
ভারতীয় পাঠকের কাছে জেফ্রি আর্চারের প্রয়াণ শুধু একজন আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার লেখকের বিদায় নয়, বরং এক দীর্ঘ পাঠ-অভিজ্ঞতার অবসান। তাঁর বইয়ের সঙ্গে পরিচিত প্রজন্মের কাছে আর্চার ছিলেন এমন এক লেখক, যাঁর গল্প একবার শুরু করলে শেষ না করে ওঠা কঠিন। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে তাই বিশ্বসাহিত্যের পাশাপাশি ভারতীয় পাঠকমহলেও তৈরি হয়েছে নস্টালজিয়ার আবহ।
আর্চারের জনপ্রিয়তার কেন্দ্রে অবশ্যই Kane and Abel। দুই ভিন্ন জীবন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভাগ্যের টানাপোড়েনের এই উপন্যাস বহু ভারতীয় পাঠকের বই পড়ার স্মৃতির অংশ। Not a Penny More, Not a Penny Less, The Prodigal Daughter, A Matter of Honour কিংবা The Fourth Estate—তাঁর গল্পে বারবার ফিরে এসেছে সাফল্য, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতা, পতন এবং শেষ মুহূর্তে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কৌশল।
তবে আর্চারের লেখকজীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলির একটি তৈরি হয়েছিল জেলখানায়। ২০০১ সালে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার মামলায় দণ্ডিত হয়ে তিনি প্রায় দু’বছর কারাবন্দি ছিলেন। কিন্তু জেলের দেয়াল তাঁর লেখাকে থামাতে পারেনি। বরং সেই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর তিন খণ্ডের A Prison Diary—Hell, Purgatory এবং Heaven। বন্দিজীবনের একাকিত্ব, জেলের কঠোর নিয়ম, বিভিন্ন ধরনের বন্দির সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের কাহিনি এই তিন বইয়ে উঠে এসেছে। আর্চারের জীবনের এই পর্ব তাঁর পরিচিত ‘স্টোরিটেলার’ সত্তার পাশাপাশি একজন পর্যবেক্ষক লেখক হিসেবেও তাঁকে সামনে আনে।
আরেকটি বিশেষ জায়গা জুড়ে রয়েছে তাঁর ছোটগল্প। A Twist in the Tale, Twelve Red Herrings, To Cut a Long Story Short এবং Cat O’Nine Tales—ছোট পরিসরে দ্রুত গল্প এগিয়ে নিয়ে গিয়ে শেষ মুহূর্তে পাঠককে চমকে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্চারের দক্ষতা ছিল অনন্য। তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সহজে পাঠককে টেনে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত কৌতূহল ধরে রাখা।
সমালোচকদের মূল্যায়ন নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পাঠকের ভালোবাসায় আর্চারের জায়গা ছিল আলাদা। বিশেষ করে ভারতে তাঁর বইয়ের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, সাহিত্য কখনও শুধু ভাষা বা ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—একটি ভালো গল্প পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের পাঠককে স্পর্শ করতে পারে।
জেফ্রি আর্চার তাই পাঠকের কাছে শেষ পর্যন্ত শুধু Kane and Abel-এর লেখক নন। তিনি সেই গল্পকার, যাঁর বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত পৌঁছনোর তাগিদ বহু পাঠককে বারবার বই হাতে ফিরিয়ে এনেছে। তাঁর বিদায়ে সেই গল্পগুলিই এখন থেকে তাঁর হয়ে কথা বলবে।