নানা পাটেকর: মঞ্চ থেকে পর্দায়, অভিনয়ের এক অনন্য অধ্যায়ের অবসান

প্রয়াত হলেন ভারতীয় অভিনয়জগতের অন্যতম শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র অভিনেতা নানা পাটেকর। ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে তিনি হিন্দি ও মারাঠি—দুই ভাষার সিনেমাতেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গিয়েছেন।
আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অবশ্য সিনেমার পর্দায় আসার অনেক আগে থেকেই। স্কুলজীবনেই থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেন। মুম্বইয়ের স্যার জে জে স্কুল অব আর্ট থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি মারাঠি থিয়েটারে নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন। পরবর্তীকালে তাঁর মঞ্চাভিনয় তাঁকে এমন এক অভিনয়ভাষা তৈরি করতে সাহায্য করে, যেখানে সংলাপের চেয়ে চোখের দৃষ্টি, শরীরী ভাষা এবং কণ্ঠস্বরও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৭৮ সালে গমন দিয়ে তাঁর হিন্দি ছবিতে অভিষেক। এরপর সিনহাসন, অঙ্কুশ প্রভৃতি ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়ে। কিন্তু ১৯৮৯-এর পরিন্দা তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। আন্না শেঠের ভয়ঙ্কর অথচ বহুস্তরীয় চরিত্রে তাঁর অভিনয় জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এনে দেয়।
এরপর অঙ্গার, তিরঙ্গা, ক্রান্তিবীর, অগ্নিসাক্ষী, খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল, অপহরণ, শক্তি, আব তক ছাপ্পন এবং রাজনীতি—প্রতিটি ছবিতেই তিনি দেখিয়েছেন চরিত্রের সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা। ক্রান্তিবীর-এর বিপ্লবী প্রতীকী চরিত্র তাঁকে জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়। অন্যদিকে ওয়েলকাম-এর উদয় শেঠি প্রমাণ করে, তাঁর তীব্রতা যেমন ভয় ধরাতে পারে, তেমনই হাসাতেও পারে।
থিয়েটার ছিল তাঁর অভিনয়ের প্রথম এবং আজীবনের ভালোবাসা। তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় মঞ্চাভিনয় পুরুষ—যেখানে দুর্নীতিগ্রস্ত ও লম্পট রাজনীতিকের চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন। আশির দশকে শুরু হওয়া নাটকটি তিনি ১৬ বছরেরও বেশি সময় অভিনয় করেন এবং মোট ১,৮৬০টি শো করেন।
২০১৬-তে নটসম্রাট-এ অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চঅভিনেতা গণপত বেলওয়ালকরের চরিত্রে অভিনয় যেন তাঁর নিজের থিয়েটার-জীবনেরই এক আবেগঘন প্রতিফলন। ভারতীয় অভিনয়ে মঞ্চ ও সিনেমার সেতুবন্ধন হিসেবে নানা পাটেকরের উত্তরাধিকার তাই দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শুধু অভিনেতা নন—পরিচালক, লেখক এবং এক অসামান্য মঞ্চশিল্পীও ছিলেন তিনি। প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক দিয়ে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন। ২০১৩ সালে পান পদ্মশ্রী। তাঁর প্রয়াণ ভারতীয় সিনেমার এমন এক কণ্ঠ, দৃষ্টি ও অভিনয়শক্তির অবসান, যার বিকল্প তৈরি করা সহজ নয়।