এআই, ব্লগার, মিম, স্ট্যান্ড আপ কমেডি, ইউটিউবার, রিলস শব্দগুলো বেশ কিছু বছর ধরেই বাংলা ভাষায় ঢুকে পড়েছে। ২০০৫ এ ফেসবুক। ২০১০ এ ওয়াটসাপ। এবং এরপর ইন্সটাগ্রাম। রাতারাতি বদলে দিল সমাজের সংযোগের ভাষা। মিলেনিয়াল বা নব্বই পরবর্তী প্রজন্ম জেন-জি এবং তারপরের জেন-আলফারা কোন পথে গেল তারপর, তারই খোঁজ চালাতে ট্রামলাইন মুখোমুখি হল এ প্রজন্মের। লিখছেন সৌম্যা ঘোষ ও প্রত্যূষা পান।

‘বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া
তোমার সঙ্গে ওতপ্রোত
নিয়ন আলোয় পণ্য হলো
যা কিছু আজ ব্যক্তিগত।’
শঙ্খ ঘোষের লাইনগুলো দিয়েই শুরু করা যাক।
উত্তর আধুনিক যুগে বড় হচ্ছে আজকের প্রজন্ম।
পোস্ট-ট্রুথ আরেক লব্জ, যা হালফিল প্রায়ই শোনা যায়। অর্থাৎ, কোনও তথ্যই আজ আর ‘ভ্যালিড’ না। সত্য-যুগ পরবর্তী এই সময়ে তাই সদ্য প্রয়াত প্রিয় লেখক আমাদের স্বজন রাহুলের বলা একটা কথা বারবার মনে পড়ে, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব পারে, শুধু বোকা হতে পারে না।’
মনে পড়তে পারে আপনার, ‘বোকা বাক্স’র কথা। আশির দশকে যখন মধ্যবিত্তর বাড়িতে টেলিভিশান আসা শুরু হল, তখন তার ডাকনাম ছিল, বোকা বাক্স। গৌতম চট্টোপাধ্যায় তা নিয়ে তো সেই বিখ্যাত গানও বেঁঁধে মহীনের ঘোড়াদের অমর করে দিলেন।
সেই বোকামো অবশ্যই আজ আরও বেড়ে গিয়েছে অজান্তেই। বাইরে অবশ্য চকচকানির কমতি নেই। কিন্তু ভেতর সবারই যেন কালো গহ্বর বেড়েই চলেছে…
এই বোকামোরই আরেক নাম ‘ডুমস্ক্রলিং’। এটা কি বস্তু? অর্থাৎ, অজান্তেই আপনার ফোন স্ক্রল করে যাওয়া, জাস্ট কিচ্ছু না ভেবে। কি খুঁজছেন, কি ভাবছেন, আপনিও জানেন না। তবু আনমনে ঘেঁটে চলেছেন…বিশেষজ্ঞদের দাবি, এ সবই আসলে ‘অ্যালগোরিদমে’র খেলায়। অবচেতনে যা আমরা না চাইতেও আমাদের প্রভাবিত করে চলেছে! সবই আসলে এআই রাক্ষসের হোহো হরেক হাসি…
কিন্তু এআই তো বন্ধুও হতে পারে। হচ্ছেও। কত কত ছেলেমেয়ে আজ স্রেফ গল্প করতে রাতে এ আইয়ের সাথে কথা বলছে। বলতে বলতে অজান্তে ব্লু-হোয়েল বা পাব-জি খেলায় নিজেদের মেরেও ফেলছে কত!
নিত্য ইন্সটা-ফিডে ভেসে উঠছে যৌনতা বা হিংস্রতার নতুন নতুন ভিডিও। মনস্তাত্ত্বিকরা বলছেন, এ হিংস্রতা আসছে কারণ শিশুদের আজ এক ও এক মাত্র বন্ধুর নাম স্মার্টফোন। কাউকে তারা অতটা বিশ্বাস করে না, যতটা করে এই যন্তরটিকে…
আবার এও তো সত্যি, আজ কত কত ছেলেমেয়ে এই ডিজিটালকে ব্যবহার করে রুজিরুটির ব্যবস্থা করছে। আগের প্রজন্ম কি জানত, ‘ইউটিউবার’ একটা পেশা হতে পারে? আজ সরকার কাজ না দিতে পারলেও, নিজেরাই এইভাবে নিজেদের পেশা বানিয়ে নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। গত দশ বছর আগেও যাকে এটুকুর জন্য দ্বারস্থ হতে হত বড় কাগজ বা চ্যানেলের, আজ নিজেরাই নিজেদেরটা জুটিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। দিকে দিকে গজিয়ে উঠছে পডকাস্ট বা পোর্টাল…এবং সমস্ত বিজ্ঞাপন আগামী দশ বছর যে তাদের ঝুলিতেই ভরবে, তাতেও সন্দেহ থাকছে না…
এ সময়ের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ঋদ্ধির (nomad fairy) মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে চিরতরে বদলে গেছে বিজ্ঞাপনের ভাষা। কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের সমাজের প্রতি নৈতিক দায় কতটা? ঋদ্ধির মতে, যে কোনও শিল্পীর যা রাজনৈতিক বা সামাজিক দায়িত্ব, সেই একই দায়িত্ব ভ্লগারদেরও।
কিরণ দত্ত বা The Bong Guy, প্রথম বাঙালি ইউটিউবার। সিনেমার রিভিউ, সামাজিক বিষয় নিয়ে হাসির ভিডিও বা প্যারোডির মাধ্যমে প্রায় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায় কিরণ। আর, কিছুটা সিরিয়াস মোড়কে কমেডি করেন শুভম চৌধুরী (bong_short)। সামাজিক, রাজনৈতিক যে কোনও বিষয়েই ভিডিও বানান তিনি। যেমন সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে নতুন নতুন রিলস দিয়ে নিজের ফলোয়ার ব্যাপক বাড়িয়েছেন রণিত দত্ত-রা।
নতুন প্রজন্মের নতুন নতুন শব্দবন্ধ দিয়ে ভিডিও বাঁধেন প্রীতি-প্রেরণারাও। প্রেরণা যেমন আজকের জেন জি-র প্রেম নিয়েই বানাতে থাকে তাঁর কন্টেন্ট। তাই ‘সিচুয়েশানশিপ’, ‘বেঞ্চিং’, ‘সাবমেরিনিং’ জাতীয় আজকের এইসব প্রেমের নানা নাম শোনা যায় তাঁর কন্টেন্টে।
