অরূপরতন চক্রবর্তী

আশির দশকের কলকাতায় রথের মেলা মানেই ছিল আমার ছোটবেলার সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিনের একটি। রথের দিনটা এলেই সকাল থেকেই মনটা কেমন যেন উড়ু উড়ু করত। নতুন জামা পরে বিকেলের দিকে বাবা-মা, দাদা-দিদি বা পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে মেলায় যাওয়ার আনন্দটাই ছিল আলাদা। তখন তো শপিং মল, মোবাইল ফোন বা সপ্তাহান্তের বিনোদনের এত রকম ব্যবস্থা ছিল না। তাই রথের মেলাই ছিল আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের কাছে বছরের অন্যতম বড় উৎসব।
মেলায় ঢুকেই চোখে পড়ত নাগরদোলা, রঙিন আলো, খেলনার দোকান আর মানুষের ভিড়। কত রকমের বাঁশি, কাঠের খেলনা, কাগজের পাখা, বেলুন, মুখোশ— সবই যেন কিনে ফেলতে ইচ্ছে করত! কিন্তু বাড়ি থেকে যে ক’টা টাকা পাওয়া যেত, তার মধ্যেই হিসেব করে খরচ করতে হতো। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর হয়তো একটা বাঁশি বা ছোট্ট খেলনা কিনেই মন ভরে যেত। বাবা-মায়ের সেই চিরচেনা কথা— ‘সবকিছু একদিনে কিনতে নেই’… আজও কানে বাজে।

খাবারের দিক থেকেও রথের মেলা ছিল এক অন্য জগৎ। ঝালমুড়ি, ঘুগনি, পাঁপড় ভাজা, ফুচকা, জিলিপির গন্ধে চারদিক ম-ম করত। বাড়ি থেকে বারবার বলা হতো বেশি বাইরের খাবার না খেতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা ঝালমুড়ি বা গরম জিলিপি খাওয়া যেন নিয়মই ছিল।
কাঠের সেই নাগরদোলায় একবার চড়ার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, দূর থেকে মাইকে বাজতে থাকা বাংলা গান, আর ভিড়ের মধ্যে পরিচিত কারও সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া— এসবই ছিল সেই সময়ের খুব পরিচিত ছবি।
রথ আজও আছে, মেলাও বসে। কিন্তু সেই মেলার চরিত্র যেন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছে তালপাতার ভেঁপু, শোলার পাখি, হাতপাখা, তালপাতার সেপাই কিংবা কাগজের কুমির। আর চোখে পড়ে না কাঠের নাগরদোলা, কাচের রঙিন পাখি বা চোরবাগানের বিখ্যাত লাট্টুর দোকান। একসময় যেসব জিনিসই ছিল রথের মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ, আজ সেগুলি কেবল স্মৃতির পাতায়। তবে কিছু ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে। আছে জিলিপি আর পাঁপড় ভাজা, গন্ধ এখনও ভেসে আসে মেলার বাতাসে, যেন পুরনো দিনের সঙ্গে বর্তমানের শেষ যোগসূত্র হয়ে।

আজ এত বছর পরে বুঝতে পারি, রথের মেলার আসল আনন্দ শুধু নাগরদোলা বা খেলনা ছিল না। সেটি ছিল একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ, অল্পের মধ্যে খুশি খুঁজে পাওয়ার আনন্দ। মধ্যবিত্ত বাঙালি সংসারের সীমিত সাধ্যের মধ্যেও বাবা-মা আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেন। আজকের আধুনিক বিনোদনের যুগে দাঁড়িয়ে সেই রথের মেলার কথা মনে পড়লে এখনও মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দগুলো হয়তো সত্যিই খুব সাধারণ আর খুব আন্তরিক ছিল।