
শিক্ষক এবং কবি শুভজিৎ গুপ্তর ফুটবল নিয়ে আলাদা একটা উত্তেজনা বরাবরই। সেই উত্তেজনা কি উন্মাদনায় পৌঁছয় বিশ্বকাপের সময়? এবারের বিশ্বকাপের পাশাপাশি খেলা দেখার উত্তেজনা ও আরও অনেক কথা তিনি জানালেন ট্রামলাইনকে। কথা বললেন অরূপরতন চক্রবর্তীর সঙ্গে।
ট্রামলাইন: ছোটবেলায় বিশ্বকাপ দেখা শুরু কিভাবে?
শুভজিৎ: আমার খেলা দেখা শুরুর অভিজ্ঞতাটা তো অন্যরকম। ছোটবেলায় যখন আমি উত্তরবঙ্গে থাকতাম তখন তো আমরা রেডিওতে খেলা শুনতাম। খবরের কাগজ একদিন পরে পৌঁছতো। আজকে দুপুরে যে খবরের কাগজটা, সেটা আমরা পেতাম পরের দিন। রেডিওতে খেলা শোনার ফলে তখন আমরা পতাকা তৈরি করতাম। রঙিন কাগজ কিনে সেই কাগজগুলোকে আমরা পতাকা বাঁশের মধ্যে লাগিয়ে দিয়ে বা অন্যভাবে সে পতাকাগুলো আমরা ঝোলাতাম। খেলার খবর পাওয়া বলতে রেডিওতে রিলে শোনা আর ওই খবরের কাগজের পাতায় দেখা ছবিগুলো কেটে কেটে জমানো।
তারপরে কলকাতা শহরে এসে প্রথম ১৯৮২-র যে বিশ্বকাপ সেটা আমি রেডিওতে শুনেছি। ‘৮৬-র বিশ্বকাপের সময় অবশ্য কলকাতায় টিভি চলে এসেছে। তখন সেই অ্যান্টেনা বাঁশের মাথায়, একজনকে ছাদে উঠে বাঁশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অ্যান্টেনা ঠিক করে করতে হত এবং বাংলাদেশ বুস্টার দিয়ে দেখা হত, আমার যতটুকু মনে আছে।
১৯৮৬-র বিশ্বকাপে আমা

দের খুব মন খারাপ। আমরা ব্রাজিলের সমর্থক। ব্রাজিল হেরে গেছে। অবশেষে আমরা একটা সান্ত্বনা পেয়েছিলাম যে ফাইনালে যে রেফারি তিনি ব্রাজিলের ছিলেন। এটা আমাদের কাছে একটা বড় সান্ত্বনা হয়েছিল কিন্তু ব্রাজিলের হারার দুঃখ সবাই ভুলে গেছিল বোধহয় মারাদোনাকে দেখে। ১৯৮৬-র বিশ্বকাপের মারাদোনার যে বিখ্যাত গোল, হ্যান্ড অফ গড বা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাতজনকে কাটানো গোল, সেটা কিন্তু টেলিভিশনে সরাসরি আমরা দেখেছি। তখন সাদা কালো টেলিভিশন। সে টেলিভিশনের দরজা থাকতো। টেলিভিশনটা একটা বাক্সের মধ্যে থাকত, দরজা বন্ধ করে রাখা যেত আলমারির মতো। সেইখান থেকে আস্তে আস্তে ধরুন খেলা দেখা ব্যাপারটা এলো। তারপরে শহরে আসার সুবাদে মাঠে ময়দানে খেলা দেখা। আমি উত্তরবঙ্গের একটা ছোট শহরে থাকতাম, আলিপুরদুয়ার জংশন। সেখানে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে আসা কলকাতার বড় ক্লাবের খেলোয়াড়দের আমি দেখেছি। শ্যাম থাপা থেকে উলগানাতন – এদের খেলা ওখানে দেখেছি। শহরে আসার পর কিন্তু এই টিভি দেখা এবং ময়দানের গিয়ে খেলা দেখার ব্যাপারটা এলো টিভির ওই উন্মাদনাটা কিন্তু বিশ্বকাপটাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে দিয়েছিল।
ট্রামলাইন: উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতায় এসে বিশ্বকাপের খেলার দেখার মধ্যে কি ফারাক দেখলেন ?
শুভজিৎ: কলকাতা শহরে খেলোয়াড়দের ছবি দিয়ে পোস্টার বানানো বা ব্যানার লাগানো, এটা কিন্তু আস্তে আস্তে আশির দশকের শেষ থেকে বৃহত্তরভাবে শুরু হয়েছিল। হ্যাঁ, আমাদের কাছে সেটা নতুন ছিল। আমি মফস্বল থেকে এসেছি। বিদেশী দলের কোনও পতাকা বা জার্সি যে এভাবে কিনতে পাওয়া যায় সেটাও তো আমরা জানতাম না। তখন তো গোটা ব্যাপারটাই একটা বেশ অন্যরকম। ‘৮৬র ওই বিশ্বকাপটা কিন্তু একেবারে জীবনে অন্যরকম একটা আস্বাদ এনে দিয়েছিল।

