আমার বয়স কুড়ি
কুড়ি বছর বয়স নিয়ে
আমি আজও হেঁটে চলেছি
হাজার বছর ধরে
দারিদ্র্য
মালিন্য
আর
মৃত্যুর ভিড় ঠেলে
আমি পায়ে পায়ে চলেছি
হাজার বছর ধরে
হাজার বছর ধরে
দেখছি
ইতিহাস
দারিদ্র্যের ইতিহাস
বঞ্চনার ইতিহাস
শোষণের ইতিহাস…

‘কলকাতা ৭১’ ছবির শুরুতে পর্দায় ভেসে ওঠে এই পংক্তিগুলি। এমন একজন মানুষ বা পরিচালক ছবির প্রথমে পর্দায় লিখছেন এই সব কথা, যাঁর মানসিক বয়স কুড়ি। বা বলা যায়, অলি গলির তস্য গলি দিয়ে পুলিশের তাড়া খেয়ে ছুটে চলা যে যুবককে আমরা পর্দায় দেখতে পাই তাঁর বয়স কুড়ি। কুড়ি বছর বয়সটাকে মাথায় রেখেই এই ছবি করেছিলেন মৃণাল সেন। এই কুড়ি বছর বয়সই তাঁর আমৃত্যু স্থায়ী হয়েছিল হয়তো। প্রতি জন্মদিনেই মৃণালদাকে নিভৃতে জিজ্ঞেস করতাম ইচ্ছে করে, ‘বয়স কত হল?’ এক তরুণ তুর্কি পরিচালক হেসে বলে উঠতেন, “আমি চির সাতাশ। নীললোহিতের মতো। নীললোহিতের বয়স বাড়ে নাকি?“
আজ ১৪ মে। তাঁর ১০৩তম জন্মদিন। এমন জন্মদিন কতবার এসেছে, গেছে। মৃণালদার বয়স সাতাশেই আটকে থেকেছে। মৃণাল সেনকে ‘মৃণালদা’ বলার কারণ উনি কখনও কারও মৃণালকাকা, মৃণাল জ্যাঠা, বা মৃণাল মেশো- হিসেবে নিজেকে ভাবতেই চাননি। ওঁর আশেপাশের অল্পবয়সীরাও তাঁকে তাই মৃণালদা বলেই ডাকতে অভ্যস্ত ছিল বা ছিলেন। যদিও ওঁর সহধর্মিণী অত্যন্ত সুঅভিনেত্রী গীতা সেন ছিলেন আমাদের স্নেহশীলা মাসিমা। অনেকে অবশ্য গীতাদিও বলতেন।

আমি আজ কোন স্পর্ধায় বা পরিচয়ে এই জন্মদিনের লেখা লিখছি সেটা একটা প্রশ্ন বটে। আমি কোনও কেউকেটা নই। সিনেমা জগতেরও কেউ নই। নই চলচ্চিত্র বিশারদ। পেশাগত পরিচয় বলতে গেলে বলতে হয় পূর্ব ভারতের একটি বিশিষ্ট সংবাদপত্রের বিনোদন বিভাগের প্রাক্তন সাংবাদিক। সেই সূত্রে মৃণালদার সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে পরিচয় হয় নামটির সঙ্গে তার অনেক আগে থেকে। আমার বাবা ছিলেন মুদ্রণ শিল্পের ব্যাবসায়ী। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, রাজেন তরফদার, তরুণ মজুমদার-সহ বহু বিখ্যাত পরিচালকের সিনেমার পোস্টার ছাপতেন তিনি। পোস্টার ডিজাইনও করতেন। ওই সিনেমার পোস্টার ছাপার সুবাদে স্বনামধন্য পরিচালকদের পদধূলি পরেছে আমার বাবার অফিসে। আলোকশিল্পী তাপস সেনের সঙ্গে মৃণাল সেনও এসেছেন সেখানে। তখন আমি খুবই ছোট। বাবা মায়ের কথা শুনে বুঝেছিলাম এই মৃণাল সেন মানুষটি আলাদা ধরনের। তাঁর ছবিও আলাদা তাৎপর্যের।
আমরা থাকতাম এক্কেবারে হাজরার মোড়ে। সেখানে মিটিং মিছিল লেগেই থাকত। ধর্মঘটের দিন মৃণালদা হাঁটতে হাঁটতে আসতেন ছবি তুলতে। মানুষের প্রতিবাদের ছবি, বিদ্রোহের ছবি। আমি তখন একটু বড়। বাবা বলতেন, “ওই দ্যাখ মৃণাল সেন স্টক শট তুলছেন।“ স্টক শট কি পরে জেনেছি। বয়স বাড়লে এক বিশেষ আত্মীয় চিত্রকরের সঙ্গে মৃণাল সেনের বাড়ি যাই যখন, তখন আমার বয়স উনিশ। কলেজও শেষ হয়নি। প্রথম দর্শনেই আমার মৃণালদাকে ভাল লেগে যায়। সম্ভবত আমাকেও মৃণালদার।

