অমৃতকুম্ভের সন্ধানে—উপন্যাস থেকে সিনেমার পর এবার মঞ্চে কালকূট
অরূপরতন চক্রবর্তী

বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টিকে নতুন মাধ্যমে ফিরে পাওয়ার মধ্যে আলাদা এক উত্তেজনা থাকে। কালকূটের অমর উপন্যাস ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ সেই অভিজ্ঞতারই আর এক নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। উপন্যাস থেকে সিনেমা—এবার সেই কাহিনি উঠে আসছে নাটকের মঞ্চে। আর এই মঞ্চায়নের অন্যতম আকর্ষণ অভিনেতা দেবশঙ্কর হালদার। দৃশ্যপট নাট্যদলের সাম্প্রতিক প্রযোজনা ‘অমৃতসন্ধান’ মঞ্চস্থ হচ্ছে আগামী ২৮ তারিখ, একাডেমি অফ ফাইন আর্টসে [Academy of Fine Arts]। পরিচালনায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য [Anirban Bhattacharya]। কৃতি ও ফেবলওয়ার্কসের সহযোগিতায় এ দিনের মঞ্চায়ন। ডিজিটাল মিডিয়া পার্টনার ট্রামলাইন [Tramline]।
কালকূটের লেখায় যে জীবনদর্শন, মানুষের অন্তর্লীন অনুসন্ধান এবং ভারতীয় সমাজ-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক ছবি ধরা পড়েছিল, ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ তার এক অনন্য দলিল। অমৃতের সন্ধান এখানে শুধু কোনও পৌরাণিক বা ধর্মীয় অনুসন্ধান নয়; বরং মানুষের নিজের ভিতরে, জীবনের অর্থে এবং অস্তিত্বের গভীরে পৌঁছনোর এক প্রতীকী যাত্রা।

এই উপন্যাসের জনপ্রিয়তা বহুদিনের। পাঠকের কল্পনায় তৈরি সেই জগত একসময় সিনেমার পর্দায় নতুন রূপ পেয়েছিল। এবার মঞ্চ সেই গল্পকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলবে দর্শকের কাছে। সিনেমায় ক্যামেরা যে দূরত্ব তৈরি করে, থিয়েটারে অভিনেতা ও দর্শকের সরাসরি উপস্থিতি সেই দূরত্ব মুছে দেয়। ফলে কালকুটের চরিত্র, সংলাপ, দ্বন্দ্ব ও দর্শন মঞ্চে পেলে তার অভিঘাতও হতে পারে আরও প্রত্যক্ষ।
কালকূট অর্থাৎ সমরেশ বসুর ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ শুধু একটি উপন্যাস নয়, মানুষের ভিতরের অমৃতের সন্ধানে এক দীর্ঘ যাত্রা। ১৯৫৪ সালে এই বই দিয়েই কালকূট হিসেবে সমরেশ বসুর এক নতুন সাহিত্যিক সত্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে। পরে সেই বিস্তৃত, বহু চরিত্রের আখ্যান পৌঁছয় সিনেমার পর্দায়।

১৯৮২ সালে দিলীপ রায়ের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’। ছবিতে ছিলেন শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সমিত ভঞ্জ, রুমা গুহঠাকুরতা, মহুয়া রায়চৌধুরী ও অনুপকুমার। সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রয়াগের কুম্ভমেলাকে শুধু ধর্মীয় উৎসব হিসেবে না দেখে মানুষকে বোঝার এক বিশাল ক্ষেত্র হিসেবে দেখা।
এই ছবির পিছনে অবশ্য আরও পুরোনো এক গল্প আছে। উপন্যাসটি পড়ে বিমল রায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে হিন্দিতে ‘অমৃতকুম্ভ কি খোঁজ’ বানানোর পরিকল্পনা করেন এবং কুম্ভমেলায় শুটিংও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৯৬৬ সালে তাঁর মৃত্যুর কারণে ছবিটি আর সম্পূর্ণ হয়নি। বহু বছর পরে তাঁর ছেলে জয় রায় স্টুডিয়োর একটি ক্যানে সেই পুরনো নেগেটিভ খুঁজে পান। সেই ফুটেজ থেকেই তৈরি হয় Images of Kumbh Mela তথ্যচিত্র।
আর দিলীপ রায়ের ছবির শুটিং নিয়েও ছিল বাস্তবের সঙ্গে মিশে থাকা নানা গল্প। অনুপ কুমারের স্মৃতিচারণে জানা যায়, এলাহাবাদে শুটিংয়ের পাশাপাশি হরিদ্বারেও ইউনিট কাজ করেছিল। এমনকি ট্রেনের পরপর চারটি কামরা নিয়েও শুটিং হয়েছিল।
কালকূটের সাহিত্য, বিমল রায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং দিলীপ রায়ের ১৯৮২-এর চলচ্চিত্র—‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ তাই বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক বিশেষ যাত্রার নাম।
একই গল্পের উপন্যাস, সিনেমা ও নাট্যরূপ—তিনটি মাধ্যমেই তার স্বর আলাদা। তাই ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-র এই নতুন মঞ্চযাত্রা শুধু পুরনো গল্পের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং কালকূটকে নতুন প্রজন্মের চোখে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ। অমৃতের সন্ধান চলুক—এবার মঞ্চের আলোয়।
টিকিট – https://www.thirdbell.in/events/amritosandhan/
Digital partner: Tramline
Enquiries 82406 26725