
পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে শুরুহতে চলেছে মাতৃপক্ষ। শারদোৎসবে কাশফুল দোলাচল, ঢাকের বাদ্যি বেজে ওঠা। সেই সঙ্গে পুরনো কলকাতার বনেদি বাড়িগুলিতে ফিরে আসে শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোর সেই চেনা আচার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পরিবারগুলিতে পুজোর রীতিনীতি চলে আসছে এক অমূল্য পারিবারিক উত্তরাধিকারের মতো। সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা—কিন্তু বহু বনেদি বাড়িতে আজও দুর্গাপুজোর মূল আচার ও ভোগের পরম্পরা রয়ে গিয়েছে প্রায় একই রকম।
দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে পুজোর ভোগ। আর ভোগের কথা উঠলেই বাঙালির মনে প্রথমেই আসে খিচুড়ির কথা। গোবিন্দভোগ চাল ও সোনা মুগ ডাল দিয়ে তৈরি সুগন্ধি খিচুড়ির সঙ্গে থাকে লাবড়া, বেগুনি-সহ নানা রকম ভাজা, পায়েস এবং আরও নানা পদ।
তবে কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোয় ভোগের কোনও একক রীতি নেই। এক এক বাড়ির এক এক নিয়ম, এক এক স্বাদ, এক এক পরম্পরা। কোথাও অন্নভোগ দেওয়া হয়, কোথাও আবার চাল বা চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি কোনও পদই থাকে না। অধিকাংশ বাড়িতে দেবীকে নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হলেও কিছু পরিবারে আজও মায়ের ভোগে থাকে মাছ বা মাংস—যদিও তা রান্না হয় পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই।
বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ি: মায়ের ভোগে মাছও
কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোর গুরুত্ব আলাদা। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বুকে প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা হয় বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের বাড়িতে। এই বাড়ির আটচালার দুর্গাপুজোয় বোধন হয় কৃষ্ণানবমী তিথিতে। একসময় পুজোয় ১৩টি পাঁঠা, একটি মহিষ, আখ এবং চালকুমড়ো বলির রীতি ছিল। বর্তমানে মহিষবলি বন্ধ হয়েছে। তবে এই বাড়িতে আজও মায়ের ভোগে আমিষ পদের উপস্থিতি দেখা যায়। ফল, মিষ্টি, লুচি, তরকারি, খিচুড়ি, ভাত ও পোলাওয়ের পাশাপাশি থাকে ল্যাটা মাছ পোড়া।
বাড়ির মহাভোগেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। ঘি-ভাত, শুকনো ফল দিয়ে তৈরি বাসন্তী পোলাও, খিচুড়ি, বিভিন্ন সবজির তরকারি, মাছের ঐতিহ্যবাহী পদ, পায়েস ও মিষ্টি দিয়ে সাজে মায়ের ভোগের থালা।
দশমীর ভোগেও রয়েছে বিশেষ পরম্পরা। সেদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় পান্তাভাত, কচুশাক, কেশরী ডাল ও কই মাছের ঝাল।
চোরবাগান চ্যাটার্জি বাড়ি: ভোগে মাছের পদ
চোরবাগানের চ্যাটার্জি বাড়ির দুর্গাপুজোতেও মায়ের ভোগে মাছ নিবেদনের রীতি রয়েছে। সপ্তমী থেকে দশমী নানারকম মাছের পদ মা-কে নিবেদন করে চোরবাগানের চট্টোপাধ্যায় পরিবার। ১৬০ বছরের বেশি পুরোনো এই পুজোয়। চট্টোপাধ্যায় পরিবারে মায়ের ভোগ রান্ন করেন পুরুষরা। কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোয় ভোগের বৈচিত্র্যের অন্যতম উদাহরণ এই বাড়ি—যেখানে দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত খাবারের তালিকায় আমিষ পদের উপস্থিতি আজও প্রাচীন রীতির স্মৃতি বহন করে।
চোরবাগানের শীলবাড়ি: ভোগে নেই চাল বা চালের গুঁড়ো
চোরবাগানের শীল পরিবারের দুর্গাপুজো প্রায় ১৬৭ বছরের পুরনো। এই বাড়ির মায়ের ভোগ সম্পূর্ণ নিরামিষ। ভোগের থালিতে থাকে লুচি, কচুরি, আলুভাজা, পটলভাজা, মালপোয়া এবং বিভিন্ন ধরনের সন্দেশ। এই বাড়ির ভোগের অন্যতম বিশেষত্ব হল নিরামিষ শুক্তোয় পাটপাতা ব্যবহারের প্রাচীন রীতি। পরিবারের নিজস্ব রান্নাঘরেই তৈরি হয় ভোগের সমস্ত পদ। আরও একটি উল্লেখযোগ্য নিয়ম রয়েছে এই পুজোয়—ভোগে কোনও রকম চাল বা চালের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয় না। পুজোর আচার শুরু হয় মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকেই। সেই কারণে পুজোর দশ দিন পরিবারের সমস্ত সদস্যই নিরামিষ আহার করেন।