১৯৮১ সালে সেই প্রথম আলাপের সময় থেকেই আমার কাঁচা বুদ্ধিতে বুঝতে পারি তাঁর জীবনদর্শন নতুন একটা বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। তিনি ক্রমাগত মুক্তির পথ খুঁজছেন। ‘একদিন প্রতিদিন’ যখন মুক্তি পেয়েছিল তখন বিভিন্ন লেখালিখি পড়ে বুঝেছিলাম তিনি সরাসরি রাজনৈতিক ভাবনার ছবি থেকে বেরিয়ে ঢুকে পরতে চাইছেন মধ্যবিত্ত সামাজের দৈনন্দিনে। অবশ্য সেখানেও রাজনীতি আছে। এ কথা তিনি নানা আলোচনায় বারে বারে বলতেনও।
‘একদিন প্রতিদিন’এর আগের ছবিগুলিতে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিশ্বাস, বামপন্থার প্রভাব খুব শক্তিশালী ছিল নানা রূপকের আবরণে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা বামপন্থীরা যখন সরকার গড়ল, তার পর কিছুদিন শেকড় বা প্রান্তিক মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নানা সংস্কারমূলক কাজ তারা করেছিল। তার পর পরিবর্তন শুরু হল যখন সংগঠনগত দর্শনে একটা নৈতিক বিচ্যুতি দ্যাখা দিল। এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অবক্ষয় মৃণালদাকে নিয়ে গেল আত্মবিশ্লেষণের দিকে।‘খারিজ’ ছবিটির মধ্যে সেই মধ্যবিত্তের নীরবতা, সত্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা, নিম্নবিত্ত মানুষদের প্রতি উদাসীনতা প্রকট হয়ে ওঠে।

‘খারিজ’ দেখার পর ওঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। উনি জিজ্ঞেস করলেন কেমন লাগল? আমি যা বলার বলেছিলাম। উনি বললেন, “আমি মধ্যবিত্তের মনে এক শোকশুদ্ধ মনুষত্বের জন্ম দিতে চাইছি। চাইছি মধ্যবিত্ত আত্মবিশ্লেষণ করুক। নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াক।“ এই যে একটা বিশেষ শ্রেণীর মানুষের জীবনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ঢুকে পড়লেন তিনি সেটা ধারাবাহিক ভাবে জারি রইল তার পরের ছবিগুলোতে।‘খণ্ডহর’-এ তা বিশেষ ভাবে ধরা পড়ে। শহুরে তিন যুবকের পলায়নপর, উদাসীন মানসিকতায়।
মৃণালদার বেলতলা রোডের বাড়িতে সমাজের নানা ধরনের মানুষ আসতেন। কেউ আড্ডা দিতে, কেউ বা কাজের প্রয়োজনে। সারাদিনে কত কাপ যে চা হত, তা গুণে বলা যাবে না। অতিথি আপ্যায়নের নিরন্তর দিকটি সামাল দিতেন গীতা সেন। অর্থাৎ মাসিমা। বাংলা ছবির তারকারা তো বটেই, আসতেন মুম্বইয়ের শিল্পীরা। মিঠুন চক্রবর্তী থেকে শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন, কে না! এসেছিলেন চার্লি চ্যাপলিনের নাতনি কিয়েরা চ্যাপলিনও। অবাক লাগে এটা ভেবে যে মানুষটা সারাদিন নানা ধরনের মানুষের সাথে আড্ডা দিতে, মাটির কাছাকাছি থাকতেন, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে স্টক শট তুলতেন, এই কলকাতা যাঁর কাছে ছিল এল ডোরাডো, সেই তিনি সিনেমার ডাকে কান, বার্লিন থেকে শুরু করে সারা পৃথিবী চষে ফেলেছেন। সেই সব সম্মানজনক বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবের আমন্ত্রণ তাঁকে কোনও অহংবোধের তকমা পরিয়ে দেয়নি। তিনি ভালবেসেছিলেন তাঁর এই দীনহীন তৃতীয় ভুবনকেই। জীবনের সবটুকু দিয়ে।

