু-কিশোর জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও বাংলার ইতিহাসজুড়ে কালীঘাটের পট বা বটতলা বইতে চিত্র সংস্কৃতির এক ঐতিহ্য ছিলই। অবশ্যই নাম করা দরকার অবন ঠাকুর বা সুকুমার রায়ের লেখারও, যার সাথে সাথেই চলেছে অনিবার্য ছবি। পরবর্তীতে নাম করা উচিত নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা-ভোঁদা কিংবা নন্টে-ফন্টে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বড় করেছে। নারায়ণ দেবনাথ বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবন, স্কুল, পাড়া, দুষ্টুমি সবকিছুকেই এক নিজস্ব ছবির ভাষা দিয়েছিলেন। যদিও সেগুলি সরাসরি গ্রাফিক নভেল নয়, তবু বাংলার চিত্র-আখ্যান সংস্কৃতির ভিত তিনিই গড়ে দেন।
বাংলায় পূর্ণাঙ্গ গ্রাফিক নভেলের আলোচনা শুরু হয় অনেক পরে। ২০১৩ সালে চিত্রশিল্পী মধুজা মুখোপাধ্যায় নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘কাঙাল মালসাট’ গ্রাফিক নভেলে রাপান্তরিত করেন। অনেকেই মনে করেন, এটিই বাংলায় পূর্ণাঙ্গ গ্রাফিক নভেল। মধুজা মুখার্জি ট্রামলাইনকে জানালেন, সুমন মুখোপাধ্যায়ের সাথে কাঙাল মালসাটের চলচিত্র রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করার সময় থেকেই গ্রাফিক নভেলের ভাবনা। পরে নবারুণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ কথাবার্তার মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি তৈরি হয়। তাঁর মতে, নবারুণের লেখার প্রবাহে রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে হঠাৎ ইতিহাস এসে জুড়ে যায়। সাহিত্য এই লাফগুলো সহজে নিতে পারে, কিন্তু থিয়েটার বা সিনেমায় তা অনেক কঠিন। তাই গ্রাফিক নভেলের প্যানেলের গঠনই একাধিক সময়, দৃশ্য, এবং রাজনৈতিক স্তরকে পাশাপাশি দেখানো সম্ভব।

বাংলা গ্রাফিক নভেলের জগতে সম্বরণ দাস এক উজ্জল উপস্থিতি। ফিল্মমেকার ‘কিউ’র বিতর্কিত চলচ্চিত্র ‘গান্ডু’র ‘গান্ডুর মুন্ডু’ নামে গ্রাফিক নভেল রূপান্তর করেন তিনি। ছবির অন্ধকার, রাগ, যৌনতা, শহুরে হতাশা এবং বিদ্রোহকে আরও গভীর, আরও ঘোরাচ্ছন্নতার আকারে নিয়ে যায় এই গ্রাফিক নভেল। টাইপোগ্রাফি ও ডিজাইনেও ছিলেন কিউ নিজে। কলকাতা এখানে একটা ভাঙা, ঘামে ভেজা, কামনা আর রাগে ভর্তি এক শহর। যেন বটতলার পুরোনো ছাপা, পাঙ্ক মিউজিক আর জাপানি মাঙ্গা একসঙ্গে মিশে গেছে। কিউ-র কথায় এটি বটতলার পটচিত্রের এক আধুনিক, বিকৃত সংস্করণ।

‘অবতার’ গ্রাফিক নভেলে সম্বরণ দাসের তৈরি অবতার চরিত্রটি যেন সমসাময়িক সময়ের সঙ্কটের প্রতীক। ট্রামলাইনকে তিনি জানিয়েছেন, ‘অবতার’ ভাবনার শুরু ২০১৮-১৯ নাগাদ। সেই সময় তিনি অনুভব করছিলেন যে শুধুমাত্র ছবি আঁকা দিয়ে তিনি আর নিজের সময়কে ধরতে পারছেন না। বর্তমান মানুষকে কেমন দেখতে? কোন চেহারা আজকের ভাঙাচোরা, ডিজিটাল, বিচ্ছিন্ন সময়কে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে? এই প্রশ্নই তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। একদিন রাস্তায় একটি ওষুধের দোকানের সামনে সার্জিক্যাল বেল্টে বাঁধা একটি ম্যানিকুইন মূর্তি তাঁর হঠাৎ মনে হয় এটাই যেন সমসাময়িক মানুষের প্রতীক। ভিতরে ফাঁপা, অথচ মানুষের মতো দেখতে। একটি রিপিটেটিভ অবজেক্ট, যাকে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যায়। সম্বরণ জানালেন, বর্তমান ডিজিটাল সময়ে মানুষ নিজেই এক ধরনের পণ্যে পরিণত হয়েছে। সে এখন নিজেই পরিসংখ্যান, একটি সিরিয়াল নম্বর। কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা, মানুষের অসহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা তাঁর ভাবনাকে আরও তীব্র করে তোলে। এই কারণেই তিনি গ্রাফিক নভেলকে বেছে নেন।

