
সুদীপ ঘোষ
২০০৮ সালে হলিউডে একটি ছবি হয়েছিল। বিখ্যাত ছবি। নাম ‘মিল্ক’। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শঁ পেন। ব্যক্তিগতভাবে শঁ পেনের অভিনয় আমি পছন্দ করি। অন্ধভক্ত (মানে ‘ফ্যান’) নই অবশ্য। ওরকম হাজার জন অভিনেতা আছেন সে দেশে। যেমন লরেন্স অলিভিয়ের, স্পেন্সর ট্রেসি , জ্যাক নিকলসন , টম হ্যাঙ্কস , এন্থনি হপকিন্স, মাইকেল জর্ডন, সিলিং মারফি এবং আরও অনেকে। কিন্তু ‘মিল্ক’ ছবিটির নামটি উল্লেখ করলাম এক বিশেষ কারণে; ‘মিল্ক’ একটি ভীষণ রকম মানবিক ছবি। ছবিটি আসলে মার্কিন সাংবাদিক, রঅ্যান্ডি সিল্টস পরিচালিত তথ্যচিত্র,’দ্য মেয়র অফ ক্যাস্ট্রো স্ট্রিট’ থেকে অনুপ্রাণীত ‘দ্য টাইমস অফ হার্ভে মিল্ক’ নামক ১৯৮৪-র আরেকটি তথ্যচিত্র থেকে অনুপ্রাণীত। পরিচালক ছিলেন গাস ভ্যান স্যান্ট। ছবিটির গল্প লিখেছিলেন ডাস্টিন ল্যান্স ব্ল্যাক।
হার্ভে মিল্ক ছিলেন সমকামী, ঘোষিত সমকামী এবং আমেরিকার তৃতীয় ঘোষিত সমকামী রাজনীতিক। এবং তিনি খুন হয়েছিলেন, সকামীতাকে আইনসিদ্ধ করার প্রচেষ্টায়।
কেন এতগুলো শব্দ খরচ করলাম এই লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসম্পৃক্ত একটি ছবি নিয়ে? কারণ,এই ছবিটি যেমন একটি মানবিক দাবীর কথা বলে, সেই একই সুরে অন্য একটি বিষয়ে এক মানবীক দাবির কথাই বলবে এই প্রবন্ধের পরের অংশটুকুও।
এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য দুধ। দুধের ইংরেজি ‘মিল্ক’। সেই দুধ এই মুহূর্তে কত ধরণের হয়? বাজারে এই মুহূর্তে ১৭ ধরণের দুধ পাওয়া যায়। তারমধ্যে যেমন গোদুগ্ধ আছে, তেমনই আছে আমন্ড (কাঠবাদাম) থেকে তৈরী দুধ, ওট থেকে তৈরী দুধ, ধান থেকে তৈরী দুধ, নারকেলের দুধ এমনকী মটরদানা থেকে তৈরী দুধও। এছাড়া, ভেড়ার, ছাগলের, উঠের দুধ তো আছেই। গোদুগ্ধ যেহেতু সবচেয়ে সহজলভ্য ও প্রাচীন, তাই তার একারই ৬ রকমের প্রকারভেদ আছে।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে দুধ কি আমিষ না নিরামিষ? বৈষ্ণব, হিন্দু এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বিশ্বাস করেন দুধ নিরামিষ। আবার ওদিকে, যাঁদের আধুনিক সময়ে ‘ভেগান’নামে অভিহিত করা হয়, যাকে বাংলায় হয়তো ‘মৌলবাদী নিরামিষাশী’ বলে অবিহিত করা যায়, তাঁরা আবার শুধুমাত্র উদ্ভিদজাত দুধই পছন্দ করেন; কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন, কোনও প্রাণীহত্যার সঙ্গে যুক্ত তাঁরা হবেন না। কিন্তু যে কোনও উদ্ভিদেরই যে প্রাণ আছে, তা স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু বহুদিন আগেই, ‘ভেগান’ হুজুগ ওঠারও বহু আগে প্রমাণ করে দিয়েছেন। সেটা ১৯০১ সাল, যন্ত্রের নাম ক্রেস্কোগ্রাফ। কিন্তু এই যে কিছুদিন আগে বাগেশ্বর বাবা (আসল নাম পণ্ডিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ গর্গ) কলকাতাতে এসে বাঙালিদের দূর্গা পুজোর সময়ে আমিষাষীই রয়ে যাওয়া, এবং উত্তর ভারতীয় রীতি অনুযায়ী শুদ্ধ শাকাহারী থাকেন না বলে ‘পাখণ্ডী‘ বলে দাগিয়ে দিলেন, যার মানে বাংলায় দাঁড়ায় ‘পাষণ্ড’, তিনি কি আদৌ জানেন