বিদ্যাসাগরের সেই ‘ভাইপো’, যিনি আসলে তিনি নিজেই

নাম তাঁর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কিন্তু উনিশ শতকের বাংলার তুমুল সামাজিক বিতর্কে কখনও কখনও তিনি নিজের নামটি সরিয়ে রেখেছিলেন। সামনে এনেছিলেন এক অদ্ভুত ‘ভাইপো’-কে। সেই ভাইপোর নাম—‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’। কখনও ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপো-সহচরস্য’, কখনও বা ‘কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণঃ’।
এবার তাঁর ২০৬-তম জন্মবার্ষিকী।আজকের দিনে এমন হলে হয়তো বলা যেত—বিতর্কে নিজের নামে পোস্ট না করে বিদ্যাসাগর লিখছেন, ‘একজনের উপযুক্ত ভাইপো জানাচ্ছেন…।’ তারপর আসল লেখক কে, তা নিয়েই শুরু হয়ে যেত দ্বিতীয় দফার আলোচনা!
কিন্তু এই ছদ্মনামের পিছনে নিছক কৌতুক ছিল না। ছিল সময়ের প্রয়োজন, বিতর্কের কৌশল এবং বিদ্যাসাগরের স্বভাবসিদ্ধ ব্যঙ্গবোধ।
যখন সমাজসংস্কার মানেই সংঘাত
উনিশ শতকের বাংলায় বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ কিংবা নারীশিক্ষা—কোনওটিই সহজে উচ্চারণ করার মতো বিষয় ছিল না। প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল ধর্ম, শাস্ত্র, সামাজিক রীতি এবং তীব্র মতবিরোধ।
বিধবাবিবাহের পক্ষে শাস্ত্রীয় যুক্তি হাজির করার পাশাপাশি বহুবিবাহের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁর বক্তব্যের জবাবে প্রকাশিত হচ্ছিল নানা পুস্তিকা ও পাল্টা যুক্তি। ফলে বিতর্কও ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছিল।
এই আবহেই ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘অতি অল্প হইল’ এবং ‘আবার অতি অল্প হইল’। তারানাথ বাচস্পতির বহুবিবাহ-সমর্থক বক্তব্যের জবাব দিতে বিদ্যাসাগর সেখানে ব্যবহার করেন ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ নামটি। পরে সেই ভাইপো আবার ফিরে আসে ‘ব্রজবিলাস’-এ।
নামটি যতই অদ্ভুত হোক, কৌশলটি ছিল বেশ সরল—লেখকের পরিচিতির বদলে যুক্তিকে সামনে আনা। বিদ্যাসাগর তখন এমন এক পরিচিত নাম, তাঁর বক্তব্য প্রকাশের আগেই পাঠকের মনে পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান তৈরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ছদ্মনাম সেই পূর্বধারণার প্রভাব কিছুটা সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। আর সঙ্গে ছিল ব্যঙ্গের অবকাশ।
এক ভাইপো, কয়েকটি বই
‘ভাইপো’-র সাহিত্যিক জীবন কিন্তু বেশ দীর্ঘ।
১৮৮৪ সালের ‘ব্রজবিলাস’-এর মুদ্রিত সংস্করণে লেখকের পরিচয়—‘কবিকুলতিলকস্য কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’। গ্রন্থটি কলকাতার সংস্কৃত যন্ত্রে মুদ্রিত এবং এস. কে. লাহিড়ী অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল।
আবার ‘কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণঃ’ নামে প্রকাশিত হয় ‘বিধবাবিবাহ ও যশোহর হিন্দুধর্ম্মরক্ষিণী সভা’, যার পরবর্তী সংস্করণের নাম ‘বিনয়পত্রিকা’। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত ‘রত্নপরীক্ষা’-য় দেখা যায় আর-এক পরিচয়—‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য’।
অর্থাৎ, প্রয়োজন অনুযায়ী ভাইপোর পরিচয়ও বদলেছে। কখনও সে একা, কখনও তার ‘সহচর’ আছে, কখনও সে তত্ত্বের অনুসন্ধানী। রসিকতা এখানেই শেষ নয়।
ছাপাখানাও যখন নিজের
বিদ্যাসাগরের কাছে বই লেখা মানে শুধু কলম ধরা নয়। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংস্কৃত যন্ত্র ছাপাখানা এবং বই বিক্রির জন্য সংস্কৃত প্রেস ডিপোজিটরি।
তাই এই রচনাগুলির প্রকাশও ছিল তাঁর সময়ের মুদ্রণ-সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এগুলিকে আধুনিক অর্থে সংবাদপত্রের ‘কলাম’ ভাবা ঠিক নয়; মূলত স্বতন্ত্র পুস্তিকা ও গ্রন্থ হিসেবেই সেগুলি মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। ‘ব্রজবিলাস’-এর ক্ষেত্রে মুদ্রণ ও প্রকাশনার তথ্য সরাসরি গ্রন্থের মুদ্রিত সংস্করণেই রয়েছে।
নাম আড়ালে, কলম সামনে
বিদ্যাসাগরের এই ‘ভাইপো’-পর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি সম্ভবত এখানেই—তিনি নিজের পরিচয়কে নয়, নিজের বক্তব্যকে সামনে রাখতে চেয়েছিলেন।
এবং সেই বক্তব্যে যুক্তির সঙ্গে মিশেছিল বিদ্রূপ। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য কেবল কঠিন শাস্ত্রীয় ভাষাই নয়, কখনও কখনও হাস্যরসকেও তিনি ব্যবহার করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গের ধার তাই আজও আলাদা করে চোখে পড়ে।
২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে সাধারণত যে বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করা হয়, তিনি সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ, নারীশিক্ষার প্রবক্তা। সেই ছবির পাশে এই ‘ভাইপো’-টিকেও বসানো যাক। তাতে মানুষটিকে একটু সম্পূর্ণ দেখা যায়।
কারণ যিনি সমাজের অচলায়তনকে প্রশ্ন করতে জানতেন, তিনি জানতেন কীভাবে প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ করে তুলতে হয়। আর সেই কারণেই হয়তো ‘ভাইপো’-র গল্পের শেষটাও বেশ বিদ্যাসাগরসুলভ। ছদ্মনাম নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কলমের হাতের লেখা লুকোতে পারেননি।
ইতিহাস তাই অনেক আগেই ফিসফিস করে বলে দিয়েছে— ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ আর কেউ নন। ভাইপোর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর। এবং সেই ভাইপোর সবচেয়ে বড় পরিচয়— সে কথা বলত যুক্তির ভাষায়, আর হাসত বিদ্রূপের আড়ালে।