
মণীন্দ্র গুপ্তের লেখা পড়তে পড়তে পৌঁছে যাওয়া যায় আত্মমগ্নতার এক অন্তর্গূঢ় চেতনায়। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, শব্দের প্রাবল্য, শব্দ প্রয়োগ-ব্যবহার… বুনে চলে নির্মেদ এক আত্মচরিত।
“… মদ মাংস মধু পুড়ছে, মিষ্টি গন্ধ অগুরু চন্দন পুড়ছে। দুর্গন্ধ পুড়ে পুড়ে গন্ধহীন হচ্ছে। পুড়ে সব হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ফুরোচ্ছে না। কোনোদিন ফুরোবে না।
এই অফুরন্তই ব্রহ্ম!” : (নুড়ি বাঁদর)
একদিকে হানাহানি-দংশন… অন্যদিকে নির্মোহ কন্ঠে কালের স্বীকারোক্তি! স্বাধীনতা-উত্তর বাংলার কবি তথা লেখক মণীন্দ্র গুপ্ত এমনই।

মণীন্দ্র গুপ্ত কোনোদিনই বিমর্ষ করেননি, বরং, জুগিয়েছেন বাঁচার স্পর্ধা। নৈঃশব্দ্যের এক ভিন্নমাত্রা তৈরি হয় তাঁর লেখায়।
স্মৃতির উপলখণ্ড কুড়িয়ে কুড়িয়ে তিনি নির্মাণ করেন প্রশান্তির এক মনোরম বেদী। তাঁর কবিতা, ঝরঝরে গদ্য মগ্নচৈতন্যের গভীর থেকে উঠে আসা শব্দস্রোত, যা আবিষ্ট করে বোধির অভ্যন্তরকে।
কবি ও শিক্ষক শুভজিৎ গুপ্ত মণীন্দ্র গুপ্তের একজন নিবিড় পাঠক। তিনি জানিয়েছেন, জীবনানন্দকে তিনি দেখেননি কিন্তু মণীন্দ্র গুপ্তকে দেখেছেন।
উপলব্ধি করেছেন, একজন কবির জীবন কেমন হয়।
একজন কবি যিনি কাব্য সংগ্রহে সমগ্রের প্রায় এক চতুর্থাংশ কবিতা বাদ দিয়ে দিতে পারেন।
১৯৪৯ সালে ছাপার অক্ষরে প্রথম প্রকাশিত হয় মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা।
প্রথম বই নীল পাথরের আকাশ, ১৯৬৯। বইপ্রকাশের জন্য কুড়ি বছরের অপেক্ষা।
এই ধৈর্য একজন কবির সম্পদ।একজন লেখকের আয়ু বৃদ্ধি করে দেয়। আবহমান বাংলা কবিতা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করতে উদ্যোগ নেয় অফবিট প্রকাশনীর তরুণ প্রকাশক শ্যামল ধর। অর্থাভাবে এক বছরের বেশি সময় পিছিয়ে যায় প্রকাশ। মণীন্দ্রবাবু অপেক্ষা করেছিলেন হাসিমুখে। সাহস দিয়ে বলেছিলেন, “আমি অন্য কোথাও দেব না অপেক্ষা করব”।

উচ্চাঙ্গ আবৃত্তির কবিতা তিনি কখনো লেখেননি। তাঁর লেখা নিভৃতে পড়তে হয়, পড়তে পড়তে অন্য এক জগতে প্রবেশ করার অনুমতি পাওয়া যায়।
তিনি আরও জানান, কবিতার কথা র পরে চাঁদের ওপিঠে (জুন ১৯৯১), পরবাসী কুড়ানি ও দারুমা সান (জানুয়ারি ১৯৯৮) গদ্যচর্চার নতুন ভুবন। সমকালকে স্তম্ভিত, বিস্মিত, শিক্ষিত করে তুলেছে।
অক্ষয় মালবেরি অবিভক্ত বাঙালি জীবনের অন্তর্লীন ধারাভাষ্য।
অশীতিপর বয়সে লেখা তিন তিনটি উপন্যাস বাংলা উপন্যাসের অন্যধারার জন্ম।
শতবর্ষে দাঁড়িয়ে কবি ,লেখক, সম্পাদক , আবহমান বাংলা কবিতা ইতিহাস সংরক্ষক, চিত্রকর মনীন্দ্র গুপ্তকে উপলব্ধি করার মত সাবালক বাংলা ভাষা কি এখনো হয়েছে প্রশ্ন জাগে!

আসলে, মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা যেন নামতা লেখার স্লেটে পরীর গল্প। প্রকৃতিলগ্ন নির্ভেজাল অনুভূতির মালা গাঁথা হয় সেখানে। নিসর্গের আশ্রয়ে তা বারেবারে পরমের অভিসারী হয়।
তাঁর কবিতা সাবলীল এবং হৃদয়গ্রাহী, প্রলয় বা সমাধি এবং মৃত্যুচেতনার অভিঘাতে উপভোগ্য।
মণীন্দ্র গুপ্তের লেখার বেদনাও যেন সংবেদন। যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পাঠককে নিয়ে যান আটপৌরে জীবনের কাছাকাছি; বাস্তবের মুখোমুখি।
সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে তাই মণীন্দ্র গুপ্ত আত্মবিগলনের এক ভিন্ন সুর।