দুধ বা দুগ্ধজাত যে কোনও খাদ্য আসলেই নিরামিষ না আমিষ? প্রসঙ্গত উনি বাঙালিদের খাদ্যপদগুলিকে ‘গান্ধি -গান্ধি‘ বলেও দাগিয়ে দিয়েছেন। ‘গান্ধি’ হিন্দি শব্দটির মানে ‘খারাপ’। কোনও মানুষের, তিনি যেই হন না কেন, অন্য কোনও মানুষের খাদ্যকে ‘খারাপ’ বলার অধিকার কি এই জগতে কারও অদৌ আছে? খাদ্য হল ‘ব্রহ্ম’ কারণ হিন্দুশাস্ত্রমতে তা দেবতাকে উৎসর্গ করে গ্রহণ করা বিধি। ইনি কীসের বাবা? ইনি তো মনুষ্যপদবাচ্যই নন।
একটু নজর ঘোরানো যাক হিন্দু প্রাচীন গ্রন্থলোকে।
‘কর্মলোচন ধর্মশাস্ত্র ‘ গ্রন্থে পরিষ্কার লেখা রয়েছে :
‘প্রাণ্যঙ্গচূর্ণং চর্মাম্বু জম্বীরং বীজপূরকম্।
অযজ্ঞশিষ্টমন্নাদ্যং যদ্বিষ্ণোরনিবেদিতম্।
দগ্ধমন্নং মসূরং চ মাংসং চেত্যষ্টধামিষম্॥
অর্থাৎ
গাভী বর্জিত মানে দুগ্ধ ব্যতীত যে ক্ষীর, তাহা আমিষরূপে গণ্য; ফলের মধ্যে জুম্বীরও (বাতাবী লেবু) আমিষরূপে গণ্য । রক্তশাক (যে কোনও লালচে শাক,যেমন লালশাক) আমিষ; এবং সর্বপ্রকার দগ্ধ বা পুড়ে-যাওয়া খাদ্যও আমিষরূপে বিবেচিত হয় ।
মহাভারতে বলছে :
সংযাবং কৃসরং মাংসং শঙ্কুলীং পায়সং তথা
আত্মার্থং ন প্রকৰ্ত্তব্যং দেবার্থস্তু প্রকল্পয়েৎ
(মহাভারত:অনুশাসন পর্ব, ৯১.৪০)
অর্থাৎ
যবচূর্ণ বা যবনির্মিত পিঠা, কৃশর (তিলতণ্ডুলকৃত অন্ন বা খিচুড়ি), মাংস, সঙ্কুল (মানে ঘিয়ে ভাজা ময়দার পিঠা) ও পায়স এগুলো নিজের জন্য প্রস্তুত করবে না; ঐ সমস্ত দ্রব্য দেবতার নিমিত্ত প্রস্তুত করবে।”
পায়েস হোক, দুধ হোক, পিঠা হোক, এমনকি মণ্ডা, মিঠাই, সন্দেশও যদি দেবতাকে নিবেদন না করে খাওয়া হয়, সেটাকে শাস্ত্রে আমিষ বলছে ।
তা এই যে ‘কর্মলোচন ধর্মশাস্ত্রে’র কথা উল্লেখ করলাম, এটি কতদিনের প্রাচীন? ‘এই ধর্মশাস্ত্র বা আচার-অনুষ্ঠানের বিধান সম্বলিত গ্রন্থটি ১৮২১ সালের দিকে প্রকাশিত হয়।
এটি মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিত্যকর্ম ও ধর্মাচরণের একটি সংকলন গ্রন্থ। গ্রন্থটি কার দ্বারা সংকলিত বা লিখিত হয়েছিল, তা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়:
ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, ১৮২১ সালে, এটি যখন কলকাতায় প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন কোনও নির্দিষ্ট একক লেখকের নাম ছাড়াই এটি প্রচলিত আচার ও স্মার্ত নিয়মের সংকলন হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে (১৮৯৮ সালের দিকে) মন্মথনাথ বিদ্যারত্ন ভট্টাচার্য এবং নীলরত্ন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ পণ্ডিতদের সম্পাদনা, ব্যাখ্যা ও টীকা সহ এটি পুনরায় সংকলিত ও প্রকাশিত হয়।
কী এর প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব:
এই গ্রন্থে একজন সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রতিদিনের করণীয় ধর্মীয় কর্তব্য এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর পরিক্রমা (যেমন: শিবের অর্ধ-প্রদক্ষিণ, বিষ্ণুর চার প্রদক্ষিণ) ও তান্ত্রিক উপাসনার নিয়মাবলী বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তৎকালীন কলকাতার ‘বাবু’ বা ভদ্রলোক সমাজে এই গ্রন্থটি বেশ প্রভাব বিস্তার করেছিল, কারণ এতে নিত্যদিনের ধর্মীয় ভুলত্রুটির জন্য প্রায়শ্চিত্ত বা শাস্তির বিধান এত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেওয়া ছিল যে সাধারণ মানুষ এটি কিনতে ভয় পেতেন।
