লিখছেন সৌম্যা ঘোষ ও প্রত্যূষা পান।
কলকাতা, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস-এই তিন শহরেই ব্যাপক ভাবে রাস্তায় বই বিক্রি হয় আজও রমরমিয়ে। বই থেকেই সভ্যতার শুরু… গ্রিসের প্যাপিরাসের গল্প আমরা কে না জানি! আবার ত্রুফো তাঁর ছবি ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’-এর শেষে দেখাচ্ছেন, সভ্যতার শেষে বই হয়ে যাচ্ছে গাছপালা সব কিছুই…
তবে আজ ক্রমাগত বদল হচ্ছে প্রযুক্তির, বদলাচ্ছে বই পড়ার ধরণও। স্ক্রিনটাইম বাড়ছে। ই-বুক দখল করছে বইয়ের বাজার। বাড়ছে গ্রাফিক নভেল। কেউ বলছেন, ডিজিট্যাল যুগে বই পড়ার দিকে তরুণ প্রজন্মের ঝোঁক কমছে। আবার কেউ বলছেন, বিভিন্ন অ্যাপ থেকেই তারা পড়ে নিচ্ছে বই। কাজেই বইপোকাদের দুপুর রোদে কলেজ স্ট্রিটে ঘুরঘুর করতে দেখা যেন রূপকথা হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত…সত্যজিতের মত ব্যক্তিত্বও যেভাবে রাস্তায় ঘুরে বই কিনতেন, আজ তার উদাহরণ আর কোথায়?
মে মাসের এক গরমের দুপুরে ট্রামলাইনের তরফে কলেজস্ট্রিট-সহ রাসবেহারী ও গড়িয়াহাটে গিয়েছিলাম আমরা। কথা বলছিলাম নানা প্রকাশকদের সাথে ও পুরোনো বই দোকানিদের সাথে। জানছিলাম, ঠিক কি অবস্থা তাঁদের? কতটা লড়াই করতে হচ্ছে বেঁচে থাকার জন্য?

রাসবিহারী মোড়ে ফুটপাতে কল্যাণ ঘোষের বইয়ের দোকান বহু পুরোনো। বহু বছর ধরেই তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে, আগামী প্রজন্ম নিয়ে তাঁর গলায় হতাশার সুর। জানালেন, ডিজিটাল যুগে পত্র-পত্রিকার বিক্রি কমে গেছে। বড় বড় প্রকাশনী সংস্থাগুলো সবাইকেই প্রায় সমান কমিশন দিয়ে বই বিক্রি করছে। পাশাপাশি, সারা বছর জুড়েই চলছে বইমেলা। ফলে, পাঠক সেখানেই ভিড় বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, পাঠক সংখ্যা কমছে, তার জন্য দায়ী অভিভাবকরাও। পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই তাঁরা সন্তানদের বেঁধে রাখছেন। কমেছে লিটল ম্যাগাজিন কালচারও। এই গোষ্ঠীর পাঠকরা এখন বড় বড় বইয়ের ক্রেতা। তাই, নিজেদের পয়সায় লিটল ম্যাগাজিন ছাপাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলত, টান পড়ছে এই সকল পুরোনো বই-বিক্রেতাদের ব্যবসায়। ফাশান পত্রিকাও রাখতে হয় কখনও কখনও বাঁচার তাগিদেই। কল্যাণবাবুর কাছে তাঁর বইয়ের দোকান মানে বয়সকালে শুধু অবসর সময় কাটানো মাত্র।

সুবর্ণরেখা যেমন বইপোকাদের চিরকালের ঠেক ছিল, তেমনই দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়াহাটের ‘অহনায়ন’ সিরিয়াস পাঠকদের বিপুল সম্ভার। প্রবীর চট্টোপাধ্যায় ‘অহনায়নে’র কর্ণধার। নয়ের দশকে গড়িয়াহাটের বেসমেন্ট মার্কেটে এই দোকানের পুনর্বাসন হয়েছে। তার আগে বুলেভার্ডেই চলত দোকান। আগে, রাজনৈতিক ভাবে সমাজ বদলানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। পরে, সংস্কৃতির হাত ধরে এই লড়াই জারি রেখেছেন। মূলধারার বাইরের দুষ্প্রাপ্য বই এখানে খুব সহজেই মেলে। বিশেষ ধারার বই বিশেষ পাঠকদের হাতে বুঝে বুঝে তুলে দেওয়াই প্রবীরবাবুর কাজ। তাই অহনায়ন নিজের মত এক স্টাডি সার্কেলই গড়ে তুলেছে। যেখানে বইয়ের দামের বদলে মানই গুরুত্ব পেয়েছে বরাবর। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, গবেষক, অন্য ধারারার কবিতা ও ছোটগল্পের পাঠকদের মধ্যে দোকানটি জনপ্রিয়। গোটা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রবীরবাবুর পাঠক। অহনায়নের বিশেষ পাঠকবৃত্তে ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী, নবারুণ, গৌতম ঘোষ প্রমুখ। এখনও ‘অহনায়নে’ সাহিত্য গোষ্ঠীর আড্ডা বর্তমান।