প্রশ্ন, উত্তর, প্রতিপ্রশ্ন, যুক্তি, তক্কো, গপ্পে ভরা সেইসব আড্ডার দিনে এত লোক-সমাগম হত যে, সেই সব সময়ে আমাদের মানে মৃণালদার পুত্র কুনাল ও পুত্রবধূ নিশার বন্ধু হিসেবে ঠাঁই হত হয় ভেতরের ঘরের ডাইনিং টেবিলে নয়তো বা মৃণালদা-মাসিমার বেডরুমের খাটে।
মাঝে মাঝে গিয়ে দেখতাম রোগা ডিগডিগে লম্বা মতো এক অল্প বয়সী যুবক বসার ঘরে বসে আছেন। মৃণালদা তাঁর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে চলেছেন। আর কেউ তখন ওই ঘরে যেত না। শুনেছিলাম ছেলেটি নাটক করেন, সিনেমাপ্রেমী, সংবাদপত্রে লেখেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই না হয় হল। তাই বলে এত গল্প, এত আড্ডা! ওই যুবক বাড়িতে এলে মৃণালদা তাঁর সঙ্গে একান্তে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কি গুজুরগুজুর করতেন তা ওঁরাই জানেন।
এমনি দিনে গেলে মৃণালদার বসার ঘরে তাঁর সঙ্গে প্রচুর গল্প হত। সিনেমা নিয়ে, সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য নিয়ে এবং আরও কত সব ব্যক্তিগত কথা। যেহেতু বাংলার ছাত্রী ছিলাম, তাই আমাকে প্রায়শই জিজ্ঞেস করতেন নতুন গল্প কি পড়লাম? আমিও সাধ্য মতো পড়াশোনা থেকে গল্প শোনাতাম। তখনই লক্ষ্য করেছি গঠনমূলক আড্ডার পাশাপাশি মৃণালদা কিন্তু কুৎসাহীন, নিরীহ গসিপ শুনতে এবং করতে বেশ ভালবাসতেন। ওঁর মুখেই শুনেছিলাম বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার কে কে মহাজনের সুরাপান করে শুটিং নিয়ে একটা অসাধারণ মজার গল্প। তা সে যাই হোক শেষ পর্যন্ত দেখলাম মৃণালদার সঙ্গে আড্ডা মারা ওই যুবকই একদিন তাঁর ছবি ‘চালচিত্র’এর নায়ক হয়ে গেলেন। হ্যাঁ, সেই রোগা পাতলা লম্বা ছেলেটি আর কেউ নন, তিনি অঞ্জন দত্ত। পরবর্তীকালে আমাদের সকলের প্রিয় গিটার হাতে অঞ্জনদা। বেলা বোস, মারি অ্যান, রঞ্জনা… যাঁর মানসকন্যা।
‘চালচিত্র’ সেভাবে চলেনি। কিন্তু গোর্কি সদনে স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে ওই ছবি দেখে আমার বেশ ভালো লেগেছিল। তার কারণ অঞ্জনদার অসামান্য অভিনয় আর সেই সঙ্গে মাসিমার। ভাল লেগেছিল এই কারণে আমার মধ্যেও হয়তো এই ছবির অঞ্জনের মতো সাংবাদিক হওয়ার মরিয়া স্বপ্ন ছিল।