কিন্তু এই বাগেশ্বর বাবা তাঁর ক্ষোভবিষাক্রান্ত আস্ফালনে কোথাও দুধের বা দুগ্ধজাত অন্য কোনও পদের উল্লেখই করেননি।এই বচন থেকে যে দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ পায় , তা সর্বজনগ্রাহ্য। উনি পড়েননি, জানেন না, যে বাঙালী হিন্দু সনাতন সমাজ ১৯ শতকে কতটা গোঁড়া ছিল। এই সময়েই রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, ব্রাহ্ম সমাজ, বিধবাবিবাহ, এই ঘটনাগুলি ঘটছে। এই কলকাতারই বুকে। সেটিকে অবশ্যই বলা যায় সনাতনীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ফসল। যেমন ঘটেছিল জৈন বা বৌদ্ধধর্মের উত্থানের সময়ে। জাতিপ্রথা, গোঁড়ামী আর যজ্ঞের নামে অবিরত জীবহত্যার প্রতিবাদ স্বরূপ।তার আগে এই বাংলার নদিয়ায় খ্রিস্টীয় ১৫ শতকে হয়ে গিয়েছে আরেক যুগান্তকারী প্রতিবাদ, মহাপ্রভুর অনুপ্রেরণায়। সুতরাং, কালে, কালে এই বাংলার মাটিতেই সনাতনী হিন্দু ধর্মীয় গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। হয়তো এবারও হবে। কারণ উত্তর ভারতীয়রা, দু’ পাতা শাস্ত্র গিলে বিরাট হিন্দুধর্মের ধারক ও বাহক হয়ে যান । তাঁদের বাঙালী ধ্যৈর্য নেই।
এই প্রসঙ্গে আরও আসে মূলত ১৯ শতকের বিবেকানন্দ-রামকৃষ্ণর কথাও। বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত অদ্বৈতবাদ কোনও মূর্তিপুজোয় বিশ্বাসই করে না । কিন্তু জীবকল্যাণে করে। উত্তরাখণ্ডে মায়াবতীতে, যে অদ্বৈত বেদান্ত আশ্রম আছে, সেখানে প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষ যান। বাঙালী, উত্তর ভারতীয় নির্বিশেষে। তাঁদের নিজস্ব হাসপাতাল আছে, যা ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলে একমাত্র আধুনিক চিকিৎসা দেয় রোগীদের, বিনা অর্থে। তাঁদের গোয়াল ভরা গাভী, বৎস। সেখান থেকে আসা দুধ-পায়েস বা ক্ষীর নয়, সদ্য দোয়া গাভীদুগ্ধ হল, আশ্রমের অতিথিদের রাতের খাবারের বাঁধা পদ, শেষপাতে।
যা হোক, অনেকটাই অন্যপথে এগিয়ে গিয়েছিলাম। যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সেই কক্ষপথে ফিরে আসি। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, মাংস বা মাছের থেকেও দুধ অনেক বেশি তমগুণসম্পন্ন। কেন? কারণ আপনি যদি কোনও মৎস বা মাংসভক্ষন করেন, সেক্ষেত্রে যে প্রাণীটির দেহ ভক্ষণ করছেন, তাকে স্বাভাবিকভাবেই প্রাণ বিসর্জন দিতে হচ্ছে। সেটি স্বার্থসিদ্ধির জন্য, আয়েসের জন্য, অকারণ নৃশংসতা।কিন্তু যখন আপনি একজন গভীমাতার বাঁট থেকে তার প্রাণশক্তি , যা প্রকৃতি তাকে দিচ্ছেন আসলে তার সদ্যজাতর মূল খাদ্য হিসাবে, সেখানে আপনি ভাগ বসাচ্ছেন। এটাও কি নৃশংসতা নয়? অমানবিক নয়? একটি শিশুর মুখ থেকে তার খাদ্য কেড়ে নেওয়া কি অপরাধ নয়? অধিকার থেকে একটি অবলা শিশুকে বঞ্চিত করা নয়?