এরপর , ‘লুবলুর পৃথিবী’তে চার্বাক দীপ্ত এক অন্যধরনের বাংলা ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ তৈরি করেছেন। লবলু আর তার বন্ধুবান্ধবদের আড্ডার মধ্যে ব্যক্ত হয় নতুন প্রজন্মের একাকীত্ব, শহুরে নিঃসঙ্গতা ও সমকালীন উদ্বেগ।
মধুজা মুখার্জির মতে, গ্রাফিক নভেল দীর্ঘদিন মূলধারার প্রকাশনা শিল্পের বাইরে তৈরি হয়েছে, যার ফলে এখানে সেন্সরশিপ এড়িয়ে অনেক কিছু বলা সম্ভব। তিনি মনে করেন, গ্রাফিক নভেলের ছোটবেলা থেকেই কমিকসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় থাকে। সেখান থেকেই ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ বোঝার একটা অভ্যাস তৈরি হয়। ইন্টারনেট ও সমাজমাধ্যমের দৌলতে ছবি ও টেক্সট মিলিয়ে দ্রুত অর্থ তৈরি করার যে ক্ষমতা, সেটাই নতুন প্রজন্মের ভাষা হয়ে উঠছে। ফলে গ্রাফিক নভেলও ভবিষ্যতের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভাষা হতেই পারে।
বাংলাতেও এই সম্ভাবনা স্পষ্ট হচ্ছে। বিকল্প প্রকাশনা এবং ডিজিটাল প্রজন্মের হাত ধরে গ্রাফিক নভেল হয়তো আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ আজকের পৃথিবীতে মানুষ ক্রমশ ছবির মাধ্যমেই ভাবতে, মনে রাখতে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শিখছে।
সম্বরণ মনে করেন, বাংলায় গ্রাফিক নভেলের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কিন্তু সমস্যা হল, এই মাধ্যম অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ। ফলে শিল্পীদের জন্য প্রয়োজন আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন। তবু তিনি আশাবাদী নতুন প্রজন্মের আগ্রহ, এবং বিকল্প প্রকাশনার উত্থান বাংলায় গ্রাফিক নভেলের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। মধুজাদেবীও জানালেন, বাংলায় যে কমিকস সংস্কৃতি আছে, তার অধিকাংশই সস্তা নিউজপ্রিন্টে ছাপা হয়। বাংলার প্রকাশনা জগতে সেই অবকাঠামো এখনও সীমিত। কিন্তু একটি গ্রাফিক নভেলের জন্য প্রয়োজন উন্নত কাগজ, সূক্ষ্ম প্রিন্টিং, রঙের যথাযথ ব্যবহার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের দাম বেড়ে যায়। একটি ভালো গ্রাফিক নভেলের দাম সহজেই পাঁচশো টাকার ওপরে যেতে পারে।
সম্প্রতি প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক গ্রাফিক নভেলের লেখক সারনাথ ব্যানার্জির গ্রাফিক নভেল বাংলায় অনূদিত হয়েছে। গ্রাফিক নভেল সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক দৃশ্যমান স্মৃতিভাণ্ডার। যে ইতিহাস সংবাদপত্রের শিরোনামে জায়গা পায় না, যে মানুষদের রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা মূলধারার সংস্কৃতি বারবার অদৃশ্য করে দিতে চায়, গ্রাফিক নভেল তাদের মুখ ফিরিয়ে আনে। কখনও ইঁদুরের মুখোশে, কখনও যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থীর চোখে, কখনও শহুরে নিঃসঙ্গতার জলরঙে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক, গ্রাফিক নভেল হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, স্মৃতির ভাষা, বিকল্প ইতিহাস লেখার ভাষা। ইতিহাসের সেইসব মুখ, যাদের রাষ্ট্র মুছে দিতে চেয়েছিল, তারা এখানেই থেকে যায়। ছবির, ফ্রেমের ও স্মৃতির ভিতরে।