লেখাটি আরম্ভ পত্রিকায় প্রকাশিত।
শোভাবাজারের লাহা কলোনি মাঠে, সম্প্রতি মঞ্চস্থ হয়েছে গৌতম সরকারের নাটক ‘ষন্ডার’। ফরাসি নাট্যকার ইউজিন আওনেস্কোর বিখ্যাত নাটক ‘রাইনোসেরোস’ থেকে অনুপ্রাণিত এই প্রযোজনা আজ যেন এই দেশেরই বাস্তবচিত্র। ভারত সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ গণতন্ত্র, যুক্তিবোধ এবং ভিন্নমতের অস্তিত্ব সংকটের পড়েছে। তাই ‘রাইনোসোরাস’ নাটকটি আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক একটি রাজনৈতিক রূপক।
১৯৫৯ সালে লেখা ‘রাইনোসেরোস’ এর গল্প আপাতদৃষ্টিতে অদ্ভুত, বা নাটকের ভাষায় যাকে বলে ‘অ্যাবসার্ড’। একটি ছোট শহরে একে একে মানুষ গণ্ডারে পরিণত হতে শুরু করে। প্রথমে ঘটনাটি অস্বাভাবিক বলে মনে হলেও, ধীরে ধীরে সেটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। প্রতিবাদীরা চুপ করে যায়, সংশয়ীরা যুক্তি খুঁজে বের করে, আর শেষ পর্যন্ত প্রায় সকলেই গণ্ডারে পরিণত হয়। কেবল একটি চরিত্র, বেরঁজে, শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়েই থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
আওনেস্কো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে এই নাটক লিখেছিলেন। তাঁর চোখের সামনে শিক্ষিত, ভদ্র, সংস্কৃতিবান মানুষরা কীভাবে ফ্যাসিবাদের সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতাই নাটকের ভিত্তি। কিন্তু নাটকটির কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গল্প নয়। ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য, সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে মিশে যাওয়ার চাপ, এবং ভিন্নমতকে অস্বাভাবিক বলে চিহ্নিত করার প্রবণতাকে বিশ্বব্যাপি ফ্যাসিবাদের লক্ষণ বলে চিহ্নিত করেন আওনেস্কো।
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রতি মোহ ক্রমশ বাড়ছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করা, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনা, সংখ্যালঘুদের সন্দেহের চোখে দেখা, ইতিহাসকে নতুনভাবে লেখা – এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই পরিবর্তনগুলি হঠাৎ করে ঘটে না। মানুষ প্রথমে আপস করে, তারপর মানিয়ে নেয়, তারপর সমর্থন করে। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ নোয়াম চমস্কির ভাষায় যাকে বলে সম্মতির উৎপাদন বা ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’। ‘রাইনোসেরোস’ নাটকটির মধ্যে আমরা ধীর রূপান্তরের বিশেষভাবে দেখতে পাই। গণ্ডার হওয়ার আগে মানুষ নিজের কাছে নানা যুক্তি খুঁজে পায়।
গত এক দশকে আমরা দেখেছি জাতীয়তাবাদের একটি ক্রমশ সংকীর্ণ সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, যেখানে রাষ্ট্র, জাতি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয়কে প্রায় একাকার করে দেখা হয়। ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে মতাদর্শগত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, সংখ্যালঘুদের নিয়ে ভয়ের রাজনীতি, এসব এখন আমাদের পরিচিত বাস্তবতা। আওনেস্কোর নাটক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় – কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি নির্ভর করে সাধারণ মানুষের সম্মতি, নীরবতা এবং মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতার উপর। যখন চারপাশের সবাই একই কথা বলছে, তখন ভিন্ন কথা বলার সাহস ক্রমশ কমে যায়। মানুষ নিজের মত বদলায় না, বরং নিজের নীরবতাকে যুক্তিযুক্ত করে তোলে। এই মনস্তত্ত্ব আজকের সামাজিক মাধ্যম-চালিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরও স্পষ্ট। অ্যালগরিদম আমাদের এমন এক জগতে আটকে রাখে, যেখানে আমরা কেবল নিজেদের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। ফলে অন্য মত অস্বাভাবিক বা বিপজ্জনক বলেও মনে হতে শুরু করে। আওনেস্কোর গণ্ডাররা আসলে এই মানসিক রূপান্তরেরই প্রতীক।
ক্ষমতা বদলায়, পতাকার রং বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে আপস করার সংস্কৃতি একই থেকে যায়। শিল্পী বা বুদ্ধিজীবী, উচ্চবিত্ত নাগরিক সমাজ হোক বা গ্রামের প্রান্তিক মানুষ, সব ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বেশিরভাগ সময়েই নিজের সুবিধার্থে ক্ষমতার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নেন সাধারণ মানুষ। এখানেই বেরঁজে চরিত্রটির গুরুত্ব। তিনি কোনো নায়ক নন, কোনো বিপ্লবীও নন। তিনি দ্বিধাগ্রস্ত, দুর্বল এবং প্রায়শই বিভ্রান্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি গণ্ডার হতে অস্বীকার করেন। আওনেস্কো যেন বলতে চান, প্রতিরোধের জন্য অসাধারণ মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল নিজের বিচারবুদ্ধিকে পুরোপুরি সমর্পণ না করা।
আজ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষকে ক্রমাগত কোনো না কোনো পরিচয়, মতাদর্শ বা জাতীয়তাবাদের ছাঁচে ঢালার চেষ্টা চলছে, তখন ‘রাইনোসেরোস’ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই আসে, যখন মানুষ স্বেচ্ছায় প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। শোভাবাজারে ‘ষন্ডার’ মঞ্চস্থ হওয়া তাই আমাদের সময়ের ভীষনভাবে প্রাসঙ্গিক। গণ্ডারের পাল হয়তো বারবার ফিরে আসবে, নতুন নামে, নতুন স্লোগানে। কিন্তু প্রতিটি সময়েই কিছু মানুষের কাজ হবে মানুষ হয়ে থাকার জেদটুকু ধরে রাখা।