কখনও গাভীদুগ্ধ কীভাবে আহরণ করা হয়, মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছেন? বাছুরটিকে না দেখতে পেলে কোনও গাভীমতার বাঁটে মাতৃদুগ্ধের ক্ষরণই হবে না। দুগ্ধ হল প্রবাহমান মাতৃস্নেহ’; জীবনসুধা। তো সেই ক্ষরণ শুরু হলে গাভীটির পিছনের পা একটি শক্তপোক্ত খুঁটিতে বেঁধে দেওয়া হয় পোক্ত ভাবে। তারপর দুধ দোয়া শুরু হয়। তখনও কিন্তু মা’য়ের সামনে বাছুরটি ঘুরছে। সে এবার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক টানে মা’য়ের বাঁটে মুখ ছোঁয়াতে আসে, তখন কখনও ভুলিয়ে-ভালিয়ে, কখনও দূর-দূর করে শিশুটিকে মা’য়ের দৃষ্টির বাইরে সরিয়ে দেওয়া হয়।আর একটি প্রশ্ন: গোস্তন্যকে কেন বাঁট বলা হয় জানেন? কারণ শব্দটির বুৎপত্তিগত মূল হলো সংস্কৃত ‘বন্ট’ বা বন্টিত যার মূল আবার প্রাকৃত। যেহেতু গরুর স্তন চারভাগে বিভক্ত, তাই সেট বন্টিত। সেখান থেকে বাঁট।
এবার ভাবুন, একজন নারীর স্তনে কি যে কেউ হাত দিতে পারে? সেটি কি আইনসিদ্ধ? তাহলে গোস্তন ধরে টানাটানি করা কি একভাবে একটি অবলা প্রাণীর উপর যৌন অত্যাচারের পর্যায়ে পড়ে না?
জগতে আর কোনও স্তন্যপায়ী, তৃণভোজী বা মাংসাশী, যাই হোক, কিন্তু অন্য কোনও প্রজাতির স্তন্যদুগ্ধ এভাবে হরণ করে না। একমাত্র মানবজাতি করে। তার মানে কি আমরা, অমৃতের পুত্রকন্যারা আসলে পশুরও অধম?
এটি অমানবিক নয়? নৃশংসতা নয়? হিংস্র নয়? স্বার্থসিদ্ধি নয়? লোভ নয়? লালসাও কি নয়?
মানুষ তো আসলে স্বার্থসিদ্ধির জন্যই নিয়মকানুন বানায়, পাপ-নিষ্পাপের বিচার করে, অত্যাচার বা শিষ্টাচারের ভিন্নতা গড়ে। সাহস থাকলে স্বীকার করুন খোলা মনে। হিন্দুত্ববাদীরা যতই জীবসেবা, গোমাতা আস্ফালনে আকাশ-বাতাস মুখর করে তুলুক, তাদের দৈনিক খাদ্যতালিকাতেই যুগ-যুগ ধরে এমন একটি পদ অবস্থান করছে, যা হরণের পেপার বোঝা তাদের সবার ওজনের থেকেও বেশী।
তাই নয় কী?
ঋণস্বীকার: গুগল , মুখুজ্যে মশাই সমাজমাধ্যম (ফেসবুক) পাতা
***ডিসক্লেইমার: ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো মতামত, কলাম বা বিশ্লেষণ লেখকের একান্তই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি।