
২০০৮ সালে কলকাতায় এসেছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র মারাদোনা। অনেকটা সময়ে তাঁর সঙ্গে কাটানোর সুযোগ হয়েছিল ট্রামলাইনের সম্পাদক তথাগত দত্তের। তখন তিনি একটি টিভি চ্যানেলের কর্ণধার ছিলেন। সে সুবাদেই মারাদোনার একটি অসাধারণ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ এসে গেল। তাই তাঁর সেই স্মৃতিগুলো তিনি ভাগ করে নিলেন ট্রামলাইন-এ । কথা বললেন অরূপরতন চক্রবর্তীর সঙ্গে।
ট্রামলাইন: ২০০৮-এ মারাদোনা কলকাতায় এসেছিলেন। তখন আপনি মারাদোনার সাক্ষাৎকার নেন। শুধু তাই না, তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলেন অনেকটা সময়ও। সেই অভিজ্ঞতাটা যদি বলেন…
তথাগত: বিশ্বকাপের এ মরশুমে মারাদোনার কথা প্রায়ই মনে পড়ছে। কারণ, এই মেক্সিকোতেই তো মারাদোনা তাঁর শ্রেষ্ঠ বিশ্বকাপটা খেলেছিলেন। এবং যেখানে খেলাগুলো হচ্ছে, এই সব মাঠেই উনি জাদুগুলো ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ৮৬ সালের সে সব কথা তো ভোলার না…
তার আগে পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে আমি ও আমার অনেক বন্ধুই ছিল ব্রাজিলের সাপোর্টার। এখনও ব্রাজিলের প্রতি একটা বিরাট টান রয়েছে। কিন্তু সেই ১৯৮৬ তে মারাদোনার সেই গোল করা এবং বিশ্বকাপ জেতা আমাদের বাধ্য করল মারাদোনার ফ্যান হতে। মানে, একটা আবেগ, একটা এনিগমা আসলে…মারাদোনার কারণে আমরা সহজেই আর্জেন্টিনারও ফ্যান হলাম! এখন যেমন মেসিকে দেখছি…

তো, প্রসঙ্গে ফেরা যাক, ২০০৮ এ কলকাতায় এসেছিলেন মারাদোনা। আমি তখন যে চ্যানেলের সাথে যুক্ত, সেই চ্যানেল তখন তাঁর সফরের প্রাইম টেলিভিশান চ্যানেল পার্টনার হিসেবে ছিল…ইন্টারনভিউ নেওয়ার সময়ে
আমার সাথে আমার স্পোর্টস এডিটর পার্থ রূদ্র ছিলেন। ক্যামেরাম্যানরাও ছিলেন। ছিলেম আমার স্ত্রীও। এই নতুন আইটিসি-টা তখনও তৈরি হয়নি। পুরোনো আইটিসি-র নীচে একটা সুইট রুমে আমরা ইন্টারভিউটা নিয়েছিলাম। এবং ইন্টারভিউটা নেবার আগে পরে একটা বিস্তৃত সময় ধরে মারাদোনার সাথে সময় কাটিয়েছি, দেখেছি, কথা বলেছি, গল্প করেছি, ছবি তুলেছি। সেই ছবিগুলো কোনওটাই এখন আর নেই আমার কাছে কিন্তু করেছিলাম জিনিসগুলো।
আমাদের একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তখন তো মারাদোনা খেলা ছেড়ে দিয়েছেন এবং যতদূর মনে পড়ছে তখন কিন্তু আর্জেন্টিনা দলের উনি কোচ। ইন্টারভিউটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল, কারণ ফুটবল খেলা নিয়ে প্রচুর প্রশ্নর সাথেই ব্যক্তি মারাদোনাকে খুঁজছিলাম আমি। তাই নানা ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন ওঁকে করেছিলাম।
ট্রামলাইন: মারাদোনা যেদিন আসেন, সেদিন কলকাতায় জনপ্লাবন হয়েছিল?
