সৌম্যা ঘোষ

‘প্রমোটার শোনে টাকার বদলে বর্ষার গান/রবীন্দ্রনাথ বৃথাই ভেজেন বৃথাই ভেজান!’…
এমনই ছিল সুমনের গানে বর্ষা নিয়ে আক্ষেপ। যেখানে রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের শুকনো পাতায় একলা পড়ে বর্ষার গান। তা ছাড়া, এমনিতেই কর্মব্যস্ত রোদ-প্রিয় মানুষদের জীবনে সারাদিন বর্ষা বিরক্তিকর ব্যাপার!
মধ্যবিত্ত বাঙালি কি বর্ষার দিনে মেঘমল্লার চান?
একেবারেই না। বরং, চান একটু খিচুড়ি-ডিমভাজা। সেটুকুই তাদের প্যাচপ্যাচে কপালে বিরিয়ানির থেকেও ‘স্পেশাল’। কিন্তু, ওই পর্যন্তই!
বৃষ্টি নিয়ে অবশ্য হিন্দি বা বাংলায় গান-কবিতার অভাব নেই। আদ্যিকালের ‘মেঘদূত’ই হোক, বা রোমান্টিক বলিউডের
‘রিমঝিম গিরে সাওয়ান…’ বা ‘তুম সে হি দিন হোতা হ্যায়…’
কিংবা একেবারে হালের
‘তোমার প্রিয় ঋতু বর্ষা তাই/পুরনো ভেঙ্গে যাওয়া ছাতা সারাই’—
বর্ষা মানেই কবি-শিল্পীদের মরশুম। রবীন্দ্রনাথও তো কম বিরহের গান লেখেননি এই বর্ষায়! বর্ষা মানেই তো হারানো…
এই যেমন বর্ষায় ছাতা হারায়নি এমন মানুষ বিরল।
আজকের কবি শ্রীজাতর ‘বর্ষামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গই করা, হারিয়ে যাওয়া ছাতাদের।
বর্ষার কলকাতার একটা চেনা ছবি, সারি সারি ভাঙাচোরা ভিজে যাওয়া নিষ্পাপ মধ্যবিত্ত বাড়ি। কলেজস্ট্রিট হোক বা গড়িয়াহাট, একটা বাড়ি। বাড়ির চেহারাটা খোলামেলা। সারা রাত থেকে তার কাকভেজার মতো অবস্থা! ওর কি ইচ্ছে করে না গায়ে একটু রোদ জড়াতে!
যদিও এখন তো বারোমাসই বর্ষা। ওজন লেয়ার ফুটো হয়ে যাওয়ায় ঘেঁটে গিয়েছে ঋতু বৈচিত্র্য। অবশ্য, মানুষের জীবন ও সময়ও তো ঘেঁটেই গিয়েছে।
সারাবছরই রাস্তায় জল জমে থাকে। আকাশও থাকে ময়লা-ঘোলাটে।
আর, যাঁরা প্রান্তিক, পথের ধারে ঘর বাঁধেন যাঁরা, তাঁরা ‘সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরাই’।
সুমনের ‘মেঘদূত’ গানে যেমন ছিল—
“ঘর বেঁধেছে পথের ধারে যাদের দল/তাদের কাছে মেঘ মানেই নোংরা জল/সেই জলেতে বেদম ভিজে একটা লোক/মেঘদূতের নাম রেখেছে ‘আহাম্মক’…”

ছবি ঋণঃ রণদীপ নস্কর
বিরহ প্রসঙ্গে বসন্তের চেয়ে বর্ষাকেই বরাবর প্রাধান্য দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু বসন্তের প্রেম আর বর্ষার বিরহ দুটোই আজ ঘেঁটে গিয়েছে।
রাবীন্দ্রিক বর্ষা আর জেন জ়ির বর্ষা যেন আলাদা দুটো দুনিয়া।
তবু, আজও জেন জ়ির প্রেমে রিলসে বাজে রবীন্দ্রনাথের গানই!
‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস দুয়ার চেপে ধরে–’অবনী বাড়ি আছো?’