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ আমার এমএ-তে পাঠ্য ছিল। সেই গল্প নিয়ে মৃণালদা একটি হিন্দি ছবি করছেন তখন। নাম হবে ‘খণ্ডহর’। আমার যে গল্পটা আঁতিপাঁতি করে পড়া এবং আমি যে ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ পড়ে মুগ্ধ, সম্মোহিত সেটা জেনে উনি খুব খুশি হয়েছিলেন। গল্পের শেষ লাইনগুলো যে খুব সুন্দর সে ব্যাপারে আমার সঙ্গে মৃণালদার অনেক কথা হয়েছিল। উনি বয়সে অনেক ছোট ছেলেমেয়েদেরকেও মনোভাবে মিলছে মনে হলে বন্ধু বানিয়ে ফেলতেন। আমার সঙ্গেও সেই রকম একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল বলে মনে হয়। দেখা হলেই ঘেটিতে হাত দিয়ে চেপে ধরতেন। ওটাই ছিল ওঁর স্নেহ প্রকাশের বা বন্ধুত্ব প্রকাশের চির পরিচিত ভঙ্গি।
তা ‘খণ্ডহর’ প্রসঙ্গ এলো যখন, তখন একটা গল্প বলি। বোলপুরের এক ভগ্নদশার রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়িতে ছবির শুটিং হয়েছিল। এই শুটিং দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এটা দেখে যে কি ভাবে মাসিমা শুটিং এর ডিটেল মুহূর্তগুলোতে প্রাণসঞ্চার করতে সাহায্য করতেন।‘খণ্ডহর’ হিন্দি ছবি হলেও এর পটভূমিতে রয়েছে বাঙালি জীবনের গল্প, তাই বাঙালিরা কী ভাবে, ভাতের ফ্যান গালে নিজে হাতে শাবানা আজমিকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন উনি। এঁটো বা সকড়ি বলতে কি বোঝানো হয়, তা শাবানা বুঝতে পারছিলেন না। কেন ভাতের মাড় গেলে হাত ধুতে হয় তাও শাবানার জানা ছিল না। মাসিমা প্রাণপণ চেষ্টা করে সেটা শাবানাকে বুঝিয়েছিলেন। এ তো গেল একটা ঘটনা।
আরেকটা মজার ব্যাপার হল এই ছবিতে তেল রঙে আঁকা আমার একটা বিরাট তিন ফুট বাই সাড়ে চার ফুট পূর্ণ অবয়ব প্রতিকৃতি ব্যবহৃত হয়েছিল। জমিদার বাড়ির ভগ্নপ্রায় দেওয়ালে টাঙানো হয়েছিল সেই উজ্জ্বল ছবি। আমার ছবিটা আঁকা হয়েছিল ধনী পরিবারের এক অভিজাত নারীর আদলে। পরনে হলুদ রঙের বেনারসি শাড়ি। সারা অঙ্গে প্রচুর অলঙ্কার। মাথায় রূপোর কাঁটা দিয়ে সাজানো বাগান খোঁপা। সেই খোঁপা বেলতলা রোডে মৃণালদার বাড়িতে বসে মাসিমা বেঁধে দিয়ে, শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তার পর আমার সেই বিশেষ আত্মীয় চিত্রকর ও শিল্প নির্দেশক গৌতম বসুর সামনে দু’দিন ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে ছবিটি আঁকানো হয়। সিনেমায় ছিল দেওয়ালে টাঙানো ওই সুসজ্জিতা রাজরানির ছবি থেকে হুবহু ওই হলুদ বেনারসির সাজে বেরিয়ে বিশাল রাজকীয় সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন শাবানা। আসলে এই দৃশ্য হল যে তিন যুবক শহর থেকে বেরিয়ে হঠাৎ এক দিন পৌঁছে যায় একটি গ্রামের ভাঙা জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে, তাদেরই কারও এক জনের ভাবনার ফ্যান্টাসি।

শুটিং হয়ে যাবার পর শিল্প নির্দেশকের কাছে সুন্দর ছবিখানি চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি ছবিটি কোথায় রেখেছেন মনে করতে পারেন না। এ এক আশ্চর্য ঘটনা। অত সুন্দর ছবিখানি অযত্নে হারিয়ে না গেলে আমার বাড়িতে শোভা পেত, এই আর কি!
