অভিজিৎ বসু
আগে যা ঘটেছে : পরিবর্তনের সময়ে অর্পণ শেষবারের মতো তার বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, যেতে বাধ্য হয়। সে তার শৈশবের স্মৃতি হাতড়াতে থাকে আর একদিন লিখতে শুরু করে দেয় সেইসব আশৈশব স্মৃতির কথামালা। এদিকে সেই স্মৃতি পর্যটনের মাঝেই এসে পড়ে আরেক কিশোরের উপকথা, যার জীবনের একমাত্র সম্বল ফুটবল, ফুটবলকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেই যার বেঁচে থাকা। সে তার জীবনের অন্যতম প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে শিখতে থাকে ফুটবলের কৃৎকৌশল। একদিন ভোরবেলায় খেলার মাঠে হানা দেয় পুলিশ। ভজার সেই শ্রদ্ধার, ভালোবাসার মানুষটির খোঁজে। হাতের কাছে অসহায় মানুষটিকে পেয়ে তাড়া করে পুলিশ। বুক কেঁপে ওঠে ছোট্ট ভজার, বলে ওঠে, ‘পালাও, পালাও সতুদা।’ মানুষটা দৌড় শুরু করে। একটা আওয়াজ শুনতে পায় ভজা : খটাস! গুলির শব্দ? তার চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়ে আসে, চোখ বন্ধ করে নেয় সে ।
এরপর? আসুন, পড়ে ফেলি এই পর্বের ‘…ঝাপসা চোখে’।
৩
‘My mama always said, “Life is like a box of chocolate. You never know what you are gonna get”.’
— Forrest Gump
এই শীতসকালেও কুলকুল করে ঘামছে ভজা। স্যাঁতসেঁতে কাঁথার ভিতর থেকে হাত বার করে বোঝার চেষ্টা করল পাশেই মা আছে কিনা। গলা শুকিয়ে গেছে। জল খাবে? না মাকে ডাকবে? কিছুক্ষণ ছটফট করার পর ‘মা! মা!’ বলে ডেকে উঠল সে।
এই অবধি এসে অর্পণের চোখের সামনে আবার ঝাপসা হয়ে গেল সমস্ত-কিছু।
অর্পণের মন ভাসতে থাকে পেঁজা তুলোর মতো, হালকা পালকের মতো। ভাসতে-ভাসতে হাজির হয় নিজের শৈশবে। শৈশবের উত্তরে। সে-সময়ের কলকাতায় বারুদের গন্ধ থাকলেও উত্তর তখনও বেশ খানিকটা উনিশ শতকি। ঢিমে তালের ট্রাম আর তার টুংটাং শব্দ, সন্ধে নামলে আবছা আলোআঁধারি। সব মিলিয়ে শ্লথ জীবনের গতি, টাল-খাওয়া বাবু হাতে-টানা রিকশায় বেপাড়া-ফেরত বাড়ির পথে, হাতে তখনও বেলফুলের মালাটা ধরা।

ছবি: শীলভদ্র দত্ত
‘কী রে, হল কী? এই কাকভোরে মা-মা করছিস কেন?’
‘মা, সতুদা…’, শেষ করতে পারে না ভজা।
‘কী হয়েছে সতুদার?’ মা জিজ্ঞেস করেন।
‘মা, সতুদাকে পুলিশ গুলি করেছে’, ভজা বলে।
‘কী যা-তা বকছিস! স্বপ্ন দেখেছিস। ঘুমিয়ে পড়।’
‘মা, তুমিই তো বলো ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। যদি সত্যিই সতুদা মরে যায়!’, বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে ভজা। সে বলে ওঠে, ‘আমি সতুদার বাড়ি যাব।’
‘সকাল হোক যাবি, এখন শুয়ে থাক। আর হ্যাঁ, আসার সময় রামধনিয়ার মাঠ থেকে একটু গোবর আর কাঠের গুঁড়ো নিয়ে আসিস।’
সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ভজা। তাকে পাশের পাড়া বোস লেনের ব্যানার্জিবাড়ি যেতে হবে, যেখানে তার সতুদা থাকে। সকাল সাতটা নাগাদ সতুদার বাড়িতে উপস্থিত হল ভজা।
ছেলেবেলার ভয়গুলো আজও গুছিয়ে রাখা আছে অর্পণের স্মৃতিপটে। ওর জীবনে হল্-এ গিয়ে দেখা প্রথম সিনেমা ‘সোনার কেল্লা’। ডিপথেরিয়ায় ভুগে চোদ্দ দিনের হাসপাতাল-বাসের পর ছোট্ট অর্পণকে তার বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন সোনার কেল্লা দেখাতে। বিছানায় বিছের সিনটায় অর্পণ বেজায় ভয় পেয়ে যায়। হাত পা অবশ হয়ে আসে । আশপাশের সবকিছুকেই খামচে ধরতে চায় সে। তার আরও মনে পড়ে যায়, কীভাবে দমদম স্টেশনে তার মেজদাদু তাকে মালগাড়ির গার্ডের কামরায় তুলে দিয়ে নামাতে ভুলে গিয়েছিলেন! সে কি হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য, নাকি তার গোটা অস্তিত্বটাই শেষ হয়ে যাবে! তখন, সেই অল্প বয়সে এসব চিন্তাই গ্রাস করেছিল তাকে।
সকাল সাতটা নাগাদ সতুদার বাড়িতে হাজির হল ভজা। পাড়ার ছেলেরা বাড়িটাকে ঠাট্টা করে ‘ঠান্ডাবাড়ি’ বলে ডাকে। এ বাড়ির মেঝে, উঠোন গোটাটাই শ্বেতপাথরে বাঁধানো। গরমকালের দুপুরে একটু সোয়াস্তির খোঁজে পাড়ার ছেলেছোকরারা এ বাড়ির ভেতরে সেঁধিয়ে যায়, আর সেখান থেকেই বাড়ির এই নামকরণ। রোববারগুলোয় অবশ্য সে-সুযোগ নেই কারণ উকিলজেঠু, মানে সতুদার বাবা বাড়ি থাকেন আর সারাদুপুর বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলেন। রাশভারী উকিলজেঠুকে পাড়ার ছেলেরা ভয়ই পায় আর আড়ালে খারাপ কথাও বলে। ওই তো উকিলজেঠুকে দেখা যাচ্ছে বারান্দায়! মুখে চুরুট, ইজিচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। ভয়ে-ভয়ে ভজা নীচ থেকে হাঁক পাড়ে— ‘সতুদা, ও সতুদা!’ বারান্দা থেকেই উকিলজেঠু মুখ বাড়ান, গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী রে ভজা, সাতসকালে সতুকে ডাকছিস কেন?’ এবার ভেতর থেকে সতুদার গলা শোনা গেল, ‘ভজু নাকি! ভেতরে আয়।’

ছবি: শীলভদ্র দত্ত
ভজার যেমন ফুটবল , অর্পণের ছিল ক্রিকেট। সেই কত ছোট বয়সে মামার বাড়ির মাল্টিব্যান্ড মারফি রেডিও-য় এবিসি স্টেশনে শোনা : Here comes Thommo round the wicket to Lawrence Rowe…। তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি সেকালের মফস্বলি দমদমে।
(চলবে)