প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাইকে বই ও পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছেন তরুণ সাউ। নানা কাগজের দপ্তর ও ব্যক্তিত্বদের বাড়িতেও এতকাল বই পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। আনন্দবাজার দপ্তরই হোক বা ঋতুপর্ণ ঘোষের বাড়ি, তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যেন বাংলা সাহিত্যের পরিবর্তনের জীবন্ত দলিল। তরুণবাবুর এই যাত্রার সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় ৪৫ বছর আগে, তাঁর বাবার হাত ধরে। কলকাতার নিউ মার্কেটের একটি বইয়ের দোকানে চাকরি করতেন তাঁর বাবা। পরবর্তীকালে তিনি দোকানের মালিকের পরামর্শ নিয়েই নিজস্ব ব্যবসা শুরু করেন। তিনি সাইকেলে গ্রাহকদের কাছে বই ও বিদেশি ম্যাগাজিন পৌঁছে দিতেন। তরুণবাবু গ্র্যাজুয়েশন সম্পূর্ণ করার পর তাঁর বাবার সাথে একটি পুরনো সাইকেল নিয়েই কাজে যোগ দেন। বইয়ের দোকানে গিয়ে বই বাছার সময় পাঠকদের কাছে অনেক সময় থাকে না। তাই পাঠকদের রুচি ও পছন্দ বুঝে সে মত নির্দিষ্ট বই বাড়ি বা অফিসে পৌঁছে দেন তিনি। তবে কিন্ডল, ই-বুক বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম খুব একটা সফল হয়নি বলে তরুণবাবুর ধারণা। তাঁর মতে, পাঠকরা এখনও ছাপা বই পড়তে বেশি পছন্দ করেন। সত্তর-আশির দশক থেকে বইপোকাদের মতই বই পড়েছেন ট্রামলাইনের সম্পাদক তথাগত দত্ত।
তখন ছিল অ্যানালগ দুনিয়া। অর্থাৎ, ডিজিটাল আসতে অনেক বছর বাকি। পরবর্তীতে পেশার সূত্রে কম্পিউটারের বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হন। চোখের সামনে ডিজিটালাইজ়ড যুগের আমূল পরিবর্তন হতে দেখেন। তবে বইপড়া সাধারণভাবে কমছে বলেই মনে করেন তিনি। অন্য দিকে লিটল ম্যাগাজ়িনের একটা নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী ছিল এতকাল। সেটাও এখন হারিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য তাঁর। সন্দীপ দত্ত প্রয়াত হওয়ার পর লিটল ম্যাগ লাইব্রেরির অবস্থাও ভালো হয়। ন্যাশানাল লাইব্রেরি বা রামকৃষ্ণ মিশন লাইব্রেরিতে ক জন যায় আজ, আশঙ্কা তথাগতবাবুর। তবে আজকাল
‘গ্রাফিক নভেল’ চলছে বাজারে। হচ্ছে তাকে ঘিরে কমিকনের মত ইভেন্টও।
তবে সেটারও একটা ‘লিমিটেশন’ রয়েছে। কারণ, তথাগতবাবুর মতে, সিনেমা এখনও বইয়ের জায়গা নিতে পারেনি। ‘ওয়াদারিং হাইটস’কে নিয়ে ছবি করতে গিয়ে কালজয়ী পরিচালক লুই বুনুয়েল এমনই আক্ষেপ করেছিলেন! কারণ, ‘ওয়াদারিং হাইটস’ না পড়া দর্শকদের কাছে একটা আলাদা আবেদন তৈরি করবে।
চন্দ্রবিন্দু গানে লিখেছিল—
বাঁ-পকেটে লোক লোকনাথ,
ডানে লাকা-ফুকো
পড়বার আগে বই
একবার শুঁকো…
বই পড়ার এই গন্ধর বিস্ময় আবহমানের।
সময় বদলাবে, মাধ্যমও বদলাবে। কিন্তু এই বিস্ময় বদলাবে না। বইকে ঘিরেই বারবার মানুষ জড়ো হবে। গড়ে উঠবে জমায়েত। বদলাবে সমাজ।
বই মানুষের অনুভূতি, চিন্তা ও কল্পনার গভীর আশ্রয়, এমনটাই বিশ্বাস বইপোকাদের। বই-পড়া আসলে এক ধরণের আধ্যাত্মিকতা, তাই সমাজ হোক বা ইতিহাস, মানুষ নিজেকে খুঁজতে বারবার বইয়ের কাছে ফিরবেই। জেমস জয়েস হোক বা মার্কেজ-সভ্যতা ধ্বংস হলেও বারবার তাঁদের লেখা থেকেই সেই সময়কে খুঁজে পাওয়া যাবে বারবার।
ডিজিটাল যুগের মধ্যেও কাগজের বইয়ের আবেদন কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না।