একজন মাঝি দুই হাতে বৈঠা টানছেন। ধাতুর তৈরি তাঁর শরীরের পেশিতে যেন টান পড়েছে, নৌকার ছন্দে দুলছে গোটা অবয়ব। আবার কোথাও এক সাঁওতাল ঢাকির শরীর যেন তাল মিলিয়ে নেচে উঠছে, কোথাও শ্রমিকের হাতের শিরা-উপশিরায় ধরা পড়ছে পরিশ্রমের ছাপ। যেন ধাতুর শরীরে বন্দি জীবন্ত মানুষ। স্থির থেকেও তারা চলমান, নীরব থেকেও যেন কথা বলে। এই প্রাণময় ভাস্কর্যগুলির স্রষ্টা মীরা মুখোপাধ্যায়।


১৯২৩ সালে কলকাতায় জন্ম মীরা মুখোপাধ্যায়ের। শিল্পের প্রতি আকর্ষণ ছোটবেলা থেকেই থাকলেও, তিনি এমন এক সময়ে ভাস্কর্যচর্চাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, যখন ভারতে নারী ভাস্করের সংখ্যা হাতে গোনা। ভাস্কর্যের মতো কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে নারীর উপস্থিতি তখনও সামাজিকভাবে খুব একটা স্বীকৃত ছিল না। কিন্তু প্রচলিত ধারণার কাছে আত্মসমর্পণ না করে, তিনি নিজের পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন।
কলকাতায় শিল্পশিক্ষার পর তিনি জার্মানির মিউনিখে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পের নানা ধারা তাঁর সামনে খুলে গেলেও, তিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন নিজের মাটির কাছে। তাঁর উপলব্ধি ছিল, ভারতীয় শিল্পের শক্তি লুকিয়ে রয়েছে তার লোকঐতিহ্য, কারিগরি দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের অনুভবে।

এই উপলব্ধিই তাঁকে নিয়ে যায় মধ্য ভারতের বস্তার অঞ্চলের ডোকরা শিল্পীদের কাছে। সেখানে তিনি তাঁদের সঙ্গে থেকেছেন, কাজ শিখেছেন, শ্রম ভাগ করে নিয়েছেন। ঐতিহ্যবাহী ‘লস্ট-ওয়াক্স’ বা মোমের ছাঁচে ধাতু ঢালাই পদ্ধতিকে তিনি আত্মস্থ করেন একেবারে ভিতর থেকে। পরে সেই দেশজ প্রযুক্তিকেই আধুনিক ভাস্কর্যের ভাষার সঙ্গে মিশিয়ে গড়ে তোলেন তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা।
তাঁর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল গতির অনুভূতি। ধাতুর মতো ভারী মাধ্যমে কাজ করেও তিনি এমন এক ছন্দ সৃষ্টি করতে পারতেন, যেন চরিত্রগুলি এইমাত্র হাঁটতে শুরু করবে, বৈঠা চালাবে কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।

তিনি বিশ্বাস করতেন শিল্প সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সেই কারণেই তাঁর কাজে শ্রমের মর্যাদা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং লোকঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা বারবার ফিরে আসে। শিল্পের ভাষা তাঁর কাছে ছিল মানুষের ভাষা। জেলে, মাঝি, কৃষক, শ্রমিক, বাদ্যযন্ত্রী, আদিবাসী নারী-পুরুষ – যাঁরা ইতিহাসের বয়ানে প্রায়শই অদৃশ্য থেকে যান, তাঁরাই মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পে হয়ে ওঠেন নায়ক। তাঁদের শরীরের ভঙ্গি, শ্রমের ছন্দ, দৈনন্দিন জীবনের সৌন্দর্য তিনি এমন সংবেদনশীলতায় ফুটিয়ে তুলেছেন যে ধাতুও যেন প্রাণ পেয়ে যায়।
তাঁর শিল্পের মতোই তাঁর জীবনও ছিল স্বাধীনচেতা। প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বাইরে থেকে শিল্পকেই জীবনের কেন্দ্র করে তুলেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি লেখালিখি, গবেষণা এবং দেশজ কারুশিল্পের নথিবদ্ধ করার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৮ সালে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর শিল্প আজও সমান প্রাসঙ্গিক। মীরা মুখোপাধ্যায়কে আধুনিকতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের মাটিতে, মানুষের হাতে এবং জীবনের অনাড়ম্বর সৌন্দর্যে। তাঁর শিল্প আজও আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায় সভ্যতার অগ্রগতির গল্পে আমরা কাদের দেখি, আর কাদের দেখতে ভুলে যাই? মীরা মুখোপাধ্যায়ের ভাস্কর্য সেই বিস্মৃত মানুষগুলিকেই বারবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করায়, শেখায় যে সৌন্দর্য কেবল আভিজাত্যে নয়, শ্রমের ঘামে, সাধারণ মানুষের জীবনে এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়ও লুকিয়ে থাকে।