শক্তির কবিতায় বৃষ্টির মাধুর্যই আলাদা। শক্তি দেখেন প্রকৃতিতে বরষা পীড়িত ফুল, শক্তির প্রেমিকা ‘…নেই বাহিরে— অন্তরে মেঘ করে’ এবং ‘ভারী ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!’
যদিও ঠনঠনিয়া হোক বা হেঁদো, সাউথের লেক হোক বা ধর্মতলা…
এক কোমর জলে কি আদৌ এসব রোমান্স সম্ভব!
ইস্কুল ‘রেনি ডে’র দিন গিয়েছে। বদলে আজ, সারাবছরই ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ছুটি।
আজকের কবি লেখেন ‘ডিপ্রেশনের বাংলা জানি মন খারাপ’
বৃষ্টি হলেই আবগারী আবহাওয়ায় ফেসবুকে আমরা স্টেটাস দিই, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়…’
সারাদিন বৃষ্টির ঝিরঝির-ঝিরে খিচুড়ির গন্ধ-লোডশেডিং…
আমাদের ফিরিয়ে দেয় ‘মেঘদূতে’র কাল। চিলেকোঠার কোনও এক কোণে সদ্য কলেজে আসা তরুণীটিকে চিঠি লেখে কোনও এক কিশোর অপু। সে লেখে,
‘আমার পাড়ার বর্ষাকালে জল দাঁড়ায়, মুঠোরুমাল তৈরি হয়ে কলেজ যায়…’

উত্তর কলকাতা নিয়ে মতি নন্দীর উপন্যাসই হোক বা ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা, ফিরে ফিরে এসেছে বর্ষা।
মতি নন্দী মনে করতেন, উত্তর কলকাতার অলি-গলি-পাকস্থলীর মধ্যেই আছে এমন বিস্ময় আছে, যা দুনিয়ায় বিরল।
শোনা যায়, মতি নন্দীর চিলেকোঠার ঘরে কোনও বন্ধু এলেই অলিগলির মাহাত্ম্য বোঝাতেন। একই ভাবে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর বরানগরের চিলেকোঠা থেকে সত্তর দশকের আগুনের দিনকালের জ্বলন্ত বরানগর এবং নিঃসঙ্গ একা এক কবির শহুরে মনোলগ ধরা আছে। আর এই সবটাকেই ঘিরে রেখেছে আবহমান বর্ষা।
গবেষক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার শোভন তরফদার সম্প্রতি মতি নন্দীকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন। উত্তর কলকাতার বর্ষা মতি নন্দীর লেখায় কীভাবে এসেছে , তা নিয়ে জানালেন তিনি। অর্থাৎ,
‘উত্তর কলকাতার গলি-বাড়ি-পগাড়-ছাদ-বারান্দা-আলসে-কলঘর ইত্যাদি জড়ো করে যে জ্যান্ত মানচিত্র, সেটাই মতি নন্দীর বিচরণভূমি। বর্ষায় সেই পরিসরের কী চেহারা, তা-ও দেখেছেন তিনি। নিশুতি রাতে টিমটিমে স্ট্রিট-লাইট যে জিভ বাড়িয়ে বৃষ্টিকণা চেটে নেয়, জমে-থাকা জলে রাস্তার চেহারা ‘বিশ্বাসঘাতকের মতো মসৃণ’, সে সব কথা জানার জন্য মতি নন্দী ছাড়া কোনও গতি নেই।’
তবে, বর্ষা মানেই তো উত্তর কলকাতা নয়। কিন্তু, ‘উত্তর কলকাতা’ যদি কারোর ‘সব পেয়েছির দেশ’ হয়!
আসলে, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই তো একটা ‘উত্তর কলকাতা’ আছে। ‘উত্তর কলকাতার কোনো বিশেষ স্থান নয়, একটা অন্তর্লীন জীবন’।
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’য় বৃষ্টি এসেছে চুপিসারে। সমাজ বাস্তবতায় আর নিভৃত প্রকৃতির জৌলুসে কবিতাগুলো একাকার।
‘বাদরিয়া ঘেরি আয়ি চারহু ঔর কারি/দোদুল ঘরের মাঝে সঘন মশারি/দোদুল গঙ্গামধ্যে ইলিশের নাও/খিচুড়ি চাপাও বঁধু খিচুড়ি চাপাও’
আহা! বর্ষা বোঝাতে আর কী’ই বা দরকার!
