‘শব্দ, শব্দ, শব্দ’ -কলকাতাকে মাতিয়ে গেলেন নাসিরুদ্দিন শাহ

অভিজিৎ বসু
‘কলকাতা বারিশ’ নিবেদিত, নাসিরুদ্দিন শাহ্-র উপস্থাপনায় ‘WORDS, WORDS, WORDS’ দেখা এবং শোনার সুযোগ হল গত এগারোই অগস্ট জি. ডি. বিড়লা সভাগারে। আজকাল শিহরিত বা আনন্দিত হওয়ার মতো ঘটনা খুব বেশি ঘটে না চারপাশে। চতুর্দিকে কেবলই ঘৃণা আর ঘৃণা। এরই মাঝে ফুল-ঝরানো একটুকরো সন্ধ্যার সাক্ষী থাকলাম আমরা।
দীর্ঘকাল বাদে কলকাতার মঞ্চে এলেন নাসিরুদ্দিন। এ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহও ছিল তুঙ্গে। আমাদের এই আলোচনাও নিবদ্ধ থাকছে তাঁকে ঘিরে। যদিও পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল দুটি পর্বে বিভাজিত, প্রথমে ছিল সোহিনী সেনগুপ্ত ও অনির্বাণ চক্রবর্তীর পরিবেশনায় ‘কথা ও কাহিনি’।
নাসিরুদ্দিন শাহ্ ওঁর প্রিয় কিছু পাঠ্য থেকে পড়ে শোনালেন একটানা প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি, কণ্ঠনির্ভরতায়, মঞ্চে নাগাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে। মঞ্চে উঠে প্রথমেই বলে দিলেন— ‘উদ্যোক্তারা আমার সম্পর্কে খুব ভালো এবং চোখা মন্তব্য করেছেন। সে-সম্পর্কে আমি কীই-বা বলতে পারি? আমি কি বলব যে, ওরা যা প্রশস্তি করেছেন তার সবই তো আসলে সত্যি, Thank you very much; নাকি আমি বলব— না-না, এত বাড়াবাড়ির কী হল! আসুন, এসবকে পিছনে রেখে আমরা বরং অনুষ্ঠানের মূল পর্বে প্রবেশ করি।’
তারপর সেই অপ্রতিম ব্যারিটোনে নাসির শুরু করলেন : Words, Words, Words। শব্দ স্বরাট, সার্বভৌম, স্বাধীন। দর্শক খানিক নড়েচড়ে বসলেন।
প্রথমেই ‘When Shakespeare Wrote’, তারপর সরাসরি চলে এলেন ‘As You Like It’ থেকে সেই অবিনশ্বর মনোলোগ ‘All the world’s a stage…’-এ। এর পরের প্রবেশ ‘Merchant of Venice’-এ। শুরুর আগে অবশ্য বলে রাখলেন কেন তিনি এই নাটকটিকে একটি ট্র্যাজেডি বলে মনে করেন এবং আরও বললেন কেনই-বা তিনি শাইলককে এক ট্র্যাজিক হিরো বলে মানেন।
এরপর শুরু হল জাদুকলা। এই নাটকের বেছে-নেওয়া কিছু অংশ পড়তে থাকলেন নাসির, যেখান থেকে ওঁর প্রতিপাদ্যকে ধরবেন উনি! টেক্সট, কনটেক্সট আর সাব-টেক্সটের দ্বান্দ্বিক দোলাচলে, উচ্চারণ আর অভিব্যক্তির ভিতর দিয়ে সংখ্যালঘুর সংকটকে স্পষ্ট করে তুললেন। এ বড় মায়াময় অভিজ্ঞতা। দর্শক মুগ্ধ, বাকরুদ্ধ!
ঠিক করে এসেছিলেন টি. এস. এলিয়টের কবিতা থেকে পড়বেন বলে। কিন্তু শেষমুহূর্তে মত বদলিয়ে বিক্রম শেঠের ‘The Beastly Tales from Here and There’ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত দীর্ঘ কবিতা ‘The Elephant and the Tragopan’ থেকে পড়ে শোনালেন। উন্নয়ন আর প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের যে-দ্বন্দ্ব, আর তার সঙ্গে জুড়ে-যাওয়া একশ্রেণির মানুষের স্বার্থপর লালসা, যা প্রকৃতির আদিম সন্তান বন্য প্রাণীকুলকে যুগে-যুগে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে— এই কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয় সেটাই। সেজন্যেই হয়তো বেশ কয়েকবার একটা লাইন ফিরে-ফিরে আসে : When the road comes, the forest goes.।
কবিতায় যাওয়ার আগে নাসির অবশ্য বলে নেন, কেন এই কবিতা। নেপাল, হিমাচল, উত্তরাখণ্ড-সহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে-পরিমাণ ধ্বংসলীলা মানুষ ও সভ্যতার ওপর নেমে আসছে, সেসব দেখে এবং গ্রেট নিকোবর দ্বীপের একটা গোটা বনাঞ্চল হয়তো সাফ হয়ে যাবে আগামী দিনে— তা ভেবেই একজন শিহরিত সচেতন শিল্পী হিসেবে তিনি এই টেক্সটটিকে বেছে নিয়েছেন। ওই ‘When the road comes…’ বার-তিনেক এসেছে নাসিরের উচ্চারণে, আর প্রতিবারই তার অভিঘাত পাল্টে-পাল্টে যাচ্ছে : সম্ভাবনা… উদ্বেগ… আশঙ্কা…!
প্রসঙ্গত, কবিতায় Friends শব্দটি বেশ ক’বার এসেছে, আর প্রতিবারই নাসির তাকে FRENDZ করে নিলেন অবলীলায়!
ভারতবর্ষের চলমান ঘটনাপ্রবাহে নাসিরুদ্দিন শাহের অবস্থান আমাদের অজানা নয়। কিন্তু মোটেও চড়া বা স্লোগানধর্মী না হয়ে কেবল টেক্সট বেছে নেওয়ার কুশলতা এবং গলার মডিউলেশনে কীভাবে আবেগের বিভিন্ন স্তরকে টেক্সট থেকে ছেঁকে তুলে আনতে হয়, তা নাসির দেখিয়ে গেলেন।
নাসিরুদ্দিন শাহ্ তো বড়মাপের অভিনেতাই শুধু নন, তিনি একজন অভিনয়গুরু, শিক্ষকও বটে! সর্বোপরি একজন রাজনীতি ও সমাজ-সচেতন মানুষ। নিঃসন্দেহে ওঁর তূণে অগুনতি তির আছে, কিন্তু এই সত্তর-পেরনো বয়সেও তিনি সেসবের অব্যর্থ প্রয়োগে অবিচল।
সবশেষে দর্শকের অনুরোধে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘দোয়া’ কবিতাটি (নাজম্) স্মৃতি থেকে শুনিয়ে গেলেন।
এই আকালেও মনটা ভালো হয়ে গেল। আমরা হয়তো আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করব, কেউ-কেউ। নাসিরুদ্দিন শাহ্ ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।