‘But I will know my song well before I start singing…’
— Bob Dylan
১৯৯২ সালের এক ব্যতিক্রমী এপ্রিলে কবীর সুমন (তদানীন্তন সুমন চট্টোপাধ্যায়) যখন ওঁর প্রথম অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশ করছেন, ঠিক সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সুমন জানতেন তিনি ঠিক কী করতে চলেছেন। কারণ, সলতে পাকানোর কাজটা সুমন তার আগের তিনটি দশক ধরে নিয়ম করে, নিবিষ্ট মনে করে আসছিলেন। সে এক দীর্ঘ, নিবিড় অনুশীলন ও প্রস্তুতিপর্ব। ফলে ও-ই : He knew his song well before he was singing them.।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি, রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহে ঘটে গেল এক আশ্চর্য ঘটনা! ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে কবীর সুমনকে তিনবার মঞ্চে আসতে হল। প্রথমবার বিক্ষুব্ধ দর্শককুলকে শান্ত করতে, এবং সেটাও করতে হল গান শুনিয়েই। মন চলে যাচ্ছে খুব অল্প বয়সে শোনা এক জলসার স্মৃতিতে। গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ আর পণ্ডিত ভি জি যোগের যুগলবন্দি। অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। তখনকার কলকাতার বিখ্যাত ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়েছেন যোগসাহেব! দর্শক-শ্রোতারা উসখুস করছেন, কেউ-বা বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলছেন। এমন সময়ে হাল ধরলেন জ্ঞানবাবু। প্রায় ঘণ্টাখানেক একা হারমোনিয়াম বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন শ্রোতাদের।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে (যা আদতে প্রথম পর্বই হওয়ার কথা) সুমন এলেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য-র সঙ্গে, প্রশ্ন-উত্তর নিয়ে। আধুনিক বাংলা গানে তার আবির্ভাব যে শ্রোতাকুলকে আবিষ্ট করে দিয়েছিল সে-বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন জানান সেটা একটা অ্যাটিচ্যুড বা মনোভাবের দরুন। একজন লোক একটা গিটার বা কি-বোর্ড নিয়ে একাই বাজিয়ে গেয়ে দিচ্ছে দু-ঘণ্টা, আড়াই ঘণ্টা— যে-গানগুলো আবার তার নিজেরই লেখা, সুর করা— এটা মানুষকে চমকে দিয়েছিল! এমনটা আগে হয়নি। প্রচলিত ধারণায় এটা একটা ধাক্কাও বটে!
গানের কথা প্রসঙ্গে চন্দ্রিলের প্রশ্নের উত্তরে সুমনের সাফ জবাব— কথা তো জরুরি, কিন্তু সুর নিয়ে আলোচনা কোথায়? কথার ওপর সুর বোলালে তবেই না গান হচ্ছে! তা নাহলে তো ছড়া হয়ে যেত! এ-প্রসঙ্গে সুমন আরো বলছিলেন : রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ আলোচকই কথা বা বাণী নিয়ে বেশি ব্যস্ত থেকেছেন এবং সেটা করতে গিয়ে সুরের ভূমিকাকে প্রায় অস্বীকারই করে ফেলেছেন! এটা আমাদের একটা সমস্যা।
প্রতিবাদের গান নিয়ে সুমনের বক্তব্য, এক্ষেত্রে তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্য-পন্থী। আজকের প্রতিবাদ আজই রেখে যেতে চান তিনি। কালকের জন্য রেখে দিতে চাননি কখনোই। এভাবেই তৈরি হয়েছিল অনীতা দেওয়ান, চুনী কোটাল, আমার শহরে এসেছে মেয়েটা, সঞ্জীব পুরোহিত, পাপড়ি দে-র মতো গান। আগামিকাল সেটা তামাদি হয়ে যাবে কিনা তা নিয়ে সুমন আদৌ ভাবিত নন।
বাংলা গানে তো বটেই, গোটা উপমহাদেশের একজন বিরল পলিটিকাল মিউজিশিয়ান সুমন। প্রশ্ন হতে পারত, রাজনৈতিক প্রতিবাদী গানের ক্ষেত্রে সুর-কাঠামোটা কীরকম হবে। আরো জানতে ইচ্ছে করে, সুর দিয়ে কীভাবে প্রতিবাদকে ফুটিয়ে তোলা যাবে।
আধুনিক বাংলা গানের কাঠামো-বিন্যাসে সুমন যেমন কখনো ট্র্যাডিশন মেনে সুর করছেন, আবার ভীষণরকম ট্র্যাডিশন ভেঙেওছেন। সেসব নিয়েও আরো প্রশ্ন হলে উপকৃত হতাম। তবে সুমনই বাংলা গানের শেষ কারিগর যার গানে সঞ্চারীর ব্যবহার প্রচল।
আগেও বলেছেন, চন্দ্রিলের প্রশ্নের জবাবে আবারও জানালেন কানোরিয়া জুট মিলের দরজা ভাঙার মুহূর্তটির কথা। তিন হাজার শ্রমিক কনকনে শীতের ভোরে হাজির। দরজা ভেঙে তাঁরা মিলের চুল্লীতে আগুন জ্বালাবেন। সে প্রায় এক দৈবদৃশ্যের বর্ণনা শোনা গেল সুমনের মুখে!
