সমরেশ বসুর জীবন অবলম্বনে নাটক। পরিচালকের মুখোমুখি ট্রামলাইনের তরফে সৌম্যা ঘোষ

সমরেশ বসুর জীবনে তিনটি প্রধান দিক। অধ্যাত্ম, রাজনীতি, যৌনতা… একদিকে তিনি লিখেছেন, ‘কোথায় পাবো তারে?’
সেই একই মানুষ লিখছেন, ‘বিবর’ বা ‘প্রজাপতি’, আবার সেই একই মানুষ নৈহাটি অঞ্চলের ধারাবাহিক শ্রমিকদের কথাও লিখেছেন…
অনির্বাণ: ওঁর জন্মশতবর্ষকে মাথায় রেখে এই নাটকের লেখক হর ভট্টাচার্যকে বলি, যদি সমরেশের ‘দেখি নাই ফিরে’র একটা নাট্যরূপ দেওয়া যায়।
কিন্তু প্রাথমিকভাবে তিনি নারাজ ছিলেন। তারপরে দীর্ঘদিন কেটে যায়। বেশ কয়েকবার অদলবদল করে ফাইনালি এই নাট্যরূপ দেওয়া হয়।
বিরাট ক্যানভাসের এই নাটকে প্রায় ৫৩টা চরিত্র। চেষ্টা করেছি, সীমিত অভিনেতাদের দিয়েই নানা চরিত্রে অভিনয় করাতে।
নাটকটি এই সময়ে করার প্রাসঙ্গিকতা কী?
আমি একজন আদ্যন্ত রাজনৈতিক মানুষ। আমার নাটকেও চলে আসে সেই রাজনীতি। ২০০৬ সালে যখন ‘আগুনের বর্ণমালা’ করি, তখন আমাদের রাজনৈতিক কারণে আহতও হতে হয়।
কিন্তু, আমি কখনওই আমার জীবনে নাটকের সঙ্গে আপোষ করিনি। বরাবরই চেয়েছি আমি যা বিশ্বাস করি, তা-ই আমার নাটক বলবে। এই নাটকটার ক্ষেত্রেও আমি এই বিশ্বাসে অটল।
সমরেশ বসু’র চরিত্রে দেবশঙ্কর হালদার— এই নাটকটি করার অভিজ্ঞতা কেমন?
দেবশঙ্কর হালদারের করা প্রত্যেকটা চরিত্রে আলাদা করে একটা চারিত্রিক মাত্রা পাওয়া যায়। তো, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এই চরিত্রটা করার প্রসঙ্গে যখন দেবুর সঙ্গে আমার কথা হয়, তখন ও বলে, ওঁকে কি সমরেশ মানাবে? আমি আশ্বাস দি। বলি, খুব ভালো মানাবে। এবং মেক-আপ করার পরে তো খুবই কাছাকাছি লাগছে ওঁকে। এবং আমাকে নবকুমার বসু, সমরেশ বসুর ছেলে, ফোন করে বললেন, যে দেবুর সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি আরও বললেন যে, খুব ভালো লাগছে দেবশঙ্করকে। চরিত্রের সত্যটাকে ধরতে পেরেছেন তিনি।
এ বিষয়ে একটা খুব সুন্দর কথা বলেছেন দেবশঙ্কর। সমরেশের চরিত্রের সত্যটাকে তুলে ধরাই ছিল তাঁর আসল কাজ। নবদাও তাই বলছেন। সমরেশ বসু’র মহাকাব্যিক জীবনে নানা পরত রয়েছে…
সমরেশ এ নাটকে তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে যাচ্ছেন। তাতে তাঁর স্ত্রীও কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করছেন। কারণ, যে হাতে তিনি লাল ঝান্ডা ধরেন, সেই একই হাতে কি করে তুলসীতলায় প্রদীপ ধরছেন!
কিন্তু, সমরেশের মতো লেখক বা শিল্পীদের জীবনে বারবার দেখা যায় এই দ্বৈততা।
আমরা সাধারণরা কিছুতেই বুঝি না, ভক্তি আর বিপ্লব আলাদা না।

সমরেশ ছাড়া আর কোন কোন চরিত্র এই নাটকে এসেছে?
তাঁর প্রথম স্ত্রী গৌরী বসু এসেছেন, এসেছেন তাঁর ‘দেখি নাই ফিরে’র নায়ক কিংবদন্তি চিত্রকর রামকিঙ্কর বেইজ। এবং আরও জরুরি নানা চরিত্র।
অবশ্য, যে সমরেশকে আমরা চিনি, এই নাটকে তার বাইরেও দেখা যাবে নানা চেহারা।
পার্টি থেকে ব্যান হওয়া, জেল খাটা, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব, এইসবই ঘুরে ফিরে এসেছে এই নাটকে। দু’ঘন্টার মধ্যে মহাকাব্যিক জীবনকে যতটা ধরা যায়।
রামকিঙ্করের সঙ্গে তাঁর কেমন সম্পর্ক দেখানো হয়েছে এই নাটকে?
সমরেশ আনন্দবাজারের হয়ে তাঁকে নিয়ে লিখিতে যান। রামকিঙ্কর তাতে রাজি ছিলেন না। তিনি জানান, এই লেখা বিক্রি হলে তিনি কী পাবেন? মদের দোকানে ধার শোধ হবে?
তাই, তাঁর ওপরওয়ালাকে পয়সা পাঠাতে বলেন। বাধ্য হয়ে সম্পাদক সাগরময় ঘোষকে উনি জানান। সাগরময় রামকিঙ্করের সে দাবিতে সম্মত হন।
এখন তো প্রচুর চরিত্র নির্ভর কাজ হচ্ছে, মানে সিনেমা এবং নাটক-দুই ক্ষেত্রেই সেটা হচ্ছে। এই ধরনের নাটকটা করার পিছনে কি কোথাও এই রকম একটা চিন্তাও ছিল? যে একজন বড় মাপের মানুষের জীবনকে তুলে ধরতে হবে?
না না। চরিত্র নির্ভর কিছু না। সমরেশ বসুর জন্মশতবর্ষকে ঘিরেই আমি এটা করেছি।
আর, এ ছাড়া কোনও কারণ ছিল না। আমার মনে হয়েছিল সমরেশ বসু বাংলা সাহিত্যে হিমালয়ের সমান। সেই জায়গায় দাঁড়িয়েই সমরেশ বসুকে স্মরণ। এ ছাড়া আমার বাকি কিছু মনে হয়নি। তবে একটা কথা আমি বলতে পারি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ এইসব বাঙালির যে উচ্চতা আর আজকের বাঙালির যে অবস্থান— তা তুলনা করলে বোঝা যায় আজ এই জাতির কি অবস্থা!
তাই, বাঙালি জাতিসত্তার প্রশ্নে অতীতকে স্মরণ করা দরকার।
আপনাদের নাটকের জন্য শুভেচ্ছা রইল।
ধন্যবাদ।
টিকিট – https://www.thirdbell.in/events/amritosandhan/
Kriti Events
Digital partner: Tramline
Enquiries 8240626725