SIR-এর পর CENSUS-এর কাজে শিক্ষকরা, কতটা অসুবিধায় ছাত্রছাত্রীরা?
অরূপরতন চক্রবর্তী

একদিকে SIR-এর ধকল, তার রেশ কাটতে না কাটতেই Census। ভোটার তালিকা থেকে জনগণনা— সরকারি কাজের তালিকায় শিক্ষকরা যেন এখন ‘অলরাউন্ডার’। ক্লাসে পড়াবেন, খাতা দেখবেন, পরীক্ষা নেবেন, স্কুলের হাজারো প্রশাসনিক কাজ সামলাবেন— আর তার ফাঁকে কখনও ভোট, কখনও SIR, কখনও Census! ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষকরা স্কুলে পড়াবেন কখন? আর ছাত্রছাত্রীরাই বা পড়বে কখন? সিলেবাস শেষ হবে তো?
সম্প্রতি কলকাতা হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, জনগণনার কাজে কোনও শিক্ষককে নিয়োগ করতে হলে রাজ্যকে সংশ্লিষ্ট স্কুল কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হবে। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিকল্প শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় প্রভাব না পড়ে। তবে দায়িত্ব দেওয়া হলে সেই জনগণনার কাজ শিক্ষককে করতেই হবে। আইনের কথা পরিষ্কার। কিন্তু স্কুলের বাস্তব ছবিটা কি এতটাই পরিষ্কার?
একজন শিক্ষককে যদি কয়েকদিনের জন্য Census-এর কাজে যেতে হয়, তাঁর জায়গায় ‘বিকল্প শিক্ষক’ আসবেন— শুনতে বেশ সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে সেই বিকল্প শিক্ষক কোথায়? স্কুলে এমনিতেই শিক্ষকসংখ্যা অনেক জায়গায় প্রয়োজনের তুলনায় কম। একজন শিক্ষক ছুটিতে গেলে অন্য শিক্ষককে দিয়ে দুটো ক্লাস একসঙ্গে সামলানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেখানে আবার একজনের জায়গায় আর একজনকে বসানো— কাগজে যত সহজ, স্কুলে ততটা নয়। একজন শিক্ষক মজা করে বলতেই পারেন, ‘আমি কি শিক্ষক, না সরকারি কাজের ফুল-টাইম কর্মী?’
আর ছাত্রছাত্রীরাও কম সমস্যায় পড়ে না। আজ ইংরেজির স্যার নেই, কাল ইতিহাসের ম্যাডাম নেই, পরশু আবার অঙ্কের ক্লাস ‘অ্যাডজাস্ট’। শিক্ষক নেই বলে ক্লাস হচ্ছে না, কিংবা অন্য শিক্ষক এসে কোনওরকমে সময়টা সামলাচ্ছেন। সিলেবাস এগোচ্ছে ধীরগতিতে, পরীক্ষার আগে চাপ বাড়ছে। শেষমেশ বাড়ির পড়া, প্রাইভেট টিউশন, স্কুলের পরীক্ষা— সব মিলিয়ে পড়ুয়ার মাথায় হাত।

বিশেষ করে ছোট ক্লাসের পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটা বয়সে শিক্ষক শুধু বই থেকে পড়ান না, পড়ার অভ্যাস তৈরি করেন, প্রশ্ন করতে শেখান, ভুল শুধরে দেন। সেই শিক্ষক যদি বারবার স্কুলের বাইরে সরকারি দায়িত্বে চলে যান, তার প্রভাব শুধু একটি-দুটি ক্লাস মিস হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
অন্যদিকে শিক্ষকদের অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকারি দায়িত্ব তাঁরা পালন করবেন— এতে আপত্তির জায়গা নেই। জনগণনা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হল, সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজের জন্য কেন বারবার স্কুলের শিক্ষকই সবচেয়ে সহজলভ্য কর্মী হিসেবে বিবেচিত হবেন?
শিক্ষকদের কাজের চাপ এমনিতেই কম নয়। স্কুলের পড়ানো, খাতা দেখা, রিপোর্ট তৈরি, বিভিন্ন সরকারি পোর্টালে তথ্য আপলোড, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা— তালিকা বেশ লম্বা। তার সঙ্গে SIR, Census, নির্বাচন— সব মিলিয়ে শিক্ষক যেন বলতেই পারেন, ‘চকটা হাতে নিয়েছিলাম পড়ানোর জন্য, শেষমেশ ফর্ম-ফাইলই বেশি ভরছি!’
অবশ্যই জনগণনা হবে। সরকারি দায়িত্বও পালন করতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে স্কুলের পড়াশোনার ধারাবাহিকতাটাও রক্ষা করা জরুরি। আদালতের নির্দেশে বিকল্প শিক্ষকের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে— এখন আসল চ্যালেঞ্জ সেই ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়। কারণ, শেষ পর্যন্ত Census-এর তথ্য ঠিকঠাক হওয়া যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি ক্লাসরুমে একজন শিক্ষক থাকা। নইলে কয়েক বছর পর Census-এর হিসেব হয়তো একেবারে নিখুঁত হবে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা মজা করে প্রশ্ন করতেই পারে— আমাদের সিলেবাসটা শেষ হয়েছিল তো?