
সৌম্যা ঘোষ
দু-সিগারেট গলির মুখেই রাখা একটা টানা রিকশা। গঙ্গাকলে অনবরত জল পড়ে চলেছে। উল্টোদিকের আধভাঙা বাড়ির বেশ কিছুটা একটা বিরাট বটগাছ দখল করে আছে। পাশেই ঘা ঘেঁষে দুটো বাড়ি পরপর উঠেছে। ওই বাড়ির ঝুল-বারান্দা থেকে গলা বাড়িয়ে বেশ খোশমেজাজে গল্প জুড়েছেন এক মহিলা। উল্টোদিকের খিড়কির জানলায় দাঁড়িয়ে অন্যজন।
ওপরের চিলেকোঠা ছাদের গা-এ পুরোনো একটা অ্যান্টেনার শিক বের হয়ে আছে। একটা চাঁদিয়াল ঘুড়ি আটকে আছে সেখানে। একদল কাকের তীব্র চিৎকার!
আমার দাদু মজা করে বলতেন, বাড়ি ফেরার সময় সন্ধের আগে কাকেরা না কি মিটিং ডাকে!
গোধূলি তখনও হয়নি। শুভ্র নীল আকাশে শরতের সাদা মেঘ একটা কী বার্তা নিয়ে ভেসে যাচ্ছে… পুজো আসছে।
সামনেই প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। বৃষ্টি ভেজা বাঁশের গন্ধে চারপাশটা আরও বেশি আর্দ্র মনে হয়…
হাতিবাগান নবীন পল্লী। এর আগে পুজোয়
আবোল-তাবোলের সাদা-কালোয় পাড়া সেজে উঠেছিল। খুবই বিখ্যাত হয়েছিল সে প্যান্ডেল। এ বারে, রঙধনুর আমেজে সেজে উঠেছে ‘হাসি-খুশি’ পাড়ায়। এবারের থিম, যোগীন্দ্রনাথ সরকার।

প্যান্ডেলের ভিতর রঙবেরঙের হাতে আঁকা ছবি। চিত্রশিল্পী শঙ্কর পাল। বৃষ্টির জন্যই আড়ালে রাখা আছে সব।
আর ক’টা দিনের অপেক্ষামাত্র…
পাড়ার দেওয়াল, বারান্দা, রাস্তা, ল্যাম্পপোস্ট সবটাই বদলে যাবে ক্যানভাসে।
তবে, আবোল-তাবোল হয়ে আজকের হাসি-খুশি-র পাড়া— বৈচিত্র্যময় এইসব থিমের নেপথ্যে কি কেবলই শিশুরা?
এই পুজোর থিম নির্বাচন করেন দীপ্ত ঘোষ। তিনি ট্রামলাইনকে জানালেন, বিশেষভাবে শিশুসাহিত্যকে কেন্দ্র করেই থিম গড়া তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।
২০২৩ সালে ‘আবোল তাবোল’-এর প্রকাশনার শতবর্ষকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল ‘আবোল তাবোল’ পাড়া। ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথম প্রকাশিত হয় সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’। সেই বছরই ১০ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন তিনি। তাই, সুকুমার ও তাঁর সৃষ্টিকে একসঙ্গে শ্রদ্ধা জানানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
‘আবোল তাবোল’-র চিত্রভাষার সঙ্গে সাদা-কালোর একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকলেও, এবার আয়োজকদের মনে হয়েছে পাড়ায় রঙ পরিবর্তন প্রয়োজন। এই ভাবনা থেকেই ‘আবোল-তাবোল পাড়া’ এবার রঙিন ‘হাসিখুশি পাড়া’।
দীপ্তবাবু আরও জানালেন, ‘যোগীন্দ্রনাথ সরকারের নামের সঙ্গে আজকের প্রজন্ম আর ঠিক ততটা পরিচিত নয়। সেই বিস্মৃতির জায়গা থেকেই এই থিম।’
যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘অ-অজগর’ বা ‘দীর্ঘ ঊ কি আছে ঝিলে’—
একটি বড় আকারের ‘ঊ’ ল্যাম্পপোস্ট থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে আর থাকবে পারফরম্যান্সের চমকও।
রাস্তা আটকে নয়, হবে বারান্দা থেকে। মেয়েরাই করবে।
উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়ির বারান্দাকে ব্যবহার করে ছড়া পাঠ বা অভিনয়ের পরিকল্পনাও আছে তাঁদের। এক বাড়ির বারান্দা থেকে অন্য বাড়ির বারান্দায় কথোপকথনের মতো করে ছড়াগুলিকে পরিবেশন করার ভাবনাও রয়েছে।
এই গলিরই পাশ দিয়ে ইস্কুল থেকে বাচ্চাকে নিয়ে ফিরছিলেন মধুমিতা মিত্র। বললেন, ‘আমার ছেলের হুঁকোমুখো হ্যাংলা, ট্যাঁশ গরু, প্যাঁচা কয় প্যাঁচানি সবই তো শেখা এ পাড়া থেকে। যাক, হারাধনের দশটি ছেলে-র বাইরেও যোগীন্দ্রনাথ সরকারের আরও কিছু ছড়া জানবে।’
এ পাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত নিখিলেশ ঘোষ। বললেন, ‘ছোটবেলায় মায়ের মুখ থেকেই যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ছড়া শেখা। এখন তো আর মা নেই। সত্যিই অভাব বোধ হয় যখন চারপাশে শুনি, ইস্কুলে-ইস্কুলে বাংলা পড়ানোটা প্রায় উঠেই যাচ্ছে। সেখানে এই উদ্যোগকে ঘিরে যদি বাচ্চারা হাঁটতে-চলতে বাংলা অক্ষরটুকু চেনে, শেখে… সেটাই তো অনেক। তবে, হ্যাঁ, প্যান্ডেলের এই সাজসজ্জা বড্ড মায়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে…’