দেওয়াল, উঠোন, মন্দির, বা ঘরের বারান্দা, সাদা চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা কয়েকটি রেখা মুহূর্তের মধ্যেই একটি সাধারণ স্থানকে উৎসবের পরিসরে বদলে দিতে পারে। বাংলার এই নিজস্ব শিল্পরূপ – আলপনা। আজ দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, পয়লা বৈশাখ, বিয়ে কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলপনা যেন স্বাভাবিক এক উপস্থিতি। কিন্তু এই শিল্পের ইতিহাসে লুকিয়ে আছে কৃষিজীবন, নারীদের সৃজনশীলতা, লোকবিশ্বাস এবং বাংলার সামাজিক স্মৃতিরও ইতিহাস।

‘আলপনা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘আলিম্পন’ বা ‘আলেপন’ থেকে, যার অর্থ লেপন করা বা অলংকৃত করা। প্রাচীন ভারতে মাটি, দেওয়াল কিংবা মেঝে সাজানোর নানা রীতি ছিল। তবে বাংলার আলপনা সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের মধ্যেও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। অন্য অঞ্চলে যেখানে রঙিন গুঁড়ো বা খড়ি বেশি ব্যবহৃত হয়, বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে আলপনা আঁকা হয়েছে চালের গুঁড়ো গোলা সাদা পেস্ট দিয়ে। এই চল ছিল সমৃদ্ধি, অন্ন এবং জীবনের প্রতীক। ফলে আলপনা ছিল শুভেচ্ছা ও প্রাচুর্যেরও প্রতীকী প্রকাশ।
আলপনার জন্ম কৃষিনির্ভর সমাজে। বীজ বোনা, নতুন ধান ঘরে তোলা, বর্ষার আগমন, ফসল কাটার উৎসব ইত্যাদি সব উপলক্ষে বাড়ির উঠোনে আঁকা হতো নানা প্রতীক। পদ্ম, শঙ্খ, ধানের শিষ, মাছ, সূর্য, চাঁদ, লতা, পাখি – সবই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভাষা, লোকজ জীবনের অভিজ্ঞতায়।

আলপনার মূলত নারীদের শিল্প। বহু শতাব্দী ধরে বাংলার গ্রামে শিল্পের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই মায়েরা, দিদিমারা, কাকিমারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। মুখে মুখে, দেখে দেখে, হাত ধরে শেখার এই ধারাই ছিল আলপনার বিদ্যালয়। বাংলার শিল্পেইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায় তৈরি হয়েছে ঘরের অন্দরমহলে, নামহীন নারীদের হাতে।
মধ্যযুগে বৈষ্ণব আন্দোলনের বিস্তার এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন ব্রত ও পূজার সঙ্গে আলপনার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। লক্ষ্মীপুজোর পায়ের ছাপ, মনসাপুজোর বিশেষ নকশা, বরের পিঁড়ির অলংকরণ কিংবা ব্রতকথার আলপনা, সবই আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিয়ে গড়ে ওঠে। বাংলার একেক অঞ্চলের আলপনার ধরনও আলাদা। নদীয়া, বীরভূম, মেদিনীপুর বা উত্তরবঙ্গের নকশায় সেই আঞ্চলিকতার ছাপ স্পষ্ট।
উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ায়, যখন বাংলায় লোকশিল্প নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, তখন আলপনাও ঘরের বাইরে শিল্প-আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এই সময়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শান্তিনিকেতনের শিল্পীরা লোকশিল্পকে ভারতীয় আধুনিক শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে নন্দলাল বসু আলপনার নকশা, সরল রেখা এবং প্রতীকী ভাষা থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব, পৌষমেলা কিংবা সমাবর্তনের মাটির চত্বরে আঁকা আলপনা ধীরে ধীরে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়।
সময়ের সঙ্গে আলপনার উপকরণও বদলেছে। চালের গুঁড়োর বদলে এখন অ্যাক্রিলিক রং, পোস্টার কালার, এমনকি ডিজিটাল প্রিন্টও ব্যবহার হচ্ছে। শহরের বহুতল আবাসনে সিমেন্টের মেঝেতে, ক্যাফের দেওয়ালে, বইমেলার প্রবেশদ্বারে কিংবা পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রায় আলপনা নতুন ভাষা খুঁজে নিয়েছে। একসময় যা ছিল মূলত নারীদের ঘরোয়া শিল্প, আজ তা জনপরিসরের শিল্পেও পরিণত হয়েছে।
মাটির উঠোন থেকে শহরের কংক্রিট, ব্রতের আচার থেকে সমকালীন শিল্প, ঘরের দাওয়া থেকে আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রদর্শনী, প্রতিটি যাত্রাপথে আলপনা তার মূল পরিচয় হারায়নি। কয়েকটি সাদা রেখায় এখনও শিল্পের জন্ম হয় মানুষের প্রতিদিনের জীবনেই।