মৃণালদার অন্তর্দৃষ্টি কি প্রবল ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। আমার যে লিখতে ভাল লাগে সেটা মৃণালদা ততদিনে জেনে গিয়েছেন। এমএ-র ফল বেরোনোর পর একদিন গেলাম ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে। সেদিন মৃণালদা বললেন, ‘এখন কি করতে চাও?’ আমি বলেছিলাম বিএড করব, বা পিএইচ ডি। উনি বললেন, ‘তুমি একই সিলেবাস নিয়ে বছরের পর বছর ছাত্র পড়াতে পারবে না। এটা মনে রেখো। তার চেয়ে বরং সাংবাদিকতা করো। রিনা (অপর্ণা সেন} একটা নতুন মহিলা পত্রিকা সম্পাদনা করছে। নাম ‘সানন্দা‘। আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি ওকে। নিয়ে যাও।’

তো, মৃণালদার অনুপ্রেরণাতেই আমি ‘সানন্দা’য় ফ্রিলান্সিং শুরু করি। ক্রমে ক্রমে সাংবাদিকতার পুরোপুরি চাকরি মূল সংবাদপত্রে।
তখন মৃণালদা একের পর এক ছবি করছেন যেখানে মধ্যবিত্ত জীবন ঝলকিত হচ্ছে। বহু আগেই অবশ্য গ্রাম জীবন আর শহুরে জীবনকে তিনি মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়েছিলেন ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে। আকাল নিয়ে ছবি করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন দুর্ভিক্ষ নিয়ে ছবি করাটার আসলে কোনও মানেই হয় না। তিনি ছবির উপসংহারে উপলব্ধি করেন, ‘আকাল তো আমাদের সর্বাঙ্গে।’ এই সব বোধের কথা উঠে আসত তাঁর সাথে আড্ডায়। নানা শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মত বিনিময় তাঁকে সমৃদ্ধ করেছিল। সিনেমায় তার প্রভাব পড়ত।
মৃণালদা একদিকে ছিলেন নমনীয়, অন্যদিকে ছিলেন খানিকটা একরোখা ধরনের। যেটা করবেন মনস্থ করেছেন, সেটাই করবেন। একবার মহা গোলমাল বাঁধল শেষমেশ আমাকে নিয়ে। একদিন সকালে ওঁর চিফ অ্যাসিসটেনট সুপান্থ আমাদের বাড়িতে এসে দাঁড়ালেন। দরজা খুলতেই তিনি আমাকে দেখে হতভম্ব। একদৃষ্টে সুপান্থ তাকিয়ে আছেন আমার চুলের দিকে। মুখে একরাশ হতাশা। তিনি যা বললেন তার সারমর্ম এই যে, আমার মাথায় খুব লম্বা চুল ছিল, সেই চুল দেখেই মৃণালদা তাঁর ‘কভি দূর কভি পাস’ টেলিফিল্ম সিরিজে নিজের লেখা ‘বাসস্টপ’ নামে একটি গল্পে নায়িকা করার কথা ভেবেছেন শেষ পর্যন্ত আমাকে। আর আমি সেই চুল সমসাময়িক স্টাইলে স্টেপস ছাঁটে কেটে ফেলেছি সুপান্থ আসার আগের দিন বিকেলে পার্লারে গিয়ে। আমাকে দিয়ে মৃণালদা অভিনয় করাবার কথা ভাবছেন শুনে যেমন ভয় করেছিল, তেমনি আনন্দও