কেতকী কুশারী ডাইসন: চলে গেলেন দুই ভাষা ও দুই ভূখণ্ডের সেতুবন্ধের এক মেধাবী কণ্ঠ

কিছু মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যান, কিন্তু দেশ তাঁদের ছাড়ে না। স্মৃতি, ভাষা, শিকড় আর সৃষ্টির ভিতর দিয়ে তাঁরা বহন করে নিয়ে চলেন ফেলে আসা শহরকে। কেতকী কুশারী ডাইসন ছিলেন তেমনই এক মানুষ—কলকাতার মাটি থেকে উঠে যিনি ইংল্যান্ডে বসেও বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে নিজের সৃষ্টির গভীরে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
প্রয়াত হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন। বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ইংল্যান্ডে নিজের বাড়িতে ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এক স্বতন্ত্র, বহুমাত্রিক এবং গভীরভাবে অনুসন্ধিৎসু লেখককে।
১৯৪০ সালে জন্ম কেতকী কুশারীর। কলকাতাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। এই শহরের অলিগলি, বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ভাষা তাঁর মননে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে পরবর্তী জীবনে হাজার মাইল দূরে থেকেও কলকাতা তাঁর লেখার অন্তর্লীন ভূগোল হয়ে থেকেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার পর তিনি পাড়ি দেন অক্সফোর্ডে। সেখানে পিএইচডি করেন। পরে বিয়ে করেন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট ডাইসনকে। কেতকীর সাহিত্যিক ও সৃজনশীল জীবনের দীর্ঘ পথচলায় রবার্ট ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী।
বাংলা সাহিত্যে কেতকী কুশারী ডাইসনের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়েছিল তাঁর লেখার বিষয় ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ বাংলা পাঠককে পরিচয় করিয়েছিল ইংল্যান্ডে বসবাসকারী অভিবাসী বাঙালিদের এক অন্য জগতের সঙ্গে। প্রবাসের জীবন সেখানে নিছক দেশত্যাগের গল্প নয়—তার মধ্যে ছিল শিকড়ের টান, একাকিত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, নতুন সমাজে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা এবং ফেলে আসা বাংলার জন্য এক অদৃশ্য হাহাকার।
কবিতাতেও তাঁর কণ্ঠ ছিল নিজস্ব। বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই লিখেছেন তিনি। ‘সবীজ পৃথিবী’, ‘জলের করিডোর ধরে’, ‘কথা বলতে দাও’-এর মতো বাংলা কাব্যগ্রন্থে যেমন ধরা পড়েছে তাঁর অনুভবের সূক্ষ্মতা, তেমনই ইংরেজি কবিতার বই ‘Sapwood’, ‘Hibiscus in the North’ তাঁকে আন্তর্জাতিক পাঠপরিসরেও আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দুই ভাষার মধ্যে তাঁর চলাচল ছিল অনুবাদের মতোই এক সাংস্কৃতিক যাত্রা—এক ভাষার অনুভবকে অন্য ভাষার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। বাংলা সাহিত্যে এই বই তাঁকে আরও গভীর ও স্বতন্ত্র জায়গা করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ও আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ককে ঘিরে তিনি শুধু কল্পনার আশ্রয় নেননি; চিঠিপত্র, নথি, ইতিহাসের নানা সূত্র ঘেঁটে এক অনুসন্ধিৎসু লেখকের মতো তাঁদের সম্পর্কের অন্তঃসলিলা স্রোতকে ধরতে চেয়েছেন। সাহিত্য, ইতিহাস, প্রেম, স্মৃতি এবং ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগত—সব মিলিয়ে বইটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য অনুসন্ধান।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কেতকীর সম্পর্ক অবশ্য তাঁর সাহিত্যজীবনের অনেক আগের। ছোটবেলায় তাঁর পাঠের শুরু রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’ দিয়ে; পরে ‘কথা ও কাহিনি’। শৈশবের সেই পাঠ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল এক গভীর আজীবন সংলাপে। কবিজীবনের গোড়ার দিকে রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসুও তাঁর সাহিত্যিক মননকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন।
প্রবাস তাঁকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং দূরত্বই হয়তো তাঁকে নিজের ভাষা ও শিকড়কে আরও তীক্ষ্ণভাবে চিনতে সাহায্য করেছিল। তাই কেতকী কুশারী ডাইসনের লেখায় বারবার ফিরে আসে ‘এখানে’ এবং ‘সেখানে’-র দ্বন্দ্ব, পরিচয়ের প্রশ্ন, স্মৃতির আলো-ছায়া এবং ভাষার ভিতরে নিজের ঘর খুঁজে নেওয়ার আকুলতা।
আজ তিনি নেই। ইংল্যান্ডের দূর প্রবাসে থেমে গেল তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা। কিন্তু কলকাতা, বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় কথোপকথন, তা থামার নয়। তাঁর লেখা থেকে যাবে—দুই ভূখণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মানুষের নিজের শিকড়কে ফিরে দেখার দলিল হয়ে।
কেতকী কুশারী ডাইসন চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর ভাষার ভিতরে যে কলকাতা বেঁচে ছিল, যে বাংলাকে তিনি দূরদেশে থেকেও এত যত্নে বহন করেছিলেন, সেই বাংলা তাঁকে মনে রাখবে।
শ্রদ্ধায়, নীরবতায়—কেতকী কুশারী ডাইসনকে বিদায়।