
কলকাতার ভোরবেলা। টেরিটি বাজারের সরু গলিতে তখন ভেসে আসছে গরম স্যুপের গন্ধ, ভাপ ওঠা মোমো আর তাজা নুডলসের সুবাস। কোথাও লাল কাগুজে লণ্ঠন, কোথাও আবার ধূপের ধোঁয়া। এই শহরের কোনে লুকিয়ে আছে কলকাতার চিনা সম্প্রদায়ের ইতিহাস। যেই ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা অভিবাসনের গল্প, টিকে থাকার গল্প, নতুন পরিচয় গড়ে তোলার গল্প। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যোমকেশের অনেক গল্পেই কলকাতার টেরিটিবাজার, পোদ্দার কোর্ট অঞ্চলে চিনেদের সন্ধান মেলে।
বাংলায় চিনাদের আগমন অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে। যখন কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে দ্রুত বড় হয়ে উঠছে, তখনই সমুদ্রপথে এখানে আসতে শুরু করেন চিনা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম টং আ্যাচিউ। ১৭৭৮ সালের দিকে বজবজের কাছে এসে তিনি একটি বসতি গড়ে তোলেন। পরে সেই জায়গার নামই হয়ে যায় আচিপুর। আজও চিনা নববর্ষে কলকাতার চিনা সম্প্রদায় সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানায় তাঁকে। অনেকের কাছেই তিনিই কলকাতার চিনা সমাজের প্রতিষ্ঠাতা।


প্রথমদিকে অবশ্য বেশিরভাগ চিনে অতিথিদের ইচ্ছে ছিল কিছু টাকা রোজগার করে দেশে ফিরে যাওয়া। কলকাতাকে তখন বলা হতো ‘সোনায় মোড়া শহর’। বন্দরনগরী হিসেবে ব্যবসার সুযোগ ছিল প্রচুর। কিন্তু ইতিহাস অন্য পথে এগোয়। চিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ এবং পরে কমিউনিস্ট বিপ্লবের কারণে অনেকেই আর দেশে ফিরতে পারেননি। ধীরে ধীরে কলকাতাই হয়ে ওঠে তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা।
এই চিনে সমাজে আবার নানা গোষ্ঠী – হাক্কা, ক্যান্টনিজ, হুবেইনিজ। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দক্ষতা অনুযায়ী পেশা। হুবেইনিজরা ছিলেন দাঁতের চিকিৎসায় দক্ষ। একসময় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় দেখা যেত চিনা ডেন্টিস্টদের। দন্ত্যচিকিৎসক হিসেবে তাঁদের সুনামই ছিল ব্যাপক।
অন্যদিকে ক্যান্টনিজরা ছিলেন কাঠের কাজের ওস্তাদ। জাহাজ মেরামত থেকে আসবাবপত্র, সব ক্ষেত্রেই তাঁদের দক্ষতা ছিল অপরিসীম। কলকাতার বহু পুরোনো বাড়ির কাঠের আসবাবে এখনও সেই ইতিহাসের ছাপ লুকিয়ে আছে।
সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছিলেন হাক্কারা। তাঁরা প্রথমে জুতো তৈরির কাজ এবং পরে চামড়া শিল্পে যুক্ত হন। সেই সময় উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজে চামড়ার কাজকে অপবিত্র বলে মনে করা হতো। ফলে ট্যাংরা অঞ্চলে সহজেই নিজেদের জায়গা করে নেন চিনারা। সময়ের সাথে সেখানেই গড়ে ওঠে কলকাতার দ্বিতীয় চায়নাটাউন। কোরিয়া যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর বুটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ট্যাংরার ট্যানারিগুলিতে রমরমিয়ে ব্যবসা শুরু হয়। বহু চিনা পরিবার তখন আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে।


টেরিটিবাজার আর ট্যাংরার গলিতে গড়ে ওঠে চিনা স্কুল, মন্দির, ক্লাব আর সংগঠন। ‘হুইগুয়ান’ নামে পরিচিত সংগঠনগুলো নতুন আসা অভিবাসীদের থাকার জায়গা থেকে কাজের সন্ধান, সবকিছুতেই সাহায্য করত। একই সঙ্গে তারা ধরে রাখত ভাষা, উৎসব আর চিনা ঐতিহ্য।
তবু সমাজের মূলস্রোতে পুরোপুরি জায়গা করে নিতে পারেননি তাঁরা। কোথাও যেন একটু দূরে করেই রাখা হতো তাদের। অর্থনৈতিকভাবে সফল হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তাঁরা ছিলেন অনেকটাই প্রান্তিক।
এই দূরত্ব সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নেয় ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের সময়। শুধু চিনা বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে হাজার হাজার চিনা-ভারতীয়কে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করে রাজস্থানের দেওলি বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়। পরিবার ভেঙে যায়, ব্যবসা নষ্ট হয়ে যায়। সেই সময়ের আতঙ্ক এখনও অনেক প্রবীণ চিনা-ভারতীয় পরিবারের স্মৃতিতে জীবন্ত। যুদ্ধের পর থেকেই ধীরে ধীরে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা আমেরিকার দিকে পাড়ি দিতে শুরু করেন অনেকেই।
কলকাতাকে ভালবেসে থেকে যান বাকিরা। কলকাতার চিনা সমাজের সবচেয়ে আশ্চর্য দিক সম্ভবত তাদের সাংস্কৃতিক অভিযোজন। ট্যাংরার বিখ্যাত ‘চিনা কালীমন্দির’ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কালীমন্দিরে চিনা ধূপকাঠি জ্বলছে, আবার প্রসাদ হিসেবে মিলছে নুডলস আর চপসুই – এ দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। এখানে বাঙালি আর চিনা সংস্কৃতি যেন একে অপরকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরেছে।