তথাগত: আমরা ভোর রাত্তিরে ওঁকে রিসিভ করতে গিয়েছিলাম। দমদম এয়ারপোর্টে উনি যখন নামেন, সেখানে ছিলেন মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী ও উদ্যোক্তারা। বাইরে লাখ লাখ লোক দাঁড়ানো। রাত্রি তিনটের তখন। এয়ারপোর্টের বাইরে থেকে আইটিসি হোটেল পর্যন্ত গোটা ভিআইপি রোড জুড়ে কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়েছিল। তার পরের দিন যখন স্টেডিয়ামে আসলেন মারাদোনা বা পরের পরের দিন ইন্টারভিউয়ের সময়ও, তখন কিন্তু এই মেসি আসার মতো কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা হয়নি। খুব সুন্দর ভাবে সবকিছু আয়োজিত হয়। কলকাতা হল ফুটবলকে সমাদর করার শহর। উদ্যোক্তারা যেভাবে আয়োজন করেছিল আর আমরাও যেভাবে জিনিসটাকে পরিচালনা করেছিলাম, ইট ওয়াজ এ হিউজ সাকসেস।

ট্রামলাইন: ব্যক্তি মারাদোনার সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
তথাগত: ২০০৮-এর অভিশপ্ত নভেম্বর মাস। মুম্বইয়ে টেররিস্ট অ্যাটাক। তাজ হোটেল-এর উপর আক্রমণ। তার পরে পরেই মারাদোনা আসেন। তো, সেই সব নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন ছিল। এবং তার দুর্দান্ত সব উত্তরও দিয়েছিলেন। গোটা ইন্টারভিউটা তো আর এখন বোধহয় পাওয়া যায় না। একটা পাঁচ মিনিটের ক্লিপ বোধহয় এখন রয়ে গেছে।
একটা জিনিস দেখেছিলাম, তিনি আদতে একদম খোলামেলা একটা মানুষ। মানে বিভিন্ন প্রশ্নে হেসে গড়িয়ে যাচ্ছেন, উঠছেন, আবার তার উত্তর দিচ্ছেন, জড়িয়ে ধরছেন তাঁর বন্ধুকে…কখনও আবার আমাদের জড়িয়ে ধরছেন, ছবি তোলার সময়। পরে, আমরা ওই খেলাটা টেলিভিশনে দেখালাম। একটা phénomonal খেলা হয়েছিল, উনি মাঠেও ছিলেন। মারাদোনাকে বলটা ছুঁড়ে দেওয়া হল আমরা দেখলাম। সাইড লাইনে বসে তিনি খেলা দেখছিলেন। কিন্তু বলটা পায়ে পেতেই যেন ওঁর সেই ৮৬-র মনোভাবটা বেরিয়ে এলো। মানে ভয়ঙ্কর ভাবে ফুটবলকে ভালোবাসতেন তো…যেমন, মেসি হ্যাট্রিক করার পরে শুনলাম নাকি প্রেসকে বলেছে যে ভেতরের সেই শিশু মেসিটা রয়ে গিয়েছে, যে ফুটবলকে ভীষণ ভালোবাসে। তেমনই সেদিনকেও মারাদোনার ওই ব্যপারটা দেখেছিলাম। একটা অদ্ভুত শিশু যে ফুটবলটাকে মারাত্মক ভালোবাসে। এবং সেই ভালোবাসাটাই যে খেলাধুলা বা স্বভাব সবকিছুর মধ্যেই প্রতিফলিত।
ট্রামলাইন: খেলা নিয়ে কি বলছিলেন আর মারাদোনা?
তথাগত: মারাদোনাকে খেলা নিয়ে সব থেকে মজার প্রশ্নটা করা হয়েছিল, অর্থাৎ সেই বিশ্ববিখ্যাত মারাদোনার মুহূর্তটা নিয়ে। যে, অত জন ডিফেন্ডারকে কাটাতে কাটাতে যখন প্রায় ইংল্যান্ডের গোল মুখে পৌঁছে গেছে, তখন সম্ভবত ওঁর সতীর্থ ভালদানো খুব ফাঁকা জায়গায় সমানতালে পাশে দৌড়তে দৌড়তে পৌঁছে গেছিল। এবং বলটা ওকে পাস করে দিলে, সে ওপেন নেট গোল পেত। কিন্তু সেটা না করে ও রকম একটা দুর্গম অ্যাঙ্গেল থেকে উনি শটটা নিয়ে গোলটা করলেন। কেন পাস করলেন না?
