সম্প্রতি যোগেশ মাইমে হয়ে গেল প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের ‘নধরের ভেলা’ বিশেষ স্ক্রিনিং।
এই ছবিটির প্রচারে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে গোটা টিম। কখনও অভিনেতারা এ ছবির টিকিট বিক্রিও যেমন করেছেন, তেমনই সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন ছবিটিকে। এ দিনও উপস্থিত ছিলেন ছবির কলাকুশলীরা। ছবি শুরুর আগে ও পরে তাঁদের দেখা গেল দর্শকদের সঙ্গে কথা বলতে।
‘নধর’ অর্থের মানে, সুন্দর। কিন্তু, এ ছবিতে একেবারেই নধর নামের চরিত্রটি (অমিত সাহা অভিনীত) ‘সুন্দর’ নয়। বরং কিছুটা ‘কদাকার’।
প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে সে সামিল হতে পারে না। তার ধীর লয়ের জীবন নিয়ে খুবই শ্লথ সে। তাই বারেবারেই সময়ের গতি তাকে হারিয়ে দেয়। অসহায় নধরের পাশে একমাত্র দাঁড়ান তাঁর মা (অভিনয়ে কস্তূরী চট্টোপাধ্যায়)। বাঁচার তাগিদে তাঁর এ হেন ছেলেকে ভগবান সাজান তিনি। ভক্তও কিছু জুটে যায়। চলতে থাকে তাদের সংসার। মায়ের আকস্মিক মৃত্যুতে গ্রামবাসীর কাছে সে গলগ্রহ হয়ে ওঠে। বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীরা তাকে বেচে দেয় সার্কাসের দলে। আর এখান থেকেই শুরু হয় সিনেমার নতুন বাঁক। এবং নধরের পরিণতি হয় আরও করুণ…
অভিনব প্লটের এই ছবির বিপণন কেন ব্যতিক্রমী ভাবে করা হচ্ছে? পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য জানালেন, ছবি রিলিজ় করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। নিজেরা উদ্যোগ নিলে সেই কাজ আরও সহজ হয়ে যায়। তাঁর মতে, আমরা সকলেই আজ ফোনে বন্দি। সামাজিক ভাবে মেলামেশা আজ অতীত। এই সেল-ফোন বন্দী জীবন আজ আমাদের আরও একা করে দিচ্ছে।
তাই ছবির শেষে নধরও একা হয়ে যায়। তাঁকে ঘিরে নতুন চটুল ফন্দি আঁটে সার্কাস দলের মালিক হারাধন। নধরের দিকে দর্শকদের ছোঁড়া পচা টম্যাটো, ডিম, মাছের নাড়ি-ভুঁড়িই হয়ে ওঠে রসালো এক খেলা। সঙ্গে চটুল নাচ। জমে ওঠে খেলা। ক্রমে শ্যামার সঙ্গে সম্পর্ক হয় নধরের। যে সম্পর্ক নধরকে নিয়ে যায় ক্রমে।
বেহুলাপালায় শ্যামাকে দেখেছিল নধর। মায়ের মৃত্যুর পর শ্যামাই তার জীবনের প্রথম নারী।
শ্যামা তাকে প্রেমের আলিঙ্গন দিতে চেয়েছিল। মাতৃহারা নধর চেয়েছিল মায়ের মতোই কারোর স্পর্শ। যে তাকে মুক্তি দেবে সমস্ত যন্ত্রণা থেকে। শ্যামার ‘বেহুলাপালা’ নধরকে মুক্তির পিপাসু করেছিল। সে জানে, লখীন্দর ঠিকই ভেসে যাবে স্বর্গের পথে। বেহুলা সেই ভেলা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। নধর শুধু চেনে বেহুলাপালার ভেলাটিকে। শ্যামার মধ্যে মাতৃত্বকে সে দেখেছে, অনুভব করেছে। তাই সে জানে শ্যামা তাকে পথ দেখাবে।
নধরকে সার্কাস মালিক হারাধন অপমান করলে, তার প্রতিবাদও করে শ্যামা। এই প্রতিবাদের অবশ্য দামও দিতে হয় তাকে। তার ওপর চড়াও হয় হারাধন। তাতে রেগে গিয়ে প্রতিবাদ জানায় নধর। এরপর আরও একা হতে থাকে সে…
পরিত্রাণ হিসেবে বেছে নেয় সেই বেহুলার ভেলাকেই। এবং তা নিয়েই নিরুদ্দেশের যাত্রায় বেড়িয়ে পড়ে সে…
জনসমাজের হই-হট্টগোল থেকে বেড়িয়ে এসে, সে ভেসে যায় শ্যামার সাজানো ভেলাটিতে। ছবির শেষ দৃশ্যে যেন তৈরি হয় ‘বিচ্ছিন্নতা’ এবং ‘মুক্তির’ যৌথ-ফ্রেম।
নধরের এই ব্যতিক্রমী জীবনটাই যেন তার স্বতন্ত্র ভেলা। ব্যতিক্রমী বলেই সে সুন্দর, সে ‘নধর’।
সেই ভেলাই তার অস্তিত্ব। যা নিয়ে ভেসে চলেছে সে স্বতন্ত্র পথের অভিযাত্রী হয়ে।
এই ছবি আসলে মানুষের স্বাভাবিক গতির কথা বলে, নধর যাকে ধরে একটা সুস্থ জীবন চেয়েছিল। কিন্তু ফ্যাতাড়ু বা বাঘাড়ুদের মতোই তাঁর মতো প্রান্তিক মানুষদেরকে আমাদের এই চূড়ান্ত অসুস্থ গতির সময়ে আমরা ঠাঁই দিতে পারিনি আমাদের মধ্যে। কাজেই তাঁকে চলে যেতেই হতো, হলোও…
আমরা যারা এই দুরন্ত ঘূর্ণির দুনিয়াতে আর পাঁচ-জনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি না, আমরাও যারা প্রশ্ন করি আমাদের ‘জন্ম’ নিয়ে, নিজেদের মতো জগৎ গড়ে তুলি—
আমরাও সবাই একদিন না একদিন ভেলায় ভেসে যাবো…
‘নধরের ভেলা’য়।