ভালোবাসার দার্জিলিং: বর্ষায় মেঘ, রোদের লুকোচুরি আর বাঙালির ছাতা

অরূপরতন চক্রবর্তী
মেঘের আড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘা, হাতে ছাতা আর পেটপুজোয় কেভেন্টার্স—বর্ষার দার্জিলিংয়ে এর চেয়ে বড় সুখ আর কী!
দার্জিলিংয়ে বাঙালি যায় মূলত তিনটি কারণে—কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে, মোমো খেতে এবং একটু ঠান্ডা পেতে। আর যদি বর্ষাকাল হয়, তাহলে সঙ্গে চতুর্থ জিনিসটি অবশ্যই চাই—একখানা ভালো ছাতা!
বর্ষায় দার্জিলিংয়ের সৌন্দর্য অন্যরকম। আকাশ কখনও কালো মেঘে ঢেকে যায়, আবার আচমকাই মেঘ সরে গিয়ে পাহাড়ের গায়ে রোদ পড়ে। আর সেই মেঘ-রোদের লুকোচুরির মাঝেই প্রথম দিন যদি হঠাৎ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেয়, তাহলে বাঙালি পর্যটকের আর কী চাই!
প্রথম দিনেই সেই সৌভাগ্য হয়েছিল। এতক্ষণ যে পাহাড়টা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল, আচমকা মেঘ সরে গেল। সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন দার্জিলিং থমকে দাঁড়াল। ক্যামেরা বেরোল, মোবাইল বেরোল, আর স্বাভাবিকভাবেই শুরু হল—’একটা ছবি তোলো’, ‘আমার সঙ্গে একটা ছবি’, ‘ওই দিক থেকে নাও, পাহাড়টা যেন ভালো আসে!’ তারপর শুরু হল বাঙালির আসল দার্জিলিং।
কেভেন্টার্সে ব্রেকফাস্ট, কুঙ্গায় লাঞ্চ, গ্লেনারিসে ডিনার
সকালে মাথায় ছাতা দিয়ে কেভেন্টার্সে ব্রেকফাস্ট। পাহাড়ি ঠান্ডা, বৃষ্টি আর সামনে শহরের দৃশ্য—এর সঙ্গে কেভেন্টার্সের খাবার যেন আলাদা একটা পর্যটন-অভিজ্ঞতা।
দুপুরে কুঙ্গায় লাঞ্চ। সন্ধ্যা নামলে গন্তব্য গ্লেনারিস। অর্থাৎ শরীর যতই বলুক -আজ একটু বিশ্রাম নাও, মধ্যবিত্ত বাঙালি মন বলছে—দার্জিলিং এসে এতদিন পরে খাওয়াদাওয়াটা ঠিকঠাক না করলে চলে? ফলে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার—তিনটিই হল। হাঁটা যতটা সম্ভব কম, খাওয়াটা যথাসম্ভব বেশি। স্বাস্থ্যবিধির দিক থেকে খুব আদর্শ না হলেও ছুটির দিক থেকে নিঃসন্দেহে সফল!
টয়ট্রেনে ঘুম, বাতাসিয়া লুপে জয় রাইড
দার্জিলিংয়ে গিয়ে টয়ট্রেনে না উঠলে যেন ভ্রমণের একটা অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পাহাড়ের গা বেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা সেই ট্রেনের নিজস্ব একটা মায়া আছে।
আর বাতাসিয়া লুপে জয় রাইড—সে তো দার্জিলিংয়ের চিরন্তন রোম্যান্স। ট্রেন ঘুরছে, পাহাড় ঘুরছে, মেঘ আসছে-যাচ্ছে, আর আমরা জানলার বাইরে তাকিয়ে ভাবছি—জীবনটা যদি এই গতিতেই চলত!
তবে শরীর তখন অন্য কথা বলছে।
হার্টের সমস্যার কারণে একটু হাঁটলেই দম বন্ধ হয়ে আসছিল, শরীর খারাপ লাগছিল। পাহাড়ে কয়েক পা হাঁটা সমতলের কয়েকশো মিটারের সমান মনে হচ্ছিল। তবু বাঙালি পর্যটকের অদম্য জেদ—এতদূর এসে বাজারটা না ঘুরে ফিরব? ফলে মাথায় ছাতা, মুখে ক্লান্তি, বুকের মধ্যে হাঁপ ধরা—তবুও দার্জিলিংয়ের বাজারে ঘোরাঘুরি চলল। কারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে বেড়াতে গিয়ে কিছু না কিনে ফেরা প্রায় সামাজিক অপরাধ!
দার্জিলিংয়ের এক ডাক্তার
এই ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় অবশ্য কোনও পর্যটনস্থানে নয়, একজন ডাক্তারের সঙ্গে। দক্ষিণবঙ্গ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে দার্জিলিঙে বদলি হয়ে এসেছিলেন তিনি। এতদিন পাহাড়েই কাটিয়ে দিয়েছেন। কথায় কথায় জানালেন, সমতলে আর ফিরতে চান না। কথাটা শুনে মনে হল, দার্জিলিং বোধহয় শুধু পর্যটকদের জায়গা নয়। কারও কারও কাছে এই পাহাড়ই হয়ে ওঠে ঘর।
বর্ষার দার্জিলিং তাই শুধু মেঘে ঢাকা পাহাড় নয়। এটি কখনও হঠাৎ দেখা পাওয়া কাঞ্চনজঙ্ঘা, কখনও ছাতা মাথায় কেভেন্টার্সের ব্রেকফাস্ট, কখনও কুঙ্গার লাঞ্চ, গ্লেনারিসের ডিনার, কখনও টয়ট্রেনের জানলা। আর কখনও বা কয়েক পা হাঁটতেই হাঁপিয়ে ওঠা শরীরকে নিয়ে পাহাড়ি বাজারে ঘোরার একগুঁয়ে বাঙালি মন।
মেঘ আসে, মেঘ সরে যায়। রোদ ওঠে, আবার বৃষ্টি নামে। দার্জিলিংও ঠিক তেমনই—কখনও দেখা দেয়, কখনও লুকিয়ে থাকে। আর সেই লুকোচুরির মধ্যেই বোধহয় তার আসল ভালোবাসা।