বিশ্বকর্মার ঘুড়ি, কারখানার মাংসভাত আর মহাপাঞ্চ!

অরূপরতন চক্রবর্তী
বাঙালির বিশ্বকর্মা পুজো মানে শুধু যন্ত্রপাতির আরাধনা নয়—ঘুড়ির সুতো থেকে কারখানার ভোজ, সব মিলিয়ে একেবারে নিজস্ব উৎসব
বিশ্বকর্মা সর্বভারতীয় দেবতা হতে পারেন, কিন্তু বাংলায় এসে তাঁর চেহারাটাই যেন খানিক বাঙালি হয়ে গিয়েছে। উত্তর ভারতের বহু জায়গায় যে ধরনের বিশ্বকর্মা মূর্তি দেখা যায়, তার মুখাবয়ব, পোশাক বা সামগ্রিক গড়নের সঙ্গে বাংলার চেনা বিশ্বকর্মার বেশ তফাত। বাংলার শিল্পীর হাতে তিনি সুদর্শন, রাজকীয়, অনেক সময় যেন দেবলোকের ইঞ্জিনিয়ার কম, পাড়ার পুজোর হ্যান্ডসাম নায়ক বেশি!
আর বাঙালির বিশ্বকর্মার সঙ্গে আছে আর এক অদ্ভুত সম্পর্ক—ঘুড়ি।
ঠাকুরের হাতে বা মণ্ডপে ঘুড়ি বেঁধে দেওয়ার রেওয়াজ বহু জায়গায় দেখা যায়। কারণ একটা সময় বিশ্বকর্মা পুজোর দিন মানেই ছিল ঘুড়ি ওড়ানোর দিন। সকাল থেকেই ছাদে ছাদে যুদ্ধ। ‘ভোকাট্টা!’ চিৎকার উঠলেই পাড়ার ছেলেদের দৌড়—কাটা ঘুড়ি ধরতে কে আগে পৌঁছবে!
এখন কলকাতার আকাশে সেই দৃশ্য অনেকটাই কমেছে। বহুতল বেড়েছে, ছাদের চরিত্র বদলেছে, মোবাইল ফোনও ঘুড়ির সুতোয় টান দিয়েছে। তবু বিশ্বকর্মা পুজোয় এখনও কোথাও কোথাও কলকাতার আকাশে ঘুড়ি দেখা যায়। শহরতলি ও মফস্সলে ছবিটা আরও জমজমাট।
তবে বিশ্বকর্মা পুজোর আসল গল্প খুঁজতে গেলে একসময় ঢুকতে হত কারখানায়।
যন্ত্রের পুজো, তারপর পেটের পুজো
লেদ মেশিন, ড্রিল, হাতুড়ি, রেঞ্চ—সব সেদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গায়ে ফুল, সিঁদুর। সারা বছর যে মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাম ঝরে, বছরে একটা দিন সেই মেশিনই দেবতার আশীর্বাদ পায়।
আর পুজো শেষ হলেই শুরু দ্বিতীয় পর্ব—খাওয়াদাওয়া।
একটি ছোট লেদ মেশিনের কারখানার বিশ্বকর্মা পুজোর গল্প আজও মনে পড়ে।
কারখানার এক কোণে রাখা হয়েছে বিশাল এক জালা। মালিক থেকে শ্রমিক—প্রত্যেকে আসছেন নিজের নিজের বোতল নিয়ে। কেউ ঢাললেন রাম, কেউ হুইস্কি, কেউ বাংলা, কেউ আবার বিয়ার।
সব মিলিয়ে তৈরি হল এমন এক ‘বিশ্বকর্মা স্পেশাল পাঞ্চ’, যার রেসিপি কোনও বারটেন্ডারকে দিলে তিনি সম্ভবত পেশা বদলে ফেলবেন।
কে কতটা কী ঢালছেন, তার কোনও মাপ নেই। একমাত্র নীতি—‘দাও, আর একটু দাও।’
তারপর দুপুরে পাঁঠার মাংস-ভাত। সহযোগী সেই পাঞ্চ।
ফল যা হওয়ার তাই।
বিকেল গড়াতে কারখানার মালিক-শ্রমিকের মধ্যে শ্রেণিসংগ্রাম সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সকলেই একই অবস্থায়—বেহুঁশ।
কিন্তু বিপত্তি ঘটল অন্য জায়গায়।
পুরোহিতমশাইকেও অত্যন্ত ভক্তিভরে সেই পাঞ্চ পরিবেশন করা হয়েছিল। তিনিও ভক্তের আবদার ফেলতে পারেননি। এক গ্লাস, তারপর সম্ভবত আর এক গ্লাস।
ফল—বিশ্বকর্মার কৃপায় পুরোহিতমশাইও অচিরেই বিশ্রামে।
সমস্যা হল, তাঁর পাশের কারখানাতেও পুজো করার কথা ছিল। সেখানে সবাই ফুল-বেলপাতা নিয়ে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু ঠাকুরমশাইয়ের দেখা নেই।
খোঁজ নিয়ে আসল ঘটনা প্রকাশ পেতেই শুরু বিরাট ঝগড়া।
‘আমাদের পুজোটা হবে না?’
এদিক থেকে উত্তর, ‘আমরা কী করব, উনি নিজেই খেয়েছেন!’
তর্ক বাড়ছে। পরিস্থিতি প্রায় হাতাহাতির দিকে।
শেষে বাঙালির চিরাচরিত কূটনৈতিক সমাধান বেরোল।
রাগারাগি করতে আসা পাশের কারখানার লোকেদের সামনে এগিয়ে দেওয়া হল সেই জালা।
‘আগে একটু খেয়ে নিন, তারপর কথা হচ্ছে।’
তাঁরাও খেলেন।
কিছুক্ষণ পরে আর ঝগড়ার বিষয়টাই কারও বিশেষ মনে রইল না।
এই তো বাঙালির বিশ্বকর্মা!
সময় বদলেছে। বহু পুরনো কারখানা বন্ধ হয়েছে, শিল্পাঞ্চলের চেহারা পাল্টেছে। বিশ্বকর্মা পুজোর সেই ঘুড়ি, মাইক, দুপুরের মাংস-ভাত আর কারখানার হইচইও আগের মতো সর্বত্র নেই।
তবু স্মৃতির মধ্যে সেই বিশ্বকর্মা পুজো দিব্যি বেঁচে আছে।
আকাশে ঘুড়ি উড়ছে, নীচে ফুল-সিঁদুর মাখা লেদ মেশিন। হাঁড়িতে পাঁঠার মাংস ফুটছে। আর এক কোণে রাখা সেই রহস্যময় জালা।
যে পাঞ্চের এক গ্লাসেই মালিক-শ্রমিকের ভেদাভেদ ঘুচেছিল, দু’গ্লাসে পুরোহিতের পরের পুজো বাতিল হয়েছিল, আর তিন গ্লাসে দুই কারখানার আন্তর্জাতিক বিবাদ মিটে গিয়েছিল!
এমন সর্বজনীন সম্প্রীতির পানীয়ের রেসিপি অবশ্য আজও অজানা।