হয়েছিল। সেদিন বিকেলে মৃণালদার বাড়িতে গিয়ে চুল কেটে ফেলার জন্য যথেষ্ট অস্বস্তি হয়েছিল আমার। কারণ চুল কেটে ফেলায় মাসিমা ও মৃণালদা দুজনেই মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। যাই হোক ‘বাসস্টপ’ খুব মনোগ্রাহী গল্প ছিল। কিন্তু মৃণালদা আর কাউকে নায়িকা হিসেবে নিয়ে ওই টেলিফিল্মটি করেননি। এইখানেই মৃণালদার একরোখাপনা। যা করবেন ঠিক করতেন তাই করতেন, যা করবেন না ভাবতেন তা করতেন না। মেয়েদের সাজগোজ নিয়ে ওঁর কতগুলো বিশেষ অপছন্দ ছিল। উনি কানে ঝুমকো পরা আর ভ্রু প্লাক করা পছন্দ করতেন না।

মৃণালদার অনেক বন্ধুবান্ধব ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সব চেয়ে প্রিয় ছিলেন যতদূর জানি তাপস সেন। আকস্মিকভাবে তাপসের মৃত্যুতে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন মৃণালদা। এমনটাই শুনেছিলাম মাসিমার কাছে। প্রত্যেকদিন সকালে মৃণালদা বেশ খানিকটা সময় ফোনে কথা বলতেন তাপসবাবুর সঙ্গে। তিনি চলে যাওয়ায় মৃণালদার জীবনে এক ধরনের বিষণ্ণতা এসেছিল কিছুদিনের জন্য।
মৃণাল সেনের সিনেমার কথা উঠলে খারাপ লাগে এটাই তাঁর পরিচালিত ‘জেনেসিস’ ছবিটি খুব কম সংখ্যক দর্শক স্পেশাল স্ক্রিনিং-এ দেখেছিলেন। ছবিটি নানা বাধাবিঘ্নের মধ্যে দিয়ে গিয়েও ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল না। চিরকাল বাক্স-বন্দী হয়েই রইল। আমি এই ছবিটি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। এ ছবি ছিল আপাতদৃষ্টিতে একটি ত্রিকোণ সম্পর্কের পরিণতির গল্প। যেখানে এক গর্ভবতী নারী একাই এগিয়ে যায় নতুন জীবন খুঁজতে। তবে আসলে এ ছবি সভ্যতার বিবর্তনের ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীও, যেখানে কি ভাবে গ্রামীণ সভ্যতা মহাজনের হাতের পুতল হয়ে যায় সেই বিবর্তনের দলিল। জয়সলমীরের একটি প্রত্যন্ত পরিত্যক্ত গ্রাম কুল্ধারায় তিন মাস ধরে এই larger than life ছবির শুটিং হয়েছিল। যাঁরা এই ছবি দেখেছেন তাঁদের কারও কারও মতে ‘জেনেসিস’ই হল মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি।

বিদেশে বিভিন্ন বিশিষ্ট মানুষ এই ছবি দেখার সুযোগ পান। কারও ছবিটি ভালো লাগে, কারও বা তেমন ভালো লাগেনি। ‘জেনেসিস’-এর ভালো লাগা-মন্দ লাগা নিয়ে মৃণালদা তাঁর আত্মজীবনী ‘তৃতীয় ভুবন’ এ লিখেছিলেন, তাঁর নিজস্ব স্টাইলে, ‘এই ভাল লাগা-মন্দ লাগা আমাকে কখনই তেমন প্রভাবিত করে না। আমি শুধু ছবি করে যাব সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে। ভাঙচুর করব, নতুন করে গড়ব, প্রতি মুহূর্তে নতুন চেহারায়, নতুন ভঙ্গিতে হয়তো জন্ম নেবে আমার ছবি।’
