ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে বারেবারে ফিরে আসে ফিনিক্সের দল: শৈশব ক্যান্সার ও জীবনের গল্প

ইন্দ্রাণী দাশ
শৈশবে বড়োঠাকুমার মুখে শুনেছিলাম, ‘ক্যান্সার বলে ক্যান সারব?’ শব্দটার ভয়াবহতা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই এটুকু বুঝে গিয়েছিলাম একরোখা এই অদম্য অসুখ যে ঘরের চৌকাঠে নিঃশব্দে এসে পৌঁছোয়, ধ্বংসলীলা না চালিয়ে সে শান্ত হয়না। আর সর্বগ্রাসী এ অসুখ যখন থাবা বসায় শিশুশরীরে? যখন খেলার মাঠের কুমীরডাঙার প্রাঞ্জল স্মৃতিকে প্রতিস্থাপন করে ফেলে হসপিটাল করিডোর আর আইসিইউ-এর চার দেওয়াল? প্রবহমান সময়ে হঠাৎ কেউ যেন ফেলে দেয় সুবিশাল রেলগেট! হই-হট্টগোলের বয়ঃসন্ধি আচমকা ভরে ওঠে বুকচাপা বিষাদে! এই বিষাদের রঙ রক্তের রঙের মতন টকটকে লাল। এই বিষাদের গন্ধ ওষুধের অসহনীয় গন্ধের মতো প্রবল বিকট। এই বিষাদের চেহারা দৈত্যসম, এই বিষাদের শব্দে শুধু ভেসে আসা রুদ্ধশ্বাস আর্তনাদ।
এই আর্তনাদের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় সাড়ে তিনবছর আগে পেশাসূত্রে। তখন অবশ্য আমিও জানতাম ক্যান্সার চিৎকার করে করে প্রতিটি আর্ত পরিবারকে বলে, ‘ক্যান সারব?’ কিন্তু, তারপর আমি নতুন করে শিখলাম ‘ক্যান্সার’ মানেই জীবন থেকে ছুটি নয়। ‘ক্যান্সার’ মানেই সমস্ত আনন্দ থেকে নির্বাসন নয়। জীবন-মৃত্যুর ক্রমশ যুদ্ধে নিয়তি অনেকক্ষেত্রেই বাড়িয়ে দেয় আয়ুরেখা। এ অসুখে যেমন নিম্নচাপের আকাশ রয়েছে তেমনই রয়েছে অলীক বসন্ত-বিকেলের নরম আলো।
আমাদের ক্যান্সার যোদ্ধারা আসলে দুর্বার। এরা আসলেই আগুন পাখি। ক্যান্সার কারও কেড়ে নিয়েছে দুই পা, কারও দৃষ্টি, কারও বা মস্তিস্কের এক অংশ। তবু এরা ছোটে… উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে হয় দশম, উচ্চশিক্ষায় পাড়ি দেয় নতুন দেশে। কেউ খোলে নিজের স্বপ্নের বুটিক, কেউ বা হয় সফল ইস্কুলমাস্টার। সঠিক সময়ে, সঠিক ভাবে, সঠিক জায়গায় চিকিৎসা শুরু করতে পারলে হয়তো আমরা এমন অনেক ফিনিক্স দেখতে পাবো, যারা বুকের ভেতরের বারুদ নিভতে না দিয়ে ধ্বংসস্তুপ থেকে নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বেড় করে আনছে প্রতিনিয়ত।
সেপ্টেম্বর মাস ‘চাইল্ডহুড ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেশ মান্থ’৷ তাই এই মাসে আমরা প্রত্যেকে শপথ নিই, আমাদের চারিপাশে যদি এমন কোনো শিশু থেকে থাকে যে সঠিকভাবে কোনো হাসপাতালের চৌকাঠটুকুও স্পর্শ করতে পারছেন না,যার কাছে কেবলই ক্যান্সারের অর্থ ‘না সেরে ওঠা অসুখ’, তাকে পৌঁছে দিতে হবে ক্যানকিডস কিডস্ক্যানের দোড়গোড়ায়। ‘ক্যানকিডস কিডস্ক্যান’ এমন একটি জাতীয় অলাভজনক সংস্থা, যা শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা ও তাদের পরিবারের সামগ্রিক সহায়তার জন্য কাজ করে। (হেল্পলাইন নাম্বার— ৮৮৬০৩১৪০৪)
ইন্টারেস্টিং কেস
পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে এমন জাদুকরী মন্ত্র আছে যে, নিজের সমস্ত মনখারাপও এই ওয়ার্ডের ভেতরে এলেই বিলীন হয়ে যায়। একবার, বছর সাতের একটি বাচ্চার বেস্টফ্রেন্ড হয় বছর বারোর এক কিশোর৷ দু’জনের চিকিৎসা একই সঙ্গে শুরু হওয়ার সুবাদে দু’জনেই দুজনের অবলম্বন হয়ে ওঠে। একজন বোন ম্যারো টেস্টে কেঁদে উঠলে আরেকজন বলে, ‘কাঁদিস না রে, তোর পরেই তো আমার হবে।’ আবার সে হাতের পিকলাইন ড্রেসিং-এ ছটফট করে উঠলে তার হরিহর আত্মাটি বলে, ‘এই এই তুই কাঁদছিস কেন? তোর তো দুমিনিটেই ড্রেসিং হয়ে যায়।’ তবে ওই আর কি ভাগ্যের পরিহাস! চিকিৎসা শুরু নিজেদের হাতে থাকলে শেষও তো হয় নিয়তির ইচ্ছায়। একজন ছুটি পেলেও আরেকজন বাধা পড়ে যায় আবারও চার দেওয়ালে। একদিন ওয়ার্ডে ঢুকে দেখি তার কি কান্না! ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে দুচোখ জুড়ে। আমি জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, তাকে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের নিদান দেওয়া হয়েছে। ভাবলাম, ট্রান্সপ্লান্টের অপরিসীম কঠিন লড়াইয়ের কথা সে বুঝি জেনে ফেলেছে তাই তার এমন দুঃখসাগর! তারপর জানলাম, ট্রান্সপ্লান্টের দুঃখ নয়। কাছের বন্ধুকে ছেড়ে একা একা ভিনরাজ্য পাড়ি দিতে সে নারাজ। তার পাশে তার বন্ধু থাকলে সে এত ঝক্কি হাসিমুখে মেনে নেবে। আর বন্ধু না থাকলে? নৈব নৈব চ! আহারে জীবন! এই নিখাদ সারল্য ভরা বন্ধুত্ব যার কাছে ট্রান্সপ্লান্টের যন্ত্রণাও ফিকে এমন বন্ধু যেন আমাদের ঘরে ঘরে হয়!