ট্রামলাইন: আশির দশকে কলকাতায় টিভি আসার পর অভিজ্ঞতা কেমন?
শুভজিৎ: তখন তো নিজেদের টিভি ছিল না। পাড়ায় একজন দু জনের বাড়িতে টিভি থাকতো। তাদের বাড়িতে সবাই লাইন দিয়ে গিয়ে টিভিতে খেলা দেখতাম। কোনও কোনও ক্লাবে টিভি এসে গেছিল। আরও অনেক পরে, নয়ের দশকের শেষে এসব এলো। কিন্তু এই ‘৮৬র বিশ্বকাপটা কিন্তু আমার মনে হয় বাঙালির খেলা দেখাটাকে বদলে দিয়েছিল। ‘৮২র বিশ্বকাপের সময় যতটুকু জানি, খানিকটা খানিকটা টিভি এসেছিল কিন্তু সেটা খুব গুটিকয় মধ্যবিত্তের ঘরে ছাড়া বোধহয় তখনও টিভি সেভাবে স্থান পায়নি। তখন তো টিভিতে সারাদিন প্রোগ্রামও হত না, সন্ধেবেলা প্রোগ্রাম হত। টিভি দেখা শুরু হত ‘কু’ আওয়াজ দিয়ে আর শেষ হতো স্ক্রিনে ঝিরঝির দিয়ে। রবিবার আলাদা রকম অনুষ্ঠান হত, বাচ্চাদের জন্য গরমের ছুটি পুজোর ছুটির অনুষ্ঠান। ব্যাপারটা হলো, ‘৮২র বিশ্বকাপটা কিন্তু বাঙালির খেলা দেখাকে বদলে দিল। ফুটবল খেলার প্রতি উন্মাদনা চিরকালই বাঙালির ছিল। আমার ধারণা, ‘৮২র বিশ্বকাপের সময় টিভি এসে কিন্তু বাঙালি সেই জায়গাটা পাল্টে গেল।

ট্রামলাইন: বিশ্বকাপের সময় কি বন্ধু-বান্ধব মিলে খেলা দেখা হয়?
শুভজিৎ: সেই ব্যাপারটাতো তো বরাবরই আছে। দল বেঁধে মাঠে যাওয়া। দল বেঁধে দেখা বিশ্বকাপ দেখাটা মূলত ক্রিকেটের সময় হত। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলটা যেহেতু মূলত রাতের দিকে হয় সেহেতু বাড়িতেই দেখা হয়। আমার মেয়ে খুব ফুটবল ভক্ত। আধুনিক ফুটবলের নারী নক্ষত্রের খবর রাখে। বুন্দেসলিগার কোন ক্লাবের কে কোচ থেকে না লা লিগায় কি হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি প্রত্যেকটাই ও খবর রাখে। আমি আর মেয়ে শেষ বিশ্বকাপগুলো একসঙ্গে বসে বসে দেখেছি। এবার ও এখন হায়দ্রাবাদে। তবে, ও আর আমি থাকলে, বাড়িতে পতাকা-টতাকা চলে আসে। জার্সি চলে আসে। নানা রকম স্কার্ফ চলে আসে। বাড়িটা মোটামুটি তখন একটা ছোটখাটো সাপোর্টারদের রুম, একটা ক্লাব ঘরের মতন তৈরি হয়ে যায়। এবার একা থাকায় সেটা হয়নি।
ট্রামলাইন: এই বিশ্বকাপে কারা এগিয়ে আছে, মনে হচ্ছে?
শুভজিৎ: আমি চিরকাল ব্রাজিলের সমর্থক। ব্রাজিল বেরিয়ে গেছে। রোনাল্ডো চলে গেছে। ব্যক্তিগত ভাবে যাদের পছন্দ করি তারা নেই কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, হয়ত ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, স্পেন, এই তিনটে দলের মধ্যে কেউ ফাইনাল উঠবে এবং চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। এখন আধুনিক ফুটবলে বা যে কোনো খেলায় ছোট টিমগুলো যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খেলে তাতে ছোট বড়-র ফারাক কিন্তু খুব কমে গেছে। দু-তিনজন প্রতিভাবান প্লেয়ারেই শুধু ফারাক হয়ে যায়। সব দেশের খেলোয়াড়রা সবাই সব জায়গায় খেলছে প্রত্যেকে প্রত্যেকের শক্তি বা দুর্বলতা জানে।
ট্রামলাইনের তরফে আপনাকে ধন্যবাদ। বিশ্বকাপের বাকি দিনগুলো আনন্দে কাটান।