কিংবা, ‘বাজাও বাজাও ভেঁপু ভাজো হে পাঁপড়/ভাজো হে বেগুনী কিছু ছাড়ো অতঃপর/তন্বী পটলী ছাড়ো ফুটন্ত কড়ায়/আষাঢ় আন্ধারে ঘেরা দুপুর গড়ায়’
এসব লেখা কি আর তখন ওইটুকু মানচিত্রেই আটকে থাকতে পারে! কি দুরন্ত স্পৃহার বশেই না কবি এই বঙ্গকাব্য লেখার মনস্থির করেছিলেন। বলেছিলেন, এই কাব্য মানবজনমের ভক্তি দিয়ে লিখতে হয়। ভাষা দিয়ে নয়।
বর্ষার এই আবহে কখনও ভাস্কর চক্রবর্তীকে এড়ানো সম্ভব! ওঁর কবিতাতেও তো আছে ওঁর নিজস্ব একটা উত্তর কলকাতা। এই বর্ষা ঋতুর সঙ্গে ভাস্করের সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল?
ট্রামলাইন কথা বলল ভাস্কর চক্রবর্তীর স্ত্রী অধ্যাপিকা বাসবী চক্রবর্তীর সঙ্গে।

বাসবী চক্রবর্তী জানালেন, ‘বর্ষাকাল যে ভাস্করের খুব একটা প্রিয় ঋতু ছিল, এমন নয়। কিন্তু খুব গরমের পর বর্ষার আসাটাকে উপভোগ করতো। বর্ষার জন্য অধীর আগ্রহে ও অপেক্ষা করে থাকত।
তবে, বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় বেরোতে খুব একটা পছন্দ করত না।
ঘরের মধ্যে বসে বসে জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখা, ভাবা, বই পড়া, গান করা… আর খুব গান শুনত বৃষ্টির সময়। ছুটির দিন হলেই রাজেশ্বরী দত্ত, নীলিমা সেন— এসব রবীন্দ্রসঙ্গীত খুব শুনতো।
২২ শ্রাবণ ওর কাছে একটা উল্লেখযোগ্য দিন ছিল।
রবীন্দ্রনাথের লেখা ও ভীষণ পছন্দ করত। বিশেষত গান…
তা ছাড়াও, ও ভীষণ কবিতামগ্ন ছিল। বৃষ্টির দিনে বিকেলবেলা চলত তরুণ কবিদের সঙ্গে আড্ডা, তেলেভাজা খাওয়া…
বই-কবিতা-গান নিয়ে ওর একটা নিজস্ব জগৎ ছিল। বেশিরভাগ সময়ই একা থাকতো। একাকিত্বকে ও ভীষণ উপভোগ করতো।
আমার মনে পড়ে, এরকমই দহনের একদিন। সালটা মনে নেই, তখনও আমাদের মেয়ে জন্মায়নি।
এরকমই এক বিকেলবেলা… অনেক অপেক্ষার পর আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। ওঁর পড়াশোনার ঘরটাও ছাদের ওপরেই ছিল। বেশ মনে আছে, তখন আমার সঙ্গে ও বৃষ্টিতে ভিজে ছিল। আর আমার খুব ভাল্লাগতো ওরকম গরমের পর বৃষ্টিতে ভিজতে।
‘স্বপ্ন নেই যেন বা রাজার ছেলে মরে গেছে কোনওখানে,আর শুধু বৃষ্টি পড়ছে—’
বৃষ্টি তো বিষণ্ণতার আবহও নিয়ে আসে…
বৃষ্টির এরকম অনেক প্রসঙ্গই এসেছে ওর কবিতায়।
ও চলেও গিয়েছিল শ্রাবণে। সেদিনও ছিল আকাশের মুখভার। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল সারাদিন। বিষন্ন আবহাওয়া…’