নিকারাগুয়ার এক কিশোরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সুমন, “হ্যাঁ রে, তু্ই বিপ্লবের মানে জানিস?” ছেলেটি জানায়, “আমিই বিপ্লব!”
এসবই আমরা শুনি কবীর সুমনের কাছ থেকে ওই সন্ধেয়। একটা জরুরি প্রশ্ন সেদিন প্রশ্নকর্তা তুলতেই পারতেন, তা হল : কোন অভিমানে গত বেশকিছু বছর সুমন নতুন কোনো মৌলিক আধুনিক বাংলা গান বানাননি?
দ্বিতীয় অর্ধ গানের। শুরু করলেন ‘কোথাও কোনো নিয়ম নেই’ দিয়ে। একথা বলতেই হবে যে এই নব পর্যায়ের সুমনকে শুনতে আরো ভালো লাগছে, ৭৭ বছরের সুমনকে যেন আরো সুরেলা শোনাচ্ছে! এদিনও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাদ্যযন্ত্রের চার শিল্পী আজকাল সুমনকে ঘিরে থাকেন, তারাও খুব সুন্দর বাজাচ্ছেন। ফলে সবমিলিয়ে খুবই উপভোগ্য হচ্ছে সাম্প্রতিক অনুষ্ঠানগুলি। সেদিনের ক’টি গানের উল্লেখ অবশ্যই রাখা উচিত, যেমন : ‘থমকে আছে’, ‘সন্ধ্যা হল’, ‘ছলাৎ ছল’ এবং অবশ্যই ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা-র ‘Strangers in the night’-প্রভাবিত ‘অচেনা দুজন’। ছিল স্বভাবসিদ্ধ ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’-সহ আরো বেশকিছু গান। অনুষ্ঠানের সাউন্ডস্কেপটিও ছিল অসাধারণ। এই ৭৭-এ’ও দারুণ সুরেলা মাউথ অর্গান বাজিয়ে চলেছেন সুমন, যা এক বিস্ময়। ‘কোথাও কোনো নিয়ম নেই’-এ খুব ভালো মেলোডিকা বাজিয়েছেন শিবব্রত, আর ‘অচেনা দুজন’-এ গিটারে ভালো সঙ্গত করলেন বিভুব্রত। এদের নাম না করলে অন্যায় হবে। পারকাসনে ছিলেন কৌশিক আর বেস গিটারে ধ্রুব বসু রায়।
সবশেষে সুমন তুলে নিলেন গাণ্ডীব আর শুরু হল সমকালীন বাঙালির অ্যানথেম— ‘তোমাকে চাই’। সুমন গাইলেন এবং যথারীতি হল্-ভর্তি শ্রোতাদের দিয়ে গাওয়ালেন।
এভাবেই শেষ হল সেদিনের অনুষ্ঠান। শুরু হল অপেক্ষার, কবীর সুমনের পরের অনুষ্ঠানের জন্য।

ছবি সৌজন্য: কবির সুমন ফ্যান পেজ।