
অরূপরতন চক্রবর্তী
কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে একসময় বনেদি বাড়িই ছিল উৎসবের প্রধান মঞ্চ। বারোয়ারি পুজোর সর্বজনীনতার অনেক আগে, শহরের বড় বড় পরিবার নিজেদের বাড়ির ঠাকুরদালানে আয়োজন করত দুর্গোৎসব। পুজো ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আবার একই সঙ্গে ছিল সামাজিক মর্যাদা, আতিথেয়তা, শিল্প-সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্য প্রদর্শনেরও ক্ষেত্র।
উত্তর কলকাতার তিন বনেদি বাড়ি—জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি, কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্র বাড়ি এবং শোভাবাজার রাজবাড়ি—এই সংস্কৃতির তিন আলাদা মুখ হয়ে উঠেছিল। লোকমুখে তাই যেন দেবীর নিজের কলকাতা-ভ্রমণের একটি গল্প তৈরি হয়—প্রথমে সাজগোজ, তারপর ভোজন, শেষে জলসা।
প্রথম গন্তব্য—জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়ি: মা গয়না পরেন
জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা ১৮৪০ সালে। গোকুলচন্দ্র দাঁ এই পুজোর সূত্রপাত করেন; পরবর্তীকালে তাঁর দত্তকপুত্র শিবকৃষ্ণ দাঁর সময়ে পুজোর জাঁকজমক আরও বৃদ্ধি পায়।
এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে দেবীর অলঙ্কারের ঐতিহ্য। কথিত আছে, শিবকৃষ্ণ দাঁ নিজে অলঙ্কারপ্রিয় ছিলেন এবং দেবীকেও সাজাতেন রাজকীয় সাজে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, একসময় বিদেশ থেকে মূল্যবান অলঙ্কার ও পোশাক আনার কথাও প্রচলিত ছিল। সেই বিপুল সাজসজ্জাই জন্ম দেয় প্রবাদটির প্রথম অংশ—মা দাঁ বাড়িতে এসে গয়না পরেন।
আজও দাঁ বাড়ির পুজোয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলঙ্কারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বৈষ্ণব প্রথার প্রভাবের কারণে এখানে পশুবলির রীতি নেই; অন্নভোগের পরিবর্তে চাল, ডাল, ফল, মিষ্টি-সহ নানা নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।
অর্থাৎ ‘গয়না পরা’ এখানে নিছক অলঙ্কারের গল্প নয়—এটি একসময়ের কলকাতার বনেদি সংস্কৃতিতে দেবীকে কন্যা ও পরিবারের আপনজন হিসেবে সাজিয়ে তোলার ঐতিহ্যেরও প্রতীক।
দ্বিতীয় গন্তব্য—কুমোরটুলির মিত্র বাড়ি: মা ভোজন করেন
সাজগোজ শেষ হলে দেবীর পরের গন্তব্য কুমোরটুলি—অভয়চরণ মিত্রের বাড়ি।
মিত্র বাড়ির পুজোর ইতিহাসও দীর্ঘ। রাধাকৃষ্ণ মিত্রের উদ্যোগে এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। রথের দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করার ঐতিহ্যও এই পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তবে মিত্র বাড়ির পুজোর সঙ্গে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে, তা হল ভোগের বিপুল আয়োজন।
প্রতিবেদনগুলিতে ৩০ থেকে ৫০ মণ চালের নৈবেদ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। সঙ্গে থাকে মিষ্টি, গজা, নিমকি, লুচি, রাধাবল্লভী-সহ নানা পদ। রোদে শুকনো মুগডাল দিয়ে খিচুড়ি তৈরির রীতিও এখনও এই পুজোর পরিচিত বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে।
এত বিপুল আয়োজনই সম্ভবত লোককথার দ্বিতীয় অধ্যায় তৈরি করেছে—দাঁ বাড়িতে সাজসজ্জা শেষে মা নাকি মিত্র বাড়িতে এসে ভোজন সারেন।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ‘ভোজন’-এর গল্পকে কেবল অলৌকিক কাহিনি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বনেদি বাড়ির পুজোয় দেবীকে ঘিরে যে অতিথি আপ্যায়ন, রান্নাবান্না, নৈবেদ্য ও সামাজিক ভোজের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তারই প্রতিফলন এই প্রবাদে।
শেষ গন্তব্য—শোভাবাজার রাজবাড়ি: “মা নাচ দেখেন
দেবীর রাতের আসর শোভাবাজার রাজবাড়িতে। শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস ১৭৫৭ সালের সঙ্গে যুক্ত। মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুজো সেই সময়কার কলকাতার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তীকালে রাজপরিবারের অন্য শাখায় ১৭৯০ সালে আরও একটি পুজোর সূচনা হয়।
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাচ-গান ও জলসার ঐতিহ্য। পুজোর দিনগুলিতে রাজবাড়ির নাচঘরে নর্তকী ও বাইজিদের আসর বসত এবং অভিজাত অতিথিদের উপস্থিতিতে তা হয়ে উঠত কলকাতার অন্যতম বড় সামাজিক আয়োজন।
সেই রাতজাগা জলসাই হয়তো লোককল্পনায় রূপ নেয়—মা শোভাবাজার রাজবাড়িতে গিয়ে নাচ দেখেন।
অর্থাৎ এখানে ‘নাচ দেখা’ও শুধু বিনোদনের গল্প নয়। ঔপনিবেশিক কলকাতার অভিজাত সমাজ, ইউরোপীয় অতিথি, দেশীয় জমিদার-ব্যবসায়ী শ্রেণি এবং ভারতীয় সঙ্গীত-নৃত্যের যে মিলনস্থল দুর্গাপুজোকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল, শোভাবাজার তার অন্যতম প্রতীক।
এক প্রবাদে ধরা পড়ে একটি শহরের ছবি
এই তিনটি বাড়ির গল্প পাশাপাশি রাখলে পুরনো কলকাতার দুর্গাপুজোর একটি আশ্চর্য ছবি ফুটে ওঠে।
দাঁ বাড়ি—রূপ ও অলঙ্কার।
মিত্র বাড়ি—রন্ধন ও ভোগ।
শোভাবাজার—সঙ্গীত, নৃত্য ও জলসা।
তিনটি বাড়ি যেন দুর্গোৎসবের তিনটি আলাদা ইন্দ্রিয়কে ধারণ করেছিল—চোখের আনন্দ, জিভের স্বাদ আর কানের সুর। সেই কারণেই হয়তো লোকমুখে দেবী দুর্গার নিজের সফরসূচি তৈরি হয়ে যায়।
তবে এই প্রবাদের প্রতিটি অংশকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ইতিহাস ও পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হল—তিনটি পুজোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যই ধীরে ধীরে এই জনশ্রুতির ভিত তৈরি করেছে।
আজ কলকাতার দুর্গাপুজো বদলে গেছে। থিম, আলো, বিশাল মণ্ডপ আর সর্বজনীন উৎসব শহরের পুজোর প্রধান আকর্ষণ। তবু উত্তর কলকাতার পুরনো ঠাকুরদালানগুলিতে গেলে বোঝা যায়, দুর্গাপুজোর ইতিহাস কেবল মণ্ডপের নয়—এটি পরিবারের, রান্নাঘরের, অলঙ্কারের, সঙ্গীতের, সামাজিকতার এবং শহরের স্মৃতিরও ইতিহাস।
আর সেই স্মৃতির মধ্যেই আজও বেঁচে আছে সেই মজার, অথচ অর্থবহ প্রবাদ।