সময় বদলের সঙ্গে বদলেছে গান শোনার, সিনেমা দেখার, বই পড়ার ধরণ। বেঠোফেন, মোজার্ট, বা তানসেন থেকে পরবর্তী সময়ের ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত বলেতেই আমরা যা বুঝতাম তার সময়সীমা কয়েক ঘণ্টার। আর আজকে, ইউটিউব বা স্পটিফাইয়ের যুগে সঙ্গীতের গড় দৈর্ঘ্য বড়জোর কয়েক মিনিট। বলা হচ্ছে, আমাদের মনসংযোগ কমতে আজ কয়েক সেকেন্ডে এসে ঠেকেছে।
একটা সময় ছিল যখন, আলমারি খুলে সাবধানে বেরোত কালো ভিনাইল। তার উপর ধুলো জমত খানিক। তারপর রেকর্ড প্লেয়ারের সূচ নামত। সেই খসখসে শব্দ পেরিয়ে ভেসে আসত মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, বা ভূপেন হাজারিকার গলা…

সেই গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে এল স্পুল টেপ, তারপর ক্যাসেট। সেটা ছিল সত্তর আশির দশক। ক্যাসেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শোনার রেওয়াজ ছিল তখন। পুজোর গান হোক বা স্বর্ণযুগের গানের হেমন্ত-মান্না-আশা-লতা-কিশোর,
ক্যাসেট বদলে দিল মধ্যবিত্তের সঙ্গীত-অভ্যাস। রেকর্ড প্লেয়ার ছিল খানিক অভিজাত জিনিস, কিন্তু ক্যাসেট প্লেয়ার ঢুকে পড়ল প্রায় সব বাড়িতে। তারপর এলো নব্বইয়ের দশক। কলকাতার অগণিত বাড়িতে দুপুরবেলা বাজত অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা, কবীর সুমন, লোপামুদ্রা মিত্র। টেপ রেকর্ডারের পাশে পড়ে থাকত দুটো পেন্সিল, ফিতা জড়িয়ে গেলে ঘুরিয়ে ঠিক করার জন্য। সেই সময় গান শোনা মানে ছিল অপেক্ষা। রেডিওতে প্রিয় গানটা কবে বাজবে, তা নিয়ে ধৈর্য ধরতে হত।
বিশ্বায়নে পরবর্তী দু-হাজার সাল। এল চকচকে সিডির চাকতি। গড়িয়াহাট শ্যামবাজার জুড়ে বিক্রি হতে থাকল নকল জাল সিডির রমরমে ব্যবসা। শুধু মিউজিকের সম্রান্ত দোকান মেলোডি-হবনার-সিম্ফনির পাশে জ্বলজ্বল করতে শুরু করল এইসব অজস্র ফুটপাতের দোকান। তার মধ্যে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘ভাইব্রেশন্স’ আজও বিরাজমান, যেখানে শহরের সংগীতপ্রেমীরা আজও ভিড় জমায়।

আর এই দোকানগুলোর মধ্যে এক কিংবদন্তি নাম ছিল পার্ক স্ট্রিটের ‘মিউজিক ওয়ার্ল্ড’। দলে দলে কলেজ পড়ুয়া থেকে প্রবীণ-সকলেই গানকে ভালোবেসে ভিড় জমাতো এখানে। হেডফোনে গান শুনে ক্যাসেট বা সিডি কেনা যেত। কলকাতার বহুমাত্রিক সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের পাশে থাকত মেটালিকা, আরডি বর্মনের পাশে পিঙ্ক ফ্লয়েড। পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, গড়িয়াহাট চত্বরে প্রায়ই চোখে পড়ত নতুন অ্যালবামের পোস্টার। নবনই দশক থেকে তাতে জুড়ল কেকে, শান, লাকি আলি, ফসিলস, ক্যাকটাস, ভূমি – সবাই তখন অ্যালবাম সংস্কৃতির তারকা। সাথে মিউজিক ভিডিওর সংখ্যাও টিভিতে বাড়তে থাকল।


