ব্যান্ড মিউজিকে রিইউনিওয়ন: ২০ বছর বাদে ‘এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা’-র হাত ধরে ফিরছে মঞ্চে পরশপাথর
অরূপরতন চক্রবর্তী

বিশ বছর বাদে আবার মঞ্চে পরশপাথর। আগামী ২২ অগাস্ট মধুসূদন মঞ্চে ‘এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা’—নামটার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে একটা সময়ের কাছে ফিরে যাওয়ার গল্প। শুধু একটা ব্যান্ডের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং নব্বইয়ের সেই কলকাতায় ফিরে যাওয়া, যখন বাংলা ব্যান্ডের গান ছিল আমাদের তারুণ্যের শব্দ, আড্ডার সঙ্গী, প্রেমের ভাষা এবং কখনও কখনও নিজেদের খুঁজে পাওয়ার একটা মাধ্যম।
ব্যান্ডের ইতিহাসে ভাঙন নতুন কিছু নয়। জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে অনেক ব্যান্ডই একসময় থেমে গেছে। কেউ দীর্ঘ বিরতির পরে ফিরে এসেছে, কেউ আবার অসম্ভবকে সম্ভব করে পুনর্মিলন করেছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী এবং ব্যান্ডসঙ্গীত প্রেমী সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, পিঙ্ক ফ্লয়েডের রজার ওয়াটারসের ডেভ গিলমোরের মধ্যে মত পার্থক্য হয়েছিল তা জোড়া যায়নি। বিটলসের ভেঙে গেল। জোয়ান বায়েজ আর বব ডিলানের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল। এদিকে পুলিশ ভেঙে গেছিল কারণ স্টিং বলেছিল সব গান তো আমিই লিখি। তো স্বাভাবিক তো আমার লেখা আমারই গান আমিই সব সশরীরে গাইব, মানে আই উইল গো সোলো।
তবে, রক ইতিহাসে এমন প্রত্যাবর্তনের গল্পের অভাব নেই।

Cream-এর কথাই ধরা যাক। ১৯৬৮ সালে ভেঙে যাওয়ার ৩৭ বছর পরে, ২০০৫ সালে এরিক ক্ল্যাপটন, জ্যাক ব্রুস এবং জিঙ্গার বেকার লন্ডনের Royal Albert Hall-এ চারটি কনসার্টে একসঙ্গে ফিরেছিলেন। রক ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় পুনর্মিলন ছিল সেটি।
The Police ভেঙেছিল ১৯৮৬ সালে। দীর্ঘ ২১ বছর পরে Sting, Andy Summers এবং Stewart Copeland আবার একসঙ্গে মঞ্চে ওঠেন। ২০০৭-০৮-এর সেই বিশ্ব সফর হয়ে ওঠে বিশাল এক নস্টালজিক প্রত্যাবর্তন।
ABBA-র গল্প তো আরও অবিশ্বাস্য। প্রায় চার দশক একসঙ্গে নতুন গান রেকর্ড না করার পরে ২০২১ সালে তারা ফিরে আসে Voyage অ্যালবাম নিয়ে। যেন সময়কে পেছনে হাঁটিয়ে দেওয়া।
আর আছে The Eagles। ১৯৮০ সালে ভেঙে যাওয়ার পরে Don Henley এবং Glenn Frey-সহ ব্যান্ডের সদস্যরা দীর্ঘদিন পুনর্মিলনের ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। অবশেষে ১৯৯৪ সালে তাঁরা ফিরে এলেন। গেলেন ফিরে স্টেজে বলেইফেললেন, ঈগলস কখনই ভেঙে যায়নি,তারা ১৪ বছর ছুটিতে ছিলেন। সেই প্রত্যাবর্তনের ফল Hell Freezes Over—লাইভ অ্যালবাম এবং নতুন গান মিলিয়ে যা হয়ে উঠেছিল একটি বড় সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সাফল্য। নামটিও ছিল মজার—একসময় বলা হয়েছিল, Eagles আবার একসঙ্গে ফিরবে ‘যেদিন নরক বরফে জমবে’!

কিন্তু কলকাতার গল্পটা একটু আলাদা।
এখানে ব্যান্ড মানে শুধু গান নয়। ব্যান্ড মানে একটা সময়। নব্বইয়ের কলকাতায় ক্যাকটাস,পরশপাথর, ফসিলস-এর মতো নামগুলো ধীরে ধীরে তৈরি করেছিল একটা সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর। নজরুল মঞ্চ, কলেজ ফেস্ট, ছোট ছোট ক্লাব, রিহার্সাল রুম, গানের দোকান, আড্ডা, জ্যাম সেশন—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অন্য কলকাতা।
সেই সময়ের গান শুনে, কনসার্টে গিয়ে, শিল্পীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে, কখনও কখনও জ্যাম সেশনের কাছাকাছি থেকে বোঝা যায় —এই গানগুলোকে শুধু ‘রক মিউজিক’ বলে আলাদা করে রাখা যায় না। এগুলো আসলে একটা প্রজন্মের স্মৃতি।
তাই বিশ বছর পরে পরশপাথর মঞ্চে ফিরলে দর্শক শুধু পুরনো গান শুনতে যাবেন না। তাঁরা নিজেদের একটা পুরনো সময়কে দেখতে যাবেন।মধুসূদন মঞ্চের অন্ধকারে আলো জ্বলে উঠবে। প্রথম কর্ডটা বাজবে। আর হঠাৎ করে মনে হবে—এই তো, সেই গান! সেই বয়স! সেই কলকাতা!
আজকের চল্লিশ-পঞ্চাশের মানুষগুলো হয়তো আবার কয়েক ঘণ্টার জন্য ফিরে যাবেন তাঁদের কুড়ির কোঠায়। কারও পাশে বসে থাকবে সেই পুরনো বন্ধু, কারও মনে পড়বে প্রথম কনসার্ট, কারও মনে পড়বে প্রেম, আড্ডা কিংবা শহরের কোনও এক অচেনা গলিতে কাটানো রাত। তাই পরশপাথরের এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ব্যান্ডের রিইউনিয়ন নয়। এটা আসলে ‘এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা’-র হাত ধরে নব্বইয়ের কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আমন্ত্রণ।