আবার উইঙ্কল টুইঙ্কল, থিয়েটার পেরিয়ে সিনেমায় কতটা বদলালো আগুনের বর্ণমালা?
লিখছেন সৌম্যা ঘোষ

মধ্যরাত থেকে আকাশ নীল করা ভোর—
তারপরেই সুমনের গানের একটা ধাক্কা…
‘পাল্টায় মন, পাল্টায় বিশ্বাস
স্লোগান পাল্টে হয়ে যায় ফিসফাস
ফিসফাসটাও পাল্টে যেতে পারে
হঠাৎ কারও প্রচণ্ড চিৎকারে।’
হাজার একটা সত্যের কাছে ‘পাল্টানো’র চেয়ে জোড়ালো সত্য, আর কিছুই নেই।
যা কিছু অর্বাচীন, সে সবই পাল্টে যায়। কিন্তু, আদর্শ-মূল্যবোধ… সময়ের সঙ্গে সেগুলোও পাল্টে যায় কি?
ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে একা ইন্দ্র। অসহায়। ক্লান্ত। নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে…ক্লান্ত…হতাশ…
কারণ, সব্যসাচী সেন। কে এই সব্যসাচী? ছাব্বিশ বছর পরে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠেন তিনি। একদম অবিকল, একইরকম।
সব্যসাচী সেন আসলে একটা আদর্শ। সে ফিরে ফিরে আসে তার বিশ্বাস নিয়ে।
তারই বিপরীতে ইন্দ্র আদর্শকে আড়াল করতেই হয়ত তাঁকে, অর্থাৎ সম্পর্কে তাঁর বাবাকে, গুলি করে হত্যা করে। সময়ের বিপাকে পড়ে। কেন না,
আদর্শ-বিবেক সামনে এলে তাঁর অস্বস্তি হয়।
সব্যসাচী সেনের মধ্যে আসলে ইন্দ্র নিজেকে দেখে ফেলে। দেখে, ফেলে আসা তাঁর ছেলেবেলার সত্তাকে। আর তখনই সত্যজিতের সেই বিখ্যাত গল্পের রেফারেন্স অর্থাৎ, রতনবাবু আর সেই লোকটা-র মত, ছেলেবেলাটাকে নিষ্ঠুরভাবে মারতে চায় সে, হ্যাঁ, বাবাকে গুলি করার মধ্যে দিয়েই…
সব মানুষই চায় ভালো হতে। ইন্দ্রও চেয়েছিল।
কিন্তু, সময় থাপ্পড় মারে। মনে করিয়ে দেয় এই সময় ন্যায়-নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধের জন্য নয়। সময় তোমার। নিজেরটা গুছিয়ে নাও।
তাই একদিন রাতে… ‘কারার ওই লৌহকপাট’ শুনে তার বিবেক দংশন হয়। ছটফট করতে থাকে। বাঁচাতে চায়। সব্যসাচী সেন- আদর্শ-মূল্যবোধ তার সব কিছু ঘেঁটে দেয়।
‘ওয়েটিং ফর গোডো’য়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের ভাঙাচোরা সময়ে শুভবোধ, সার্বিক চেতনা আর কিছুই থাকছে না। ঈশ্বরের মৃত্যু ঘটছে। আর,
‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’এ সব্যসাচীর মতো একজন আদর্শবাদী ব্যক্তি বেঁচে থাকলেও, তাঁকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতার লোক নেই। ধ্বস্ত সমকালের তুলনায় সব্যসাচী বড্ড ভারী…
একজন ব্যক্তির স্মৃতি-আবেগের সঙ্গে প্রবলভাবে তার রাজনৈতিক বিশ্বাসও জড়িয়ে থাকে।
‘গুড বাই লেনিন’ এ সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন, ধনতন্ত্র আসা আর লেনিনের মূর্তি সরিয়ে দেওয়ায় পুরোনো বিশ্বাস-আদর্শে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়। ভাবতে অবাক লাগে, উইঙ্কল টুইঙ্কলের ঠিক এক বছর পর, এ ছবি নির্মিত হয়েছিল…আশ্চর্য সমাপতন
‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ এ বিশ্বায়ন পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়ের ফারাক আমরা দেখি।
সিনেমাতেও তাই ছাব্বিশ বছর পর ফিরে আসা সব্যসাচী নিজেকে আর মেলাতে পারে না। ছবির পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় শুরুতেই এই পরিবর্তিত সময়কে মজার আবহে ধরেছেন। তার সঙ্গে, ঋত্বিকের চোখে সুচতুর অভিনয়!
পরিচালক সব্যসাচীর ম্যালঅ্যাডজাস্টমেন্টকে কখনও সব্যসাচীকে ঘিরে থাকা জোকারের দৃশ্যে, কখনও পরিবর্তিত সময়ে ভুল ভাবে এসে পড়া সব্যসাচীকে সার্কাসটিক দৃশ্যে দেখিয়েছেন।
আর একটি প্রতিকী দৃশ্য, নাগরদোলায় ছেলে ইন্দ্র ও বাবা সব্যসাচী— একদিকে ঘাঁটা সময় আর অন্যদিকে আদর্শ-মূল্যবোধ চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে…
স্পষ্টতই, সিনেমার দায় থেকেই হয়তো, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নাটকের টেনশন সিনেমায় অনেকটাই নির্ভার।
সিনেমায় নস্টালজিক করে প্রেমকে যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনই স্মৃতিচারণের প্রতিটি সাদা-কালো দৃশ্যে লাল রঙটিকে দেখানো হয়েছে অনেকটা স্বপ্নের মতো… আশার মতো…
আদর্শ মরে না। আদর্শকে মরতে নেই…
আদর্শের পথ বেছে নিতে হলে, আরোপিত আদর্শের কোনও বুলি রাত-দিন কপচাতে হয় না। প্রথমেই একটা দর্শনের ভারী বই পড়ে ফেলতে হয় না। আদর্শ-মূল্যবোধ আসলে একটা অভ্যাস। একটা বিশ্বাস। সময়ের ঘোর জাঁতাকলে পড়েও তুমি ঠিক কোন পথটাকে বেছে নেবে— সেটাই তোমার আদর্শ।
একটা ভালো গান, একটা কবিতাও মানুষকে বদলে দিতে পারে। বদলটা ভালোর দিকে অবশ্যই।
শুধু নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাটাই জরুরি।
মঞ্চ বা ক্যামেরা সব ছেড়ে আসি মূল লেখায়। কমলকুমার মজুমদার একটি প্রবন্ধে বলেছিলেন, যে মানুষ গোটা সমাজ-সময়ের কথা একক কন্ঠে বলতে পারছে, সে-ই শিল্পী। সে-ই যুগপুরুষ।
অদ্ভুতভাবে, এই নাটকে নাট্যকারের কলমের জোরটা এখানেই।
এখানেই একজন প্রকৃত শিল্পীর দূরদর্শিতাও…