ফিরছে পরশপাথর নস্টালজিয়ায় নজরুল মঞ্চের আলো-আঁধারি,: নব্বইয়ের বাংলা রকের সেই দিনগুলি
অরূপরতন চক্রবর্তী

ক্যাকটাস, পরশপাথর, ক্রসউইন্ডজ, ফসিল্স (Cactus, Parash Pathar, Crosswinds, Fossils)—একটা প্রজন্মের কানে তখন গিটার বাজত, আর মনে তৈরি হত নিজস্ব পৃথিবী। নব্বইয়ের দশকের কলকাতাকে যদি একটা শব্দে মনে করতে হয়, আমার কাছে সেই শব্দটা সম্ভবত—রক।
আজকের মতো মোবাইল ফোন ছিল না, ইউটিউব (YouTube) ছিল না, স্পটিফাই ছিল না। নতুন গান শুনতে হলে ক্যাসেট কিনতে হত, বন্ধুর কাছ থেকে ধার করতে হত, অথবা অপেক্ষা করতে হত কোনও কনসার্টের। আর সেই অপেক্ষার একটা বড় ঠিকানা ছিল নজরুল মঞ্চ- তখন ওপেন এয়ার থিয়েটার।
কনসার্টের দিনটা সকাল থেকেই অন্যরকম লাগত। বিকেল হলেই বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়া। পকেটে সামান্য টাকা, মাথায় অসংখ্য গান, আর মনে একটা উত্তেজনা—আজ সামনে থেকে প্রিয় ব্যান্ডকে দেখব। গেটের বাইরে তখন একরকম নিজস্ব পৃথিবী। কেউ গিটার নিয়ে এসেছে, কেউ ব্যান্ডের নাম লেখা টি-শার্ট পরে, কেউ আবার শুধু গান শুনতে এসেছে। বয়সে আমরা সবাই খুব বড় ছিলাম না, কিন্তু নিজেদের পছন্দের গান নিয়ে আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম।
মঞ্চে যখন পরশপাথর উঠত, একটা আলাদা বিদ্যুৎ ছড়িয়ে পড়ত। বাংলা ভাষায় রক করা যায়—এটা তখন আর তত্ত্ব নয়, চোখের সামনে দেখা বাস্তবতা। পরশপাথর-এর গানে ছিল অন্যরকম মায়া; রকের সঙ্গে মিশে থাকত আবেগ, প্রেম, বিষণ্ণতা।
ক্রসউইন্ডজ, ক্যাকটাস-এর মতো ব্যান্ডগুলো কলকাতার ইংরেজি রক সংস্কৃতির সঙ্গে সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মের একটা সেতু তৈরি করেছিল। তারপর এল ফসিল্স। বাংলা রকের শব্দভাণ্ডার যেন আরও জোরে, আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শহরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। গিটার, বেস, ড্রাম আর কণ্ঠ—সব মিলিয়ে মনে হত, কলকাতা শহরটাও বুঝি একটু জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
আমি তখন শুধু শ্রোতা ছিলাম না; সুযোগ পেলেই গানের মানুষদের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতাম। কনসার্টের পরে কখনও আড্ডা, কখনও কোনও বন্ধুর বাড়িতে ছোট্ট জ্যাম সেশন। একটা ঘরে দুটো গিটার, একটা বেস, টেবিলে চায়ের কাপ—তারপর কে কখন কোন গান ধরবে তার ঠিক নেই। রাত বাড়ত, গান চলত। কেউ ভুল করত, সবাই হেসে উঠত, আবার শুরু হত।
সেই সময় বুঝেছিলাম, ব্যান্ড মানে শুধু মঞ্চের আলো নয়। মঞ্চের বাইরে এরা আমাদের মতোই মানুষ—গান নিয়ে ঝগড়া করে, নতুন কর্ড নিয়ে পরীক্ষা করে, কারও লেখা লিরিক নিয়ে তর্ক করে, আবার পরক্ষণেই একসঙ্গে গান ধরে।
আজ প্রযুক্তির দৌলতে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের গান এক ক্লিকে শোনা যায়। তবু সেই সময়ের একটা জিনিস আর ফিরবে না—অপেক্ষা।
একটা ক্যাসেটের জন্য অপেক্ষা। একটা কনসার্টের জন্য অপেক্ষা। প্রিয় ব্যান্ড মঞ্চে ওঠার অপেক্ষা।
আর তারপর হঠাৎ আলো নিভে যাওয়া।
গিটার বাজা শুরু।
হাজার মানুষের চিৎকার।
সেই মুহূর্তে মনে হত—কলকাতার এই শহরটাই আমাদের।
নব্বইয়ের বাংলা রক তাই আমার কাছে কোনও সংগীত-ইতিহাসের অধ্যায় নয়। এটা একটা বয়সের গল্প। কিছু বন্ধু, কিছু রাত, কিছু অসম্ভব জোরে বাজতে থাকা গিটার, আর নজরুল মঞ্চের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মনে হওয়া—এই গানটা শুধু আমার জন্যই লেখা।
অনুষ্ঠানের টিকিটের জন্য নীচের লিংক ও নম্বরে কানেক্ট করুন-
Tickets at www.kriti-events.com
Enquiries 82406 26725