এসআইআর থেকে অভয়া হয়ে শ্রীজাত – এবারের ভোটে একের পর এক বড় ইস্যু। তবে নাগরিকত্ব বিষয়টি হয়ত এবারের অন্যতম প্রাসঙ্গিক বিষয়। বাঙালি কতটা সত্যিই বাঙালি? আদৌ কি বেঁঁচে আছে বাঙালি? নাকি সবটাই অনাবাসী ঢং? দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও এখন বাংলা মাধ্যম স্কুল খুঁজে পাওয়া শক্ত। তাই বারেবারে আজ বাংলার ভবিষ্যৎ-এর প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আর এই প্রশ্নগুলো নিয়েই আমরা হাজির হয়েছিলাম কিছু তথাকথিত ঐতিহাসিক এলাকায়, যে এলাকাগুলি বাংলাভাষীদের হাতছাড়া হয়েছে দীর্ঘদিন।
তাহলে কি এইসব অঞ্চলে অবাঙালি হলেই থাকা যাবে না? আমরা তা কখনওই চাইছি না। কিন্তু স্থানীয় ইতিহাসকে ভোলা বা মুছে দেওয়া কি অন্যায় না? এপ্রিলের এক চূড়ান্ত গরমের দুপুরে আমরা সে প্রশ্ন নিয়েই হাজির হয়েছিলাম জোড়াসাঁকো পাড়ায়। কে না জানে, এসব রাস্তায় একদা হেঁটে চলে বেড়াতেন ঠাকুর পরিবারের সকলেই। অবন-গগন-রবি কার না পায়ের ধুলো লেগে এসব রাস্তায়! অথচ আজ এখানে যখন আমরা কথা বললাম মানুষজনের সঙ্গে, জানলাম বেশিরভাগই জানেন না ঠাকুর পরিবারের কথা। এমনকি, এবারের ভোটে এই এলাকায় নেই কোনও বাংলাভাষী প্রার্থীও… একমাত্র ব্যতিক্রম অবশ্য এসইউসিআই দল।
প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই অনেক মহলেই এই বিষয়ে চাঞ্চল্যে সৃষ্টি হয়েছে। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে গঠিত সংগঠন ‘বাংলাপক্ষ’র কর্ণধার গর্গ চট্টোপাধ্যায় জানালেন, জোড়াসাঁকো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান হলেও আশপাশের অঞ্চলের মানুষ এই ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির আশেপাশের সামাজিক পরিবর্তনকে তিনি এই সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার চরম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
গর্গবাবুর মতে, পশ্চিমবঙ্গের শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে বহু দশক ধরে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটেছে, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালীন ভোটের স্বার্থে বা দূরদর্শিতার অভাবে নিয়ন্ত্রণ করেনি। ফলে বহু এলাকায় বাঙালিরা ক্রমশ সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। হারিয়েছে নিজেদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব। এই পরিবর্তনের ফলে কিছু এলাকা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপস্থিতিই সঙ্কটের মুখে। জোড়াসাঁকোর পাশাপাশি তিনি নজরুল ইসলামের জন্মস্থান চুরুলিয়ার কথাও বললেন, সেখানেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী প্রার্থীর নির্বাচনেও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগের অভাব রয়েছে, এবং এর জন্যে পরিবর্তিত জনবিন্যাসকেই দায়ী করেন গর্গবাবু।
৫২-র ভাষা আন্দোলনের কথা আজ অনেকেরই অজানা। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম বরকতরা। সুমনের গানে তার উল্লেখ আছে। আজ কি স্কুল কলেজে সে ইতিহাস জানানো হয় আর? অথচ, আজও ভিন রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলতে গিয়ে বাঙালি বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। যেমন নিজের ভিটেতে বৈধ নাগরিকতার নামে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছেন কত মানুষ। নয়া এই শরণার্থীরা তাই আবার প্রাসঙ্গিক করে তুলছেন বাঙালির আত্মসম্মানের লড়াই মুক্তিযুদ্ধকে, বা ঘটকের সিনেমাকে। এবারের ভোটে তাই প্রাসঙ্গিক ইতিহাস ও সমকালের এই গোটা চালচিত্র।
নেতা নেত্রীরা মহাপুরুষদের বা কবি সাহিত্যিকদের যথেচ্ছ ভুল নাম বা ভুল শিল্পকাজের উল্লেখ করছেন প্রচারের মঞ্চে। অবশ্য শুধু নেতারাই বা কেন, পড়ালেখা জানা মধ্যবিত্ত কতটা আজ সচেতন এ বিষয়ে? উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালি কি আর বাংলা স্কুলে পড়ায় ছেলেমেয়েদের? আর কর্মসংস্থানের ভাষা তো বরাবরই ইংরেজি বা হিন্দি। ফলে দৈনন্দিন জীবনে বাংলার ব্যবহার কমে আসছে, এমনকি কথ্য বাংলাতেও প্রকট হচ্ছে হিন্দি ব্যাকরণের প্রভাব। যার নমুনা কত কত ‘কেন কি’ ইত্যাদি। আর কাগজ খুললেই বিজ্ঞাপনে ভুল বানানের বাংলা কপি লেখা তো আজ রেওয়াজই।
গর্গবাবুর দাবি, এই পরিবর্তন শুধু শহর বা শিল্পাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন বা নেতৃত্বের সঙ্গেও বাঙালি সাংস্কৃতিক ধারার সম্পর্ক হারাচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই প্রবণতা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বাঙালিরা নিজেদের রাজ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় সচেতনতা ও প্রতিরোধ প্রয়োজন।

বিশেষ সহযোগিতায়: সৌম্যা ঘোষ।