আসলে মৃণালদার জীবন বা যাপন নিয়ে কথা বলতে গেলে সেটা খুব ছোট করে লিখলেও একটা পুস্তিকার আকার নেবে। এতটাই বৈচিত্র্যময়। সামনা-সামনি আড্ডায় আমি অন্তত কোনওদিন মৃণালদার মুখে ওঁদের বিবাহিত জীবনের সূচনায় যে সাঙ্ঘাতিক অর্থকষ্ট ছিল, সে গল্প শুনিনি। শুনিনি ফেলে আসা জীবন সংগ্রামের কথা। মৃণালদা নস্টালজিয়ায় বাঁচতে চাইতেন না। সব সময় বর্তমান আর ভাবিকালের কথা ভাবতেন। কাজে ও জীবনচর্যায় তাঁর সেই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটত। মৃণালদার মধ্যে যেমন এক রাগী, প্রতিবাদী মৃণাল সেন ছিলেন তেমনি ছিলেন মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসায় আপ্লুত আর এক মৃণাল সেন।
তাঁর শেষ ছবি ‘আমার ভুবন’ সমাপ্ত হয় সেই মানবিক ভালবাসার উপসংহারে। পর্দায় ভেসে আসে জীবনের সারসত্য একটাই…
পৃথিবী ভাঙছে
পুড়ছে
ছিন্নভিন্ন হচ্ছে
তবু মানুষ বেঁচে বর্তে থাকে
মমত্বে
ভালবাসায়
সহমর্মিতায়

Happy Birthday Mrinalda, Happy Birth Day…আর বেশি সময় নেব না। হাজার বছর ধরে আপনার পথ হাঁটার তো শেষ বলে কিছু নেই।
ওই অঞ্জন দত্ত এলেন বলে, প্রত্যেক ১৪ই মে যেমন সপরিবারে আসতেন। আর উনি এলে তো আপনার সঙ্গে কথা বলাই যাবে না। কত প্রিয়জন এসেছে শুভেচ্ছা জানাতে। কুণাল-নিশাও রয়েছে কোথাও। কিন্তু দিব্য চক্ষে দেখতে পাচ্ছি জন্মদিনের দিনও আপনি আবার সেই অঞ্জনদার সঙ্গেই আড্ডায় মেতে গেছেন। বাকিরা শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাবার অপেক্ষায়।
লেখা শেষ করার আগে মনে পড়ে গেল কি জানি কেন মৃণালদার চলে যাবার দিনটার কথা। প্রশ্ন আসছে মনে, প্রত্যক্ষ ভাবে কোনও রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়াই মৃণালদার অনাড়ম্বর গমন পথে কোথা থেকে এলেন অত মানুষ? কোথা থেকে? মনে হয়েছিল খুব কম সংখ্যক মানুষ সামিল হবেন সেই অন্তিম মিছিলে। তা কিন্তু হল না। অনেক অনেক অনেক মানুষ। সবাই পদাতিক।
আজ জন্মদিনে মৃণালদা সামনে থাকলে বলতেন, ‘আমার সেই যাত্রাটা তো অতীত হয়ে গেছে। আজ আমার জন্মদিন। আমি তো এখনও আছি। প্রতি মুহূর্তে আছি। প্রতি মুহূর্তে জন্মাচ্ছি! মানুষ দেখছি, জীবন দেখছি। Always being born!”