খাবারের কথা তো বলতেই হয়। তুং নাম, ইউ চিউ, কিম লিং, তুং ফং, জিমিস কিচেন প্রভৃতি কলকাতার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা চিনেদের রেস্তোরাঁর হেঁসেলে তৈরি ‘ইন্দো-চাইনিজ’ খাবার আজ গোটা বিশ্বের রসনায় জায়গা করে নিয়েছে। চিলি চিকেন, হাক্কা নুডলস, মাঞ্চুরিয়ান সব কলকাতার চিনা সম্প্রদায়েরই সৃষ্টি। চিনা রান্নাকে ভারতীয় মশলার সঙ্গে মিশিয়ে তাঁরা তৈরি করেছিলেন এক নতুন স্বাদ, যা আজ প্রায় বাঙালির নিজস্ব খাবার বলেই মনে হয়।
আজ অবশ্য কলকাতার চিনা জনসংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। একসময় যেখানে প্রায় ৫০ হাজার চিনা বাস করতেন, এখন সেই সংখ্যা কয়েক হাজারে নেমে এসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাংলা বা ইংরেজিতে বেশি স্বচ্ছন্দ, চিনা ভাষা আর ততটা ব্যবহার করেন না। অনেকেই আর ট্যাংরা বা টেরিটিবাজারে থাকেন না। তবু চিনা নববর্ষের ড্রাগন ডান্স, আচিপুরে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন কিংবা ভোরবেলার টেরিটি বাজার এখনও মনে করিয়ে দেয় যে এই শহরের ইতিহাসে চিনারা একসময়ের অতিথি হলেও এখন তাঁরা কলকাতারই এক অনিবার্য অংশ।


কলকাতার ইতিহাস তাই শুধু বাঙালির ইতিহাস নয়। এই শহর তৈরি হয়েছে নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতি আর নানা মানুষের মিলনে। আর সেই বহুসাংস্কৃতিক কলকাতার গল্পে চিনা সম্প্রদায় এক অনিবার্য এবং উজ্জ্বল অধ্যায়।

ভাবুন তো, কলকাতা থেকে যদি ট্যাংরার গন্ধটা মুছে যায়, যদি টেরিটি বাজারের ভোরবেলার ব্রেকফাস্ট আর না থাকে, যদি চাইনিজ নিউ ইয়ারের ড্রাগন ডান্স আর শহরের রাস্তায় না নামে, যদি শহরের মেনু থেকে ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন চিরতরে মুছে যায় – তাহলে কি কলকাতা কলকাতাই থাকবে? আজ ‘কলকাতার চাইনিজ’ বললে আর বিদেশি কিছু মনে হয় না। ট্যাংরার রেস্তোরাঁয় বসে চিলি চিকেন খাওয়া, টেরিটিবাজারে সকালে ডাম্পলিং খেতে যাওয়া, অথবা চিনা কালীমন্দিরে পুজো দেখতে যাওয়া আজ শহরের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ। কলকাতার মানুষ যেমন দুর্গাপুজো, জাকারিয়া স্ট্রিটের ঈদ, পার্ক স্ট্রিটের বড়দিন নিয়ে গর্ব করে, তেমনই ট্যাংরা বা বো-বারাক্সের চাইনিজ নিউ ইয়ারারের ড্রাগন ডান্স নিয়েও সমান আবেগী।
সময়ের সাথে চিনারাও এই দেশের নাগরিক হয়ে উঠেছেন। এখন কলকাতার চীনা সম্প্রদায়ের বহু মানুষের ভোটাধিকার রয়েছে। নির্বাচনের সময় ট্যাংরা বা টেরিটিবাজার এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলিকে চীনা ভাষায় প্রচার করতেও দেখা যায়।

কিন্তু সেই ছবির মধ্যেও একটা চাপা দুঃখ রয়ে গেছে। কারণ, কলকাতার চিনা সমাজ আজ দ্রুত ছোট হয়ে আসছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। পুরনো ট্যানারি বন্ধ হয়েছে, বহু পুরনো চিনা স্কুল বা ক্লাব আর আগের মতো নেই। টেরিটি বাজারের অনেক পুরনো বাড়ি আজ ভেঙে পড়ছে। যে গলিগুলো একসময় চিনা ভাষার কোলাহলে ভরে থাকত, সেখানে এখন অনেকটাই নীরবতা। তবু, চিনেদের নিয়েই এগোবে কলকাতার আগামী রইতিহাস, এটুকুই আমাদের চাওয়া।

তথ্য সূত্র: কলকাতার চিনেপাড়া, লেখক বিজয় চৌধুরী।
ছবি সৌজন্য: রয়টার্স, দ্য টেলিগ্রাফ।