এ প্রশ্নে ওঁর মারাত্মক একটা রিয়াকশন ছিল, মনে আছে। খুব হেসেছিলেন, বলেছিলেন, প্রোবাবলি গড টোল্ড মি টু ইউ নো স্কোর ফ্রম দ্যাট পয়েন্ট এন্ড বি দা লেজেন্ড হুইচ আই অ্যাম। খুব হেসেছিলেন প্রশ্নটা শুনে, মনে হল যেন কেউ এই প্রশ্নটা কোনওদিন করেনি ওঁকে!
ট্রামলাইন: ওই সময়কার অন্যান্য ফুটবলার সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন?
তথাগত: হ্যাঁ, উনি খুব ব্রাজিলের রোনাল্ডোকে ভীষণ নম্বর দিয়েছিলেন। এবং বলেছিলেন যে, হি ওয়াজ ওয়ান অফ দা গ্রেটেস্ট’ মানে ব্রজিলের রোনাল্ডো মানে নট ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। তখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কিন্তু খেলছিল তার জন্য বার বার করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। ইংরেজিতে না স্প্যানিশে বলছিল কিন্তু ইন্টারপ্রেটার ছিল।

ট্রামলাইন: দোভাষী নিয়ে ইন্টারভিউ করতে গিয়ে কোনও সমস্যা হয়েছিল?
তথাগত: আসলে দোভাষী নিয়ে একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। আমরা যে দোভাষী নিয়ে গেছিলাম, তিনি একজন বাঙালি মেয়ে যে স্প্যানিশ অনুবাদ করবে বলে বলা ছিল। কিন্তু হিস্পানিক স্প্যানিশ আর অরিজিনাল স্প্যানিশের মধ্যে ডায়ালেকটে হোক বা কথাবার্তা- ডিকশনে অনেক ফারাক। তাই দোভাষীর সাথে কথা বলার পর মারাদোনা বললেন যে, ভাষার সমস্যা হবে, তাই এভাবে কথাবার্তা চালানো সম্ভব না।
এর পরে, ওঁর এক বন্ধু যিনি ওই ট্রুপের সঙ্গে এসছিলেন, তিনি বললেন, তিনি ভালো ইংরেজি বলতে পারেন। আমাদের কথাবার্তার ভিডিওতে দেখবেন, এক ভদ্রলোক আছেন, তিনি বোধহয় টিমের ম্যানেজার। যাই হোক, খাওয়া দাওয়া, ফিদেল কাস্ত্র, কমিউনিজম, টেরোরিজম – সবকিছু নিয়েই প্রশ্নোত্তর চলেছিল আমাদের। ওঁর সাথে, দুপুর থেকে সন্ধ্যা- দু তিন ঘন্টা ধরে সে দিনটা কাটাতে পেরেছিলাম, যা আজীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে।
ট্রামলাইন: বিশ্বকাপ নিয়ে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলেছিলেন?
তথাগত: না না, বিশ্বকাপ নিয়ে আলাদা ভাবে কিছু বলেননি। অন দা কনট্রারি, ওঁর রিহ্যাবিলিটেশন নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন যে গুলো খুবই ব্যক্তিগত। আমার মনে হয়েছিল, কথাগুলো অন্য প্রেসদের হয়তো বলতে চান না। কিন্তু সেদিন আমাদের সাথে কথা বলে ওঁর ভালো লেগেছিল তাই আমাদের বলছিলেন। অর্থাৎ, যখন ড্রাগস নেন এবং ড্রাগস ছাড়ার পিছনে ফিদেল কাস্ত্রোর অবদান এবং কিউবাতে রিহ্যাব করে আবার যে ফেরত চলে এসেছিলেন সেই সমস্ত গল্পগুলো কিন্তু আমাদের কথাবার্তায় দারুণ ভাবে বলেছিলেন।
আজ এত বছর পর মারাদোনার সাথে কাটানো এসব মুহূর্ত স্বপ্ন বলে মনে হয়। মাঝে মাঝে নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না, এমন ঘটেছিল। জীবন বড়ই বিচিত্র!