ঝাপসা চোখে দেখা, সেই শহর

অভিজিৎ বসু
‘পরিবর্তনে’র সময়ে নাকি এরকমটাই হয়ে থাকে। এমনই শুনেছিল সে। তাই অনেকদিন হল অর্পণ ঘরছাড়া। তার নিজের ঘর, নিজের বাড়ি। সেসব ছেড়ে বহুদিনই শহরের প্রান্তে, এই শহরের সীমান্ত-অঞ্চলে বাস করে সে। কিন্তু মনের গভীরে সযত্নে লালন করে চলে তাদের সেই বাড়ি, পাড়া, আরও কত কী— যে-বাড়ির ছোট্ট বসার ঘরে, মায়ের কাছে শুনেছিল, তার দাদামণির সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন মহেন্দ্র দত্ত, কখনও-বা ভূপেন দত্ত। দাদামণি ছিলেন একজন সুভদ্র সুশিক্ষিত মানুষ, ওঁর কাছে আস্ত গোটা শেক্সপিয়ার ছিল, সোনার জলে বাঁধানো মলাটে। ছিল সম্পূর্ণ বার্নার্ড শ’। অর্পণকে বাবা দেখিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় ‘আর্ট অফ ক্রিকেট’ হার্ড বাউন্ডের বইটা, স্বয়ং ক্রিকেট-ঈশ্বর স্যর ডন ব্র্যাডম্যানের সই-সমেত। কোথায় গেল তারা— সঙ্গে আরও বেশকিছু অমূল্য বই? আটাত্তরের বন্যায়, না স্রেফ উইয়ে খেলো— সেসবের হিসেব রাখেনি সে।

শিকড় ছেড়ে বেরিয়ে এসে একদিন সে চেয়েছিল স্মৃতি উজিয়ে, খুব খাপছাড়া গোছের হলেও কিছু একটা লিখে রাখতে। সদ্য মাতৃবিয়োগের যন্ত্রণার হাত থেকে বাঁচতে শুরু করল তার চেনা মানুষ, চেনা পাড়া, নিজের বাড়ি, এই কলকাতা শহরের মধ্যে গড়ে-ওঠা তাদের মহল্লা— এইসব নিয়ে হাবিজাবি কিছু লিখতে। যেন এই সবকিছুকেই ছুঁতে চাইছিল হৃদয় দিয়ে, অক্ষরের বুনটে। সে-লেখা শেষ করতে পারেনি অর্পণ। শেষবারের মতো বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময়ে নিজের নিকন ক্যামেরায় কাঁপা-কাঁপা হাতে একটা ভিডিও করেছিল সে। একটা টানা শটে পরপর তাদের ঠাকুরঘর, তিনতলার সিঁড়ি, দোতলার শোবার ঘর, রান্নাঘর, আবার সিঁড়ির অন্ধকার ডিঙিয়ে নীচের শ্যাওলাধরা উঠোন, চৌবাচ্চায় তখনও খানিক জল ছিল বোধহয়, ঘুলঘুলিতে গোলা পায়রার বুকনি, ডানদিকের ছোট্ট বসার ঘরটাকে পেরিয়ে ফের অন্ধকার, তারপর সদর দরজা যা হয়তো কোনো এককালে খিড়কি ছিল। নাহ্, সেই মনখারাপির সময়ে তার হাতে হাত রাখেনি কেউ, কাঁধ স্পর্শ করেনি। কিন্তু কাঁদছিল সে। যাবার কালে তার দু-চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। একবারের জন্যও কি পিছন ফিরে তাকিয়েছিল অর্পণ? আজ আর সেসব মনে পড়ে না তার।
তাদের বোস লেনের বাড়িটা প্রায় দুশো বা তারও বেশি বছরের পুরনো। বাড়িটি যিনি তৈরি করান, সে-যুগে তিনি ‘কোম্পানি’র উঁচু পদে ছিলেন। বোসেদেরই উদ্যোগে, তাদের প্রয়োজনে আশপাশে ক্রমশ ধোপা, নাপিত, তাঁতি এবং ব্রাহ্মণদের বসত গড়ে ওঠে। ও-পাড়ার সাত নম্বর বাড়িটি ছিল বোসেদের নিজস্ব প্রসূতিসদন, পাড়ার আঁতুড়ঘর। এখানেই জন্মেছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ওঁর মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন বোস পরিবারের মেয়ে। এ সবই অর্পণের শোনা কথা, যা প্রমাণ করার জন্য কোনো দস্তাবেজ তার হাতে নেই। তবে, মতান্তরে এ-ও জানা যায় যে সাত নম্বরের বাড়িটি আসলে নরেন্দ্রনাথের মাতামহী রঘুমণি দেবীর। বিবিধ কারণে তরুণ নরেনকে জীবনের বেশকিছুটা কাল কাটাতে হয়েছিল এই বাড়িতে। আরও কথিত আছে, এ বাড়িতেই নাকি একবার নরেনের খোঁজে ঠাকুর রামকৃষ্ণের পদার্পণ ঘটেছিল!

এহেন স্মৃতি-পর্যটনের মাঝে হঠাৎ-ই যেন তার চোখের ওপর এক দিগন্তজোড়া পর্দা নেমে আসে। সিনেমায় যেমনটা হয় আর কী! তারপর এলোমেলো ‘উড়ো খৈ’-এর মতো ভেসে বেড়াতে থাকে অসমাপ্ত লেখার পাতাগুলো। প্রথমদিকটায় খানিক ঝাপসা হলেও ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে কালির সেসব আঁচড়। অর্পণ শুরু করে তার পাঠ। আপন অক্ষরের পাঠ।
ছবি শীলভদ্র দত্ত
(চলবে)