দুর্গাপুজোয় আমিষ নিয়ে বিতর্ক: বাঙালির রীতি কি এত সহজে বদলে দেওয়া যায়?

অরূপরতন চক্রবর্তী
দুর্গাপুজো [Durga Puja]মানেই বাঙালির কাছে শুধু মণ্ডপ, প্রতিমা আর ঢাক নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক রীতি, খাদ্যসংস্কৃতি এবং লোকাচার। তাই দুর্গাপুজোয় বাঙালিরা মণ্ডপে বসে আমিষ খান—এমন দাবি যেমন তথ্যগত ভাবে সঠিক নয়, তেমনই দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির ঘরে চার দিন নিরামিষ—এমন ধারণাও ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)-র বক্তব্য ঘিরে এই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। প্রথমে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে পুজোমণ্ডপের ভিতরে আমিষ খাবার [ non vegetarian food ] রাখা বা খাওয়ার বিষয়ে VHP আপত্তি জানিয়েছে। সংগঠনের বক্তব্য ছিল, প্রতিমার পবিত্রতা ও মণ্ডপের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে আমিষ খাবার মণ্ডপের বাইরে রাখা উচিত। পরে VHP-র দপ্তর থেকে অবশ্য স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, কোনও ‘ফতোয়া’ বা আমিষ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি এবং ২৬ আগস্টের বৈঠকেও খাবার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আলোচনা হয়নি।

কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন—মণ্ডপের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কথা বলা এক বিষয়, আর বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিকে নিরামিষের ছাঁচে ফেলতে চাওয়া সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। কালীঘাটে বলি দেওয়া ছাগলের মাংস পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া রান্না করে দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়। এ ছাড়াও রামকৃষ্ণ মিশনেও বিশেষ তিথিতে দেওয়া হয় মাছের ভোগ। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সময় থেকেই বাংলার সনাতন ও শাক্ত সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেবতাকে মাছ-মাংস নিবেদনের এই ধারা চলে আসছে, যা পরবর্তীতে মিশনের বিভিন্ন কেন্দ্র ও উৎসবেও অনুসৃত হয়। সাধারণ দৈনন্দিন ভোগে নিরামিষ খিচুড়ি বা অন্নভোগ থাকলেও বিশেষ তিথিতে মাছের ভোগ দেওয়ার এই ঐতিহ্য বেশ উল্লেখযোগ্য। তবে, দূর্গা পুজো মণ্ডপে আমিশ ভোগ ছাড়া অন্য কোনও আমিষ খাবার প্রবণতা কোনোদিন ছিলনা এবং জ্ঞানত এরকম আচার পালনের নিদর্শন সম্ভবত নেইও।
বহু বাঙালি পরিবারে নবমীর দিন পাঁঠার মাংস রান্না করার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে। আসলে দুর্গাপুজোয় নবমীতে বলি দেওয়ার প্রথা ছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঐতিহাসিক ও লোকসংস্কৃতির আলোচনাতেও নবমীতে পাঁঠার মাংসের জনপ্রিয়তার উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার দশমীর সঙ্গে অনেক বাঙালি পরিবারের জোড়া ইলিশ ঘরে আনার ঐতিহ্যও যুক্ত। বিশেষত বাঙাল পরিবারের কিছু রীতিতে বিজয়া দশমীর এই ইলিশের গুরুত্ব রয়েছে। সেদিন জোড়া ইলিশ বিদায় দেওয়া হয়, এবং প্রথাগত ভাবে সরস্বতীপুজোর সময় আবার ইলিশ মাছ বাঙালির হেঁসেলে ঢোকে।

বাঙালির দুর্গাপুজোর খাদ্যসংস্কৃতিকে ‘আমিষ বনাম নিরামিষ’-এর সরল দ্বন্দ্বে বিচার করা ঠিক নয়। মণ্ডপে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা বজায় রাখার নিয়ম থাকতেই পারে। কিন্তু নবমীর পাঁঠার মাংস কিংবা দশমীর জোড়া ইলিশ—এগুলি বহু পরিবারের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
ধর্মীয় আচারকে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনই বাঙালির নিজস্ব লোকাচার ও খাদ্যঐতিহ্যকেও সম্মান করা জরুরি বলে না করছেন অনেক জ্ঞানীগুণীজন। তাদের মতে, দুর্গাপুজো বাঙালির—তার বৈচিত্র্যটুকুও বাঙালিরই।