তারপর এলো কম্পিউটার। আর তার সাথেই এলো এমপিথ্রি। গানের সংখ্যা বাড়তে থাকল। সাবেক গানের ধারণা বদলালো। হাতে আর কভার নেই, বুকলেট নেই, লিরিক শিট নেই। শুধু ফাইল। যেন বা আজকের ভাইরাল সংস্কৃতির শুরু তখন থেকেই।
এর বেশ কিছু পরে এলো আইপড। আর তার দৌলতে গান তখন আর বসে শোনার জিনিস থাকল না। বরং বাসে যেতে যেতে, জিম করতে করতে, অফিসে কাজ করতে করতে- গান শুনতে থাকল শ্রোতারা।
আর এখন? মুঠোফোনের ভিতর স্পটিফাই বা ইউটিউব মিউজিক। গান যেন বাতাসের মতো। আছে, কিন্তু ধরা যায় না। মানুষ আর অ্যালবাম শোনে না, শোনে প্লে-লিস্ট। সমাজমাধ্যমে অ্যালগরিদম-নির্ধারিত বিভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে সঙ্গীত। শিল্পীর নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রিলের পনেরো সেকেন্ড।
তবে গানের দোকানের অবস্থা ভালো না। উঠে গেছে পার্ক স্ট্রিটের মিউজিক ওয়ার্ল্ড। ধুঁকছে মেলোডির মত প্রাচীন দোকানও। রেকর্ড স্টোর এখন প্রায় জাদুঘরের বস্তু। কিছু সংগ্রাহক এখনও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট বা কলেজ স্ট্রিটে পুরোনো ভিনাইল খুঁজে বেড়ান, যদিও সেটা অতীতবিলাসী গুটি কয়েকজন।
তবে অতীত হয়তো কখনই পুরোপুরি মুছে যায় না। আশ্চর্যভাবে ভিনাইল আবার ফিরছে। শহরের কিছু তরুণ আবার রেকর্ড প্লেয়ার কিনছেন, পুরনো এলপি সংগ্রহ করছেন। সম্প্রতি চন্দ্রবিন্দু তাদের নতুন অ্যালবাম ‘টালোবাসা’ ভিনাইলে প্রকাশ করেছে।
এ প্রসঙ্গে চন্দ্রবিন্দুর সদস্য উপল সেনগুপ্ত ট্রামলাইনকে জানালেন, ভিনাইল বা রেকর্ড স্পটিফাই লিংকের মত সহজলভ্য নয়। গ্রামোফোন বা রেকর্ড প্লেয়ারে গান শোনা রীতিমত একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার। আর সেই পরিশ্রমটা যখন কেউ করে, তখন বুঝতে হবে সে সত্যিই গান শুনতে ভালবাসে। তা ছাড়াও আছে আড্ডার আসরে বন্ধুরা একসঙ্গে বসে গান শোনা, আলোচনা করা, গান ভালো লাগল কি না তা নিয়ে তর্ক করা। কানে হেডফোনে গুঁজে গান শোনার অভ্যাসে যেটা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, ভিনাইল সেই অভ্যাসটাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। চন্দ্রবিন্দু নিজেদের গানে এবং অন্যান্য চর্চায় বরাবরই বন্ধুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। তাই বাঙালির আড্ডার সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসেই তাঁদের ষষ্ঠ আলবাম ভিনাইলে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত বলে জানালেন উপল।