মনোবিদ হিসেবে মতামত
শিশুমন ও তার পরিবারকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনটি জিনিস খুব স্পষ্ট হয়েছে৷ এক, মনের ধোঁয়াশা মনকে অতল অন্ধকারে পাঠিয়ে দেয়৷ তাই ক্যান্সার ধরা পড়ার পরে রোগীকে ক্যান্সারের বিভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার করে তার অবস্থা বোঝানোর চাইতে ঢের উপকারী তাকে বোঝানো তার অসুখের নাম, বিভাগ, চিকিৎসা পদ্ধতি ও সাম্ভাব্য সুস্থতার হার। ‘রক্তের অসুখ’-এর চাইতে ‘লিউকেমিয়া’ শব্দের ওজন বেশী হলেও নিজের সমস্যার স্বচ্ছতা নিজের কাছে না এলে সে বুঝবে কিভাবে তার লড়াইয়ের অস্ত্রকে ঠিক কতটা ধারালো হতে হবে?
দুই, অ্যাক্টিভ লিসেনিং। এ এক জীবনদায়ী মহৌষধির মতোই শক্তিশালী। এমন অনেক সময় আসে যখন বলার মতন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এক মৃত্যুপথগামী শিশুর মা’কে কি-ই বা বলা যায়? শুধু শোনা যায় হাতের ওপর হাতটা রেখে৷ সে যদি স্পর্শ চায় তবে প্রয়োজনে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তার যাত্রাপথটাকে আর কিছুটা শান্ত করা যায়৷ তার কথা শুনে, শুধুমাত্র শুনে, এটুকু বোঝানো যায়, ‘তুমি যে কঠিন অমসৃণ রাস্তা বা উত্তাল ঢেউয়ের মাঝখানে একা হেঁটে যাচ্ছো, তোমার এই পথটুকুতে তুমি নিঃসঙ্গ নও। আমি আছি, যতখানি চাইবে তুমি৷ আর যতটুকু পথ তুমি একাই হাঁটতে চাইবে সেখানেও তুমি স্বাধীন হয়ে একা চলতে পারো।’ তিন, অনেকক্ষেত্রেই অনেকরকমের ক্যান্সার সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণা মনে রয়ে যায় রোগীর মা-বাবা অথবা পরিবারের যেকোনো কারোর। লিঙ্গ বৈষম্যের প্রভাব তো রয়েছেই। ‘কন্যা সন্তানের চিকিৎসা না করালেও চলে’ অথবা ‘ক্যান্সার তো ছোঁয়াচে, তাই বাবা আসতে চান না হাসপাতালে’ এমন অভিজ্ঞতাও প্রায়শই হতে থাকে। সেই সময় আমি যদি রোগীর মা-বাবার দৃষ্টিভঙ্গী বা তাদের বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটকে বোঝার চেষ্টা না করে তাদের ওপর মেজাজ হারিয়ে ফেলি, তবে সেটা আদতে শিশুর চিকিৎসার পথেই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ওরা ভালো থাকুক। ভালো থাকুক সেই মা— যে তার আত্মীয়কে বলে এসেছিলেন, ‘আমার মেয়ের ৬০ প্যাকেট রক্ত দেওয়ার সময় প্যাকেটের গায়ে লেখা ছিল না পদমীর নাম। তাই হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ মানিনা আমি মানিনা।’ ভালো থাকুক সেই বাবা, সর্বশান্ত হতে হতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরেও যিনি কন্যাসন্তানের শ্বাসটুকু শোনার জন্যে রাতদিন অক্লান্ত লড়ে যাচ্ছেন। ভালো থাকুক সেই সদ্যজাত বোনটা, যে ক্যান্সার আক্রান্ত দাদার চিকিৎসার জন্য জন্ম থেকেই মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হল। ভালো থাকুক সেই সমস্ত পরিবারের স্তম্ভরা, যারা লড়ছে বলে আমরা জিতে যাচ্ছি বারবার… আর জিতে যাচ্ছে আমাদের একরোখা সব ফুটফুটে ফুলগুলো।