সেলফোনকে সামনে রেখেই নিজেই দু’রকম চরিত্র সেজে অভিনয় করেন ‘লাফটারসেন’ ওরফে নীরঞ্জন। সমাজের বহুবিধ বিষয় নিয়েই তিনি সোচ্চার। কখনও স্বগতোক্তি করেও তিনি বলতে থাকেন সম্পর্কের নানা বচসা বা রাজনৈতিক নানা মন্তব্য। ডেইলি লাইফস্টাইল ব্লগে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী শ্রীনন্দা শঙ্করও। পরিমিত মেকআপের কলাকৌশল হোক বা রোজকার দিনযাপন-সবই নিজের ভ্লগে তুলে ধরেন শ্রীনন্দা। পডকাস্টের বাজারে ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত রাহুল অরুণোদয়ের
‘ সহজকথা’। নানা ব্যক্তিত্ব, যারা রাহুলের শিল্পজীবনে জড়িয়ে, সকলেই তাঁর অতিথি। প্রায় একই রকম সিরিয়াস পডকাস্ট সুব্রত সেন বা অরুণাভ খাশনবিশের। পেশাগতভাবে তাঁরা চলচ্চিত্রকার হলেও, নানা সাংবাদিকদের মতই তাঁরা পডকাস্ট করেও নিজেদের ফলোয়ার বাড়িয়ে চলেছেন রাতারাতি।
শহর কলকাতা ছাড়িয়ে মফস্বল বা গ্রাম থেকেও উঠে আসছে ব্যতিক্রমী কন্ঠস্বর। মাটির উনুনে রান্না করতে করতে পূর্ব মেদিনীপুরের বধূ পূজারিনী প্রধান (life of puja) আলোচনা করেন বই, সিনেমা ও দর্শন বিষয়ে। আরেক ভ্লগার রাজিতা (ogo bidesheniee)র কথায় সাহিত্য আর সংস্কৃতি মিশে যায় মজার আলাপে।
ফুড ব্লগারদের ফলোয়ারও রমরমিয়ে বেড়ে চলেছে। ফুডকা-র নাম এ প্রসঙ্গে সবার আগে করতে হয়। ফুডকা ছাড়াও রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাবারের খোঁজ দিতে জাকারিয়া স্ট্রিটই হোক বা শীতের পার্ক স্ট্রিট-ব্লগারদের কমতি নেই।
ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে আজ আইকনে পরিণত হয়েছেন রোদ্দুর রায় থেকে কুনাল কামরা। সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করে তাঁরা নিত্য বানিয়ে চলেছেন একের পর এক গল্প। তার জেরে রোদ্দুরকে গ্রপ্তার করাও হয়েছে যেমন উড়োজাহাজে অর্ণব গোস্বামীর সাথে কুণালের আক্রমণাত্মক অথচ পরিহাসের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে দ্রুত। ব্যতক্রমী মজার ভিডিও বানিয়ে চলেছেন স্যান্ডি সাহাও।
এ প্রসঙ্গে অভিনেতা ও বক্তা অরিত্র দত্ত বণিকের মতে, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে কন্টেন্ট তৈরির গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডিপফেক, প্রোপাগান্ডা ও তথাকথিত ‘ইনফ্লুয়েন্সার কালচার’। বিশেষ করে, ফলোয়ার সংখ্যা বা ভিউ দিয়ে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান বিচার করা হচ্ছে। তার জেরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বা সামাজিক ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীরা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কোনও তোয়াক্কা করছে না। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট বা সাধারণ কথোপকথনের তথ্য বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আমাদের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। সেন্সরশিপের বিরোধী হলেও, সমাজ ও নৈতিকতা রক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি ও ক্রিয়েটরদের মাঝখানে সরকারের একটি নির্দিষ্ট ডেটা পলিসি ও কন্টেন্ট মডারেশন কাঠামোর প্রয়োজন বলে মনে করেন অরিত্র।
তবে এই ডিজিটাল মাধ্যমের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তার প্রমাণ ‘রাত দখল’। তবে পাশাপাশি, কতক্ষণ আমাদের মাথায় ও মনে কোনও ঘটনা স্থায়ী ছাপ ফেলছে, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দিন দিন কমছে মানুষের ধৈর্য। গড়ে ৩ মিনিটের বেশি রিল দেখার অভ্যাস আজ আমাদের। তাই রাত দখল হোক বা এস আই আর, কিছুই আজ আর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না।
এখানেই আজ হয়ত বা ধনতন্ত্র ক্রমে সফল এবং পরাজিত মানবতা। তবে আগামী কোন দিকে যাবে, তা দেখার আশা থেকেই যাবে আমাদের। কারণ, পাশাপাশি বিভিন্ন ‘পকেটস’ বা ছোট ছোট এলাকায় মানুষ আবার জড়োও হচ্ছে নানা বাহানায়…গড়ে উঠছে ছোট ছোট প্রতিবাদও…সেই ‘সাবকালচার’র দিকে তাকিয়ে থাকব আমরা।