কবি এবং তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক অভীক মজুমদার জানালেন, অতীতে শিল্প বা সঙ্গীত মূলত অভিজাত সমাজের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। জমিদারবাড়ি বা উচ্চবর্গের আসরে গান শোনা যেত, সাধারণ মানুষের সেই জগতে প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু রেকর্ড, ক্যাসেট, সিডি এবং পরে ডিজিটাল মাধ্যম আসার ফলে শিল্প অনেক বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের ফলে গানের জগতে একদিকে যেমন স্বাধীনতা এসেছে, তেমনই বদলেছে শ্রোতার অভ্যাসও। আগে রেডিওর সীমিত পরিসরে মানুষ গান শুনত, এখন প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পছন্দের আলাদা জায়গা তৈরি হয়েছে। কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনেন, কেউ লোকগান, কেউ পাশ্চাত্য সঙ্গীত, আবার নতুন প্রজন্ম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের গান শুনছে। মাধ্যম বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে গান শোনার অভিজ্ঞতাও। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন সঙ্গীতের কাঠামোকেও প্রভাবিত করেছে। একসময় মার্গসঙ্গীতের আলাপ বা খেয়াল দীর্ঘ সময় ধরে চলত। কিন্তু রেকর্ডের সময়সীমা এসে সেই বিস্তারকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ৪৫ আরপিএম রেকর্ডে ১৫ মিনিটের মধ্যে গান শেষ করতে হত। ফলে বড় আকারের সঙ্গীতকেও ছোট পরিসরে আনতে বাধ্য হতে হয়। ধ্রুপদী সঙ্গীতের বিখ্যাত শিল্পীরাও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাঁধা পড়েন।
এর প্রভাব পড়ে আধুনিক গানের উপরেও। তিন-চার মিনিটের গানের ফরম্যাট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং শ্রোতার ধৈর্যও বদলাতে শুরু করে। দীর্ঘ সঙ্গীত বা বড় সাহিত্যকর্মের বদলে ছোট আকারের কনটেন্টের দিকে ঝোঁক বাড়ে। এই প্রসঙ্গে অভীকবাবু বললেন, রেকর্ডের যুগের আগেই লেখা হলেও রবীন্দ্রনাথের গান আশ্চর্যভাবে মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশনের ফরম্যাটের সঙ্গে মানিয়ে যায়। তিন-চার মিনিটের মধ্যেই গান সম্পূর্ণ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে কাজী নজরুল ইসলাম, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, এমনকি সত্যজিৎ রায়ের গানেও সেই সংক্ষিপ্ত কাঠামো দেখা যায়। পরে গণনাট্যের গান, সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পরবর্তী কালে কবীর সুমন, নচিকেতা, চন্দ্রবিন্দু বা হাল আমলের জলের গানের মতো শিল্পীরাও ছোট গানের মধ্যেই কাজ করেছেন।
তবে অভীকবাবু মনে করেন, প্রযুক্তি বা বাজারকে একমাত্র নেতিবাচকভাবে দেখার কোনও কারণ নেই। মানুষের কাছে পৌঁছতে গেলে বাজারের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করতেই হয়। কিন্তু বাজারের হিসেব সবসময় মেলে না। যেমন সুম নের ‘তোমাকে চাই’ অপ্রত্যাশিতভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। তুলনামূলক ভাবে গৌতম চট্টোপাধ্যায় ও মহিনের ঘোড়াগুলি বাংলা সঙ্গীত জগতে বিপ্লব ঘটিয়েও নিজেদের সময়ে সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। ফলে কোন গান জনপ্রিয় হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সূত্র নেই। শহুরে গান, রাজনৈতিক গান, কি প্রেমের গান, কোনও কিছুরই সাফল্যের নির্দিষ্ট প্রতিচিত্র তৈরি করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি গানের জগতেও ঢুকে পড়েছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখল। এআই এখন সুর বানাচ্ছে, গলা নকল করছে, মিক্সিং করছে। স্টুডিওতে যে মিউজিশিয়ানরা একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজাতেন তাদের কাজ কমছে। একসময় কলকাতার স্টুডিওপাড়ায় রাত জেগে কাজ করতেন অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রী। টালিগঞ্জের সেই স্টুডিও সংস্কৃতি, যেখানে লাইভ রেকর্ডিংয়ের উত্তেজনা ছিল, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। গান থেকে মানুষ সরে যাচ্ছে না, কিন্তু মানুষের জায়গায় মেশিন ঢুকে পড়ছে।
উপলবাবু মনে করেন, প্রযুক্তির বদল মানেই আতঙ্ক নয়। যন্ত্র মানুষের কাজ দ্রুত করতে পারে, আরও নিখুঁতভাবে করতে পারে, কিন্তু মানুষের নতুন আইডিয়া তৈরি করার ক্ষমতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন। কারণ যন্ত্রও তো শেষ পর্যন্ত মানুষের তৈরি সৃজনশীলতার উপর নির্ভর করেই এগোয়।
পরিবর্তনকে আটকানো যায় না। প্রযুক্তি নদীর জলের মতো, বয়ে যাবেই। নতুন মাধ্যম আসবে, পুরনো বদলাবে। উপলবাবু নিশ্চিত যে সেই বদলের মধ্যেই শিল্পীরা আবার নতুনভাবে নিজেদের জায়গা খুঁজে নেবেন।
হয়তো সেই দোকানে দাঁড়িয়ে নতুন অ্যালবামের গন্ধ নেওয়া, ক্যাসেটের ফিতা পেন্সিল দিয়ে ঘোরানো, বা বন্ধুর বাড়িতে বসে একসঙ্গে ভিনাইল শোনার অভিজ্ঞতাগুলো আর ফিরবে না। অ্যালবামের জায়গা নেবে অ্যালগরিদম, স্টুডিওর জায়গা নেবে সফটওয়্যার। তবু সঙ্গীতের ইতিহাস বলছে, পরিবর্তনই তার একমাত্র ধ্রুবক। গ্রামোফোন থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে স্ট্রিমিং – প্রতিটি যুগেই মানুষ ভেবেছে পুরনো জিনিস হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ গান থেকে গেছে। আজও কেউ পুরনো ভিনাইলের খসখসে শব্দে শান্তি খুঁজে পান, আবার কেউ রাত জেগে স্পটিফাই প্লেলিস্ট বানান। চন্দ্রবিন্দু যখন নতুন অ্যালবাম ভিনাইলে প্রকাশ করে, তখন বোঝা যায় পুরনো আর নতুন আসলে পরস্পরের শত্রু নয়, তারা একই নদীর দুই স্রোত। প্রযুক্তি বদলাবে, বাজার বদলাবে, গান শোনার অভ্যাসও বদলাবে। কিন্তু মানুষ যতদিন স্মৃতি, প্রেম, একাকীত্ব আর প্রতিবাদের ভাষা খুঁজবে, ততদিন যেই প্রকারেই হোক, গান বেঁচে থাকবে।

বিশেষ সহায়তায়: সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়