অদৃশ্য মহাবিশ্বের খোঁজে: জাদুগুড়ার অন্ধকার ল্যাবরেটরির গল্প

সুবীর সেন
ভারতের ঝাড়খণ্ডের জাদুগুড়া খনি অঞ্চলের গভীরে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৫৫ মিটার নিচে, নীরব অন্ধকারে চলছে এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান। এই ল্যাবরেটরির নাম JUSL (Jaduguda Underground Science Laboratory)—এখানেই পরিচালিত হচ্ছে ভারতের প্রথম ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান প্রকল্প InDEx (Indian Dark Matter Experiment)।
১. কেন মাটির নিচে ল্যাবরেটরি?
মহাবিশ্বের প্রায় ৮৫% ভরই ডার্ক ম্যাটার, যা আমরা সরাসরি দেখতে পাই না। সমস্যা হলো—এই কণাগুলোর সাথে সাধারণ পদার্থের ক্রিয়া এতটাই দুর্বল যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠে বসে তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
তাই বিজ্ঞানীরা গিয়েছেন মাটির গভীরে, যেখানে:
মহাজাগতিক রশ্মি (cosmic rays) প্রায় সম্পূর্ণরূপে বাধাপ্রাপ্ত
ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ অত্যন্ত কম
অতি সূক্ষ্ম কণার সংঘর্ষ শনাক্ত করা সম্ভব
জাদুগুড়ার ৫৫৫ মিটার গভীরতা প্রায় ১৬০০ মিটার জলস্তর সমতুল্য শিলাস্তর তৈরি করে—যা একটি প্রাকৃতিক ঢাল (shield) হিসেবে কাজ করে।
২. InDEx: ভারতের ডার্ক ম্যাটার ডিটেক্টর
এই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হলো একটি বিশেষ ডিটেক্টর—Superheated Droplet Detector (SDD)।
কীভাবে কাজ করে এই ডিটেক্টর?
ডিটেক্টরের ভিতরে থাকে:
একটি জেল (gel) এর মধ্যে মাইক্রো-আকারের তরল ড্রপলেট (C₂H₂F₄)
এই ড্রপলেটগুলো “সুপারহিটেড” অবস্থায় থাকে—অর্থাৎ খুব অল্প শক্তিতেই তারা গ্যাসে পরিণত হতে পারে
যখন একটি ডার্ক ম্যাটার কণা আসে:
কণাটি ড্রপলেটে আঘাত করে
শক্তি জমা হয় (energy deposition)
হঠাৎ করে বুদবুদ (bubble) তৈরি হয়
এই বুদবুদ থেকে তৈরি হয় একটি অ্যাকোস্টিক সিগন্যাল (শব্দ তরঙ্গ)
সেন্সর সেই শব্দ ধরে ফেলে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
শুধু নিউক্লিয়ার রিকয়েল (nuclear recoil) হলে বুদবুদ তৈরি হয়
সাধারণ গামা বা ইলেকট্রন নয়েজ ফিল্টার হয়ে যায়
✔ ফলে এটি অত্যন্ত নির্ভুল ডিটেকশন পদ্ধতি
৩. ল্যাবরেটরির ভিতরের প্রযুক্তি
এই ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরি আসলে একাধিক স্তরের সমন্বয়ে গঠিত:
(A) শিলাস্তর ঢাল (Natural Shield)
৫৫৫ মিটার পাথর
কসমিক মিউন ১০⁶–১০⁷ গুণ কমিয়ে দেয়
(B) অতিরিক্ত সুরক্ষা
লেড (Lead) শিল্ড
পলিমার/হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ পদার্থ (নিউট্রন আটকাতে)
(C) ডেটা সংগ্রহ ব্যবস্থা
অ্যাকোস্টিক সেন্সর
FPGA ভিত্তিক ডেটা প্রসেসিং
সিগন্যাল ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্লেষণ
(D) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
চাপ নিয়ন্ত্রণ
রেডন ও গ্যাস মনিটরিং
৪. পরীক্ষার বাস্তব ফলাফল
প্রথম পর্যায় (Run-1)
এক্সপোজার: ~২.৫ kg·day
থ্রেশহোল্ড: ~৫.৮৭ keV
ফলাফল:
ডার্ক ম্যাটার ক্রস-সেকশন সীমা নির্ধারণ
~৩০ GeV ভরের কণার প্রতি সংবেদনশীলতা
দ্বিতীয় পর্যায় (Run-2)
থ্রেশহোল্ড কমিয়ে ~১.৯ keV
সময়কাল ~১০০ দিন
উন্নতি:
আরও ক্ষুদ্র শক্তির কণা শনাক্ত
কম ভরের ডার্ক ম্যাটারের দিকে অগ্রগতি
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
eV স্তরের সংবেদনশীলতা (~26 eV)
MeV স্কেলের ডার্ক ম্যাটার শনাক্তকরণ
ইলেকট্রন রিকয়েল ডিটেকশন
৫. এই গবেষণার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার
(a) ভারত প্রমাণ করেছে:
নিজস্ব প্রযুক্তিতে ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান সম্ভব
(b) ব্যাকগ্রাউন্ড ম্যাপিং:
গামা
নিউট্রন
রেডন
সবকিছুর বিস্তারিত ডেটা তৈরি হয়েছে
( c) প্রযুক্তিগত সাফল্য:
সুপারহিটেড ডিটেক্টর কার্যকর
অ্যাকোস্টিক ডিটেকশন নির্ভুল
৬. বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব
এই গবেষণা শুধু একটি পরীক্ষাই নয়—এটি মহাবিশ্ব বোঝার চাবিকাঠি।
কারণ:
গ্যালাক্সি গঠনে ডার্ক ম্যাটার গুরুত্বপূর্ণ
মহাবিশ্বের গঠন নির্ধারণ করে
এটি স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরে নতুন পদার্থবিজ্ঞানের দরজা খুলতে পারে
৭. ভারতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বড় আকারের ডিটেক্টর
দীর্ঘমেয়াদি ডেটা সংগ্রহ
নিউট্রিনো ও অ্যাক্সিয়ন গবেষণা
জাদুগুড়ার অন্ধকারে বসে বিজ্ঞানীরা আসলে আলো খুঁজছেন—
একটি অদৃশ্য জগতের আলো।
যেখানে:
কোনো আলো নেই
কোনো দৃশ্যমান কণা নেই
তবুও আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য—
ডার্ক ম্যাটার
আর সেই রহস্য উন্মোচনের পথে
ভারত এখন এক নতুন অধ্যায় লিখছে।