সমরেশ বসুর চরিত্রে এবার দেবশঙ্কর হালদার, ট্রামলাইনকে জানালেন সমরেশ হয়ে ওঠার গল্প
(দেবশঙ্কর হালদারের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে লেখাটি লেখা)

একজন অভিনেতা হিসেবে যে চরিত্রই আমি করি, তিনি হয়ত সমরেশ বসু নন, তিনি হয়ত সব্যসাচী সেন (উইঙ্কল টুইঙ্কল), বা তিনি হয়ত অন্য কোনও একটি নাটকের চরিত্র, তাঁদের মধ্যেও নানাবিধ হাতছানি থাকে। এই হাতছানি হয়ত আধ্যাত্মবাদের দিকে বা কমিউনিজমের দিকে বা জীবনের দিকে বা উন্মার্গগামীতার দিকে-যে কোনও দিকেই হতে পারে। এ সব চরিত্রের মধ্যেই নানা রকম হাতছানি থাকে, কোনও অভিনেতা এসবের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিজস্ব একটা পথ তৈরি করে, অর্থাৎ জীবনের সব ঘাটের জল খেতে চান। তো, যখন দেখি যে কোনও চরিত্রের মধ্যে এই প্রবণতাগুলো আছে, তখন অভিনেতা হিসেবে তাতে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে। হয়ত তারপর হাবুডুবু খেয়ে ডুবেই যাব, বা ভেসে উঠতেও পারি, কিন্তু কোনও লাজলজ্জা থাকে না অভিনেতা হিসেবে। কারণ অভিনেতা তো ইন্টেলেকচুয়াল নন শুধুমাত্র, একজন অভিনেতা নিজের আবেগ দিয়ে-শরীর দিয়ে-মন দিয়ে একটি চরিত্র নির্মাণ করেন। আমি বলছি না, একজন ইন্টেলকচুয়াল তা করে না। বলতে চাইছি, আমাদের দৌড়ঝাঁপ করে কাজটা করতে হয়, তা থেকে হয়ত ঘাম ঝরে, চোখে জল আসে, এগুলো তখন সত্যি বলে মনে হয়।
আসলে, অভিনয় একটা বায়োলজিক্যাল প্রসেস। কেউ অপমান করলে যেমন কান লাল হয়ে যায়, ব্লাডপ্রেশার বাড়ে, যখন অভিনয় করি তখনও এমনই ঘটতে থাকে। কখনও কখনও এমন কিছু চরিত্র থাকে জনমানসে, যাকে প্রত্যেকে তার মতো করে আবিষ্কার করে নিয়েছে।
তারপর সে তার মতো করে একটা উপলব্ধিতে পৌঁছেছে যে, এই চরিত্র এইরকম—
আমি যখন সেই চরিত্রের কাছে ফিরে যাই, এইসব ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্রের যেসব উল্লম্ফন-উড়াল আছে, চেষ্টা করি সমস্ত পরতকেই ছুঁয়ে যেতে।
সমরেশ বসুর চরিত্রও সেরকমই বহুমাত্রিক।
আমরা যখন নাটকের অনুশীলন করেছি শরীরে-মনে-যাপনে, আমরা এইসব হাতছানিকেই ধরার চেষ্টা করেছি।
সমরেশের মহাকাব্যিক জীবন তো মাত্র দু-ঘন্টায় ধরা সম্ভব নয়। বরং তাঁর চরিত্রের কিছু রঙ মাখার সুযোগ আমি পাবো। সেটুকুই আমার আবিষ্কার!
আমি এতদিন বাঙালির ‘স্বপ্নের সব চরিত্র’-এ অভিনয় করেছি কি না জানি না, তবে সব চরিত্রই পূজনীয়, বড় আদরের ধন। তাই, এঁদের নিয়ে পরীক্ষা করলে বাঙালি রেগে যেতে পারে, এটা সবসময়ই মাথায় থাকতো। কিন্তু, আমি সবসময়ই ভেবেছি এঁরা আমার পাশের বাড়ির প্রতিবেশি। সেখান থেকেই একটা অন্য ‘বড় ঘটনা’ হয়ে উঠেছেন তাঁদের জীবনে।
সমরেশের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই আমার কাছে। আমি হয়তো মেকআপে সেই চরিত্রগুলোর আদল তৈরি করার চেষ্টা করি। কিন্তু, সবসময়ই লক্ষ্য থাকে চরিত্রের অন্তরের সত্যে পৌঁছানো। রবীন্দ্রনাথ যেমন ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে বলেছেন— অভিনয় তো নকলনবিশি না, হরবোলার কাণ্ডও না, যা স্বাভাবিকের পর্দা ফাঁক করিয়া ভিতরের লীলা দেখাইবার ভার দেয়।…
আমারও চেষ্টা থাকে, তথাকথিত ভিতরের লীলার কাছাকাছি যাওয়ার। তাতে আপাততভাবে আমার চেহারা, তার চেহারা মিলল কি না তা নিয়ে খুব একটা ভাবিত না।
মঞ্চের ওপর যে উচ্চারণটা আমি করছি, তার যে সত্য এবং চরিত্রের সত্য কাছাকাছি থাকছে কি না— তা আবিষ্কার করা।
এই নাটকে সমরেশ বসুর দুটো বয়স— ছোট সমরেশ আর বড় সমরেশ। চেষ্টা করেছি সমরেশ বসুর ছায়ার নীচে দাঁড়িয়ে স্নিগ্ধ হতে।
এর আগে, কখনও ভক্তি কখনও বিপ্লব— মানুষের এই দুই আদিম চেতনাকে
আলাদা আলাদাভাবে মঞ্চায়িত করেছি। কিন্তু, সমরেশের চরিত্রে রয়েছে এই দুইয়েরই সমাবেশ।
এই জায়গাটা বোঝা ভীষণ জরুরি। একজন বড় মাপের মানুষ কীভাবে তাঁর জীবনকে দেখছেন, প্রায়শয়ই বুঝতে পারেন না তাঁর চারপাশের মানুষরা।
ভক্তি আর বিপ্লব যে একই মুদ্রার দুটো পিঠ— তা বুঝতেন সমরেশ।
তাই, ইতিহাস জুড়ে প্রথাগত মার্কসবাদীদের সঙ্গে ব্যাতিক্রমী এইসব চিন্তকদের বিবাদ লেগেই ছিল। সমরেশকেও কিছুটা অন্য চোখে দেখতো কমিউনিস্ট পার্টি।
আবার ‘বিবর’, ‘প্রজাপতি’র লেখক সমরেশকে যৌনতার জন্যেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। আসলে যে ঈশ্বরের থেকেও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি, তারই আর একটা দিক এটি।
মানুষের ভিড়েই ঈশ্বরকে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন তিনি।
তাই, ‘অমৃত কুম্ভ’-এও আমরা দেখি অজস্র চরিত্র। তাঁদের কাউকে কাউকে তিনি মেরেও ফেলেছেন। কিন্তু, পরে স্বীকার করেছেন তাঁদের আসলে মৃত্যু নেই। একজন মারা গেলেও কোথাও না কোথাও জন্ম নেন। চরিত্রের এই দোদুল্যমানতা এবং প্রত্যয় দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছি।
টিকিট – https://www.thirdbell.in/events/amritosandhan/
Kriti Events
Digital partner: Tramline
Enquiries 8240626725