মণিপুর আজ আবার রক্তাক্ত। কয়েক মাসের আপাত শান্তির পর চলতি মাসের শুরুতেই এক ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় রাজ্যের গত কয়েক মাসের তুলনামূলক শান্তির পরিবেশ আবার অশান্ত হয় ওঠে। তিন বছরের দীর্ঘ সংঘাতের পরও পরিস্থিতি যে স্থিতিশীল হয়নি, এই ঘটনা তারই নির্মম প্রমাণ।
৭ এপ্রিল বিষ্ণুপুর জেলার ত্রংলাওবি আওয়াং লেইকাই এলাকায় একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে পাঁচ ও ছয় বছর বয়সী দুই শিশুর মৃত্যু হয়, আহত হন তাদের মা। নিহতদের বাবা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য।
এই ঘটনার পর থেকেই প্রতিবাদ, অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ সব মিলিয়ে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা তেলের ট্যাংকারে আগুন ধরিয়ে দেয়, রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আরও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ১৮ এপ্রিল উখরুল অঞ্চলে জাতীয় সড়কে অতর্কিত হামলায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসহ দু’জন নিহত হন। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত সাত জন প্রাণ হারিয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন ১২ জন।

উপত্যকায় বসবাসকারী হিন্দু মেইতেই জনগোষ্ঠী এবং পাহাড়ি অঞ্চলের প্রধানত খ্রিস্টান কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও শত্রুতা থেকেই শুরু হয় বচসা। তিল থেকে তাল হয়ে দ্রুত সন্ত্রাস ছড়াতে থাকে তারপর।
স্বাধীনতার পর থেকেই মণিপুরে জাতিগত জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। মেইতেই, কুকি ও নাগা – প্রতিটি গোষ্ঠীই পৃথক রাজ্যের দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে তোলে।
ভূমি ও সংরক্ষণ নীতিও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এমন আইন ছিল যাতে মেইতেইরা পাহাড়ি এলাকায় জমি কিনতে পারে না, আর কুকি-জো জনগোষ্ঠী তফসিল উপজাতি হিসেবে বিশেষ সুবিধা পায়। কিন্তু ২০২৩ সালে হাইকোর্টের এক নির্দেশে মেইতেইদেরও তফসিল উপজাতির স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা উঠতেই কুকি-জোদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে তাদের সংরক্ষিত সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত হয়ে যাবে। সেই আশঙ্কাই দাঙ্গার আগুনে ঘি ঢালে।
তবে এই সংঘাতের ইতিহাস শুধু সাম্প্রদায়িক নয়। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামরিক উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিশেষ করে ১৯৫৮ শালের আর্মড ফোর্সেস (স্পেশাল পাওরাস) অ্যাক্ট সেনাবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়, যা নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বারবার উঠেছে। মণিপুরে সেনার বিরুদ্ধে ধর্ষণ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নতুন নয়। দু হাজার সালের মালোম হত্যাকাণ্ডে ১০ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর পর প্রতিবাদের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন ইরম শর্মিলা চানু, যিনি প্রায় ১৬ বছর ধরে অনশন চালিয়ে আর্মড ফোর্সেস (স্পেশাল পাওরাস) অ্যাক্ট প্রত্যাহারের দাবি জানান। একইভাবে ২০০৪ সালে এক তরুণীর ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে মণিপুরের মহিলাদের নগ্ন প্রতিবাদ সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

বর্তমানে ২৫০টিরও বেশি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে। যদিও তার ফলে সাম্প্রদায়িক হিংসা থামেনি, বরং সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বা ‘মাদক সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করার মতো মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা হয়। বিশ্বজুড়ে সফর করেও দীর্ঘ সময় মণিপুরে না যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর অনেকাংশের ক্ষোভ বাড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫-এ ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের পদত্যাগ সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরিস্থিতি বদলায়নি।
এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ। ২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৬০ হাজার মানুষ। অনেকের মতেই, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসেবের অনেক বেশি। গ্রাম ছেড়ে ত্রাণশিবিরে ঠাঁই নেওয়া মানুষদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কৃষিনির্ভর অঞ্চলে বাফার জোন তৈরি হওয়ায় চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে, নিজেদের জমিতেই যেতে পারছেন না কৃষকরা।
দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের এলাকা পাহারা দিতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। রাষ্ট্র মাঝখানে ‘বাফার জোন’ তৈরি করে যেন একটি অস্থায়ী সমাধান দাঁড় করিয়েছে, তবে তা কতটা স্থায়ী শান্তির, প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবে এই সংকটের সমাধান কি? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ী জানালেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সামরিক মোতায়েন কিংবা নেতৃত্ব পরিবর্তন শুধু সমস্যার উপসর্গে প্রলেপ দিচ্ছে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান করছে না। তাঁর মতে, ত্রিপাক্ষিক আলোচনার এবং নিরপেক্ষ কোনও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা প্রয়োজন, যেখানে কুকি, মেইতেই এবং সেই তৃতীয় পক্ষ মিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করবে।
ইমনবাবু মনে করেন, মণিপুরের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে গণতান্ত্রিক আলোচনা অপরিহার্য। মেইতেই ও কুকি উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই সহাবস্থানের মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মণিপুর আজ ভারতের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। শুধু শক্তি প্রয়োগ বা রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে নয়, গণতান্ত্রিক সংলাপ, ন্যায়সঙ্গত নীতি এবং সংবেদনশীল নেতৃত্ব ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়। যতদিন না সরকার সেই পদক্ষেপ নিচ্ছে ততদিন মণিপুরে শান্তি ফিরে আসার আশা কেবলই ক্ষীণ হয়ে থাকবে।

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো, আল-জাজ়িরা
ছবি সূত্র: পিটিআই