শোভাবাজার রাজবাড়ি: অন্নভোগ নয়, মণ্ডা-মিঠাই
শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে কলকাতার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এখানকার ভোগের রীতিও অন্য অনেক বনেদি বাড়ির থেকে আলাদা। এখানে দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। তার বদলে নিবেদন করা হয় বিপুল পরিমাণ মণ্ডা-মিঠাই ও নানা ধরনের মিষ্টি ও জলখাবার। পান্তোয়া, পেরাকি, রাধাবল্লভী, মতিচুরের লাড্ডু-সহ নানা পদ তৈরি হয় রাজবাড়ির প্রাঙ্গণেই। এই সমস্ত পদ তৈরি করেন ব্রাহ্মণ রাঁধুনিরা। বহু পুরনো রীতিকে অনুসরণ করে যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রস্তুত করা হয় মায়ের ভোগ।
রামদুলাল নিবাসে ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর পুজো : নুনহীন ভোগের প্রাচীন রীতি
বিডন স্ট্রিটের লালচে প্রাসাদোপম বাড়ি—‘রামদুলাল নিবাস’। ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর পুজো নামে পরিচিত এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার বহু পুরনো কাহিনি। ১৭৮০ সালে ঈশ্বর রামদুলাল দে এই পুজোর সূচনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর দুই ছেলে আশুতোষ, যিনি ছাতুবাবু নামে পরিচিত, এবং প্রমথ, অর্থাৎ লাটুবাবুর আমলে এই পুজোর জাঁকজমক আরও বৃদ্ধি পায়। এ বাড়ির ভোগেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। ঘিয়ে ভাজা লুচির সঙ্গে নিবেদন করা হয় ছানা, ধোঁকা, স্টাফড ক্যাপসিকাম এবং ফুলকপির তরকারি। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রীতি—মায়ের ভোগের কোনও পদেই নুন দেওয়া হয় না।
নৈবেদ্যে থাকে চাল, ফল, মিষ্টি ও দই। ভোগের প্রতিটি পদেই যেন মিশে থাকে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই পুরনো কলকাতার স্বাদ।
জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি: নেই পশুবলি, নেই অন্নভোগ
জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির দুর্গাপুজোর রীতিতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। অব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব পরিবার হওয়ায় এই বাড়িতে পশুবলির প্রচলন নেই। একইভাবে দেবীকে অন্নভোগও দেওয়া হয় না। নৈবেদ্যে থাকে চাল, ডাল, বিভিন্ন ধরনের ফল ও মিষ্টি। তার সঙ্গে মায়ের জন্য নিবেদন করা হয় লুচি, গজা, খাজা, দই, নাড়ু ও মুড়কি। মিষ্টির তালিকাও বেশ দীর্ঘ—থাকে চন্দ্রপুলি, বিভিন্ন ধরনের ক্ষীরের মিষ্টি এবং রাবড়ি। বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগ যে শুধুই খিচুড়ি আর লাবড়িতে সীমাবদ্ধ নয়, এই বাড়ির ভোগ তারই প্রমাণ।
কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্র বাড়ি: রোদে শুকনো মুগডালের খিচুড়ি
কুমোরটুলির শতাব্দীপ্রাচীন অভয়চরণ মিত্র বাড়িতে দেবী যেন ভোজন করেন একেবারে বাঙালির ঘরের স্বাদে। এই বাড়ির ভোগের অন্যতম প্রধান পদ রোদে শুকনো মুগডাল দিয়ে তৈরি খিচুড়ি। তার সঙ্গে থাকে নানা রকম ভাজা, সবজির তরকারি এবং খাঁটি মাখনের নৈবেদ্য। পাশাপাশি থাকে লুচি ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। খিচুড়ির সুগন্ধ, ঘিয়ের মিষ্টি গন্ধ আর ঘরোয়া রান্নার স্বাদ মিলিয়ে এই বাড়ির ভোগে আজও টিকে রয়েছে পুরনো কলকাতার রান্নাঘরের স্মৃতি।
একই দেবী, ভোগের কত রকম রীতি!
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো আসলে শুধু দেবী আরাধনার ইতিহাস নয়, এটি শহরের খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক ইতিহাসেরও এক জীবন্ত দলিল। কোথাও মায়ের ভোগে খিচুড়ি-লাবড়া, কোথাও মাছের পদ; কোথাও আবার অন্নভোগের বদলে মণ্ডা-মিঠাই। কোনও বাড়িতে নুন ছাড়া রান্না, কোনও বাড়িতে চাল বা চালের গুঁড়োর সম্পূর্ণ বর্জন। কোথাও আবার দশমীর দিন পান্তাভাত ও কচুশাক।
এই ভিন্নতাগুলিই পুরনো কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। সময়ের সঙ্গে শহর যতই বদলাক, এই বাড়িগুলির রান্নাঘর, ভোগের থালা আর পুজোর আচার যেন এখনও ধরে রেখেছে কয়েক শতাব্দী আগের কলকাতার গন্ধ।