এবার বছর কুড়ি পরে ‘পরশপাথর’-এর ইচ্ছেডানা
অরূপরতন চক্রবর্তী

নব্বইয়ের দশকের কলকাতাকে যদি শব্দ দিয়ে মনে করতে হয়, সেই শব্দের ভেতর অবশ্যই থাকবে গিটার, বেস, ড্রাম আর বাঁশির সুর। মহীনের ঘোড়াগুলির উত্তরাধিকার, কবীর সুমন-নচিকেতা-অঞ্জন দত্ত-শিলাজিতের নাগরিক গান, আর ওপার বাংলার ফিডব্যাক, এলআরবি, মাইলস্-এর রক-ঝড়—সব মিলিয়ে তখন বাংলার সঙ্গীতভুবনে তৈরি হয়েছিল এক আশ্চর্য সময়। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির কলেজ ফেস্ট, পুজোর অনুষ্ঠান, পাড়ার মঞ্চ থেকে নব্বইয়ের নজরুল মঞ্চের ওপেন-এয়ার থিয়েটার—সর্বত্রই নতুন বাংলা ব্যান্ডের জয়জয়কার। সেই ঢেউয়ের অন্যতম উজ্জ্বল নাম অবশ্যই পরশপাথর।
পরশপাথরের জন্ম সেই উত্তাল সময়েই। অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনায় বাংলা ভাষায় মৌলিক গান, তার সঙ্গে রক অ্যারেঞ্জমেন্ট—এই ছিল মূল আকাঙ্ক্ষা। কিংশুক চক্রবর্তী (পিকলু), অনিন্দ্য বসু, অনির্বাণ ‘পটলা’ সেনগুপ্ত, প্রমিত, দই এবং অমর্ত্য ‘বোবো’ রাউথকে নিয়ে গড়ে ওঠে প্রথম পর্বের দল। পরে ব্যান্ডের স্থায়ী লাইন-আপে যোগ দেন রাজা নারায়ণ দেব, সমিধ মুখোপাধ্যায়, ঋষি চন্দা, বাঁশিবাদক নির্মাল্য ‘হামটু’ দে এবং সঞ্জয়। এই সময়েই পরশপাথরের নিজস্ব সাউন্ড আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। IIT খড়্গপুরের Springfest-এর Wildfire রক প্রতিযোগিতায় জয় তাদের সেই যাত্রাকে আরও দৃঢ় করে।
তারপর একের পর এক গান। ‘ভালবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি’, ‘বন্ধু’, ‘সুজন’, ‘এক ঝাঁক ইচ্ছে ডানা’, ‘পদ্মা’, ‘প্রহরী’, ‘মেঘের বউ’—শুধু গান নয়, এক প্রজন্মের কৈশোর ও তারুণ্যের সাউন্ডট্র্যাক। ১৯৯৮-এর ‘প্রিয় বন্ধু’-তে অঞ্জন দত্তের সঙ্গে তাদের কাজ বিশেষ স্মরণীয় হয়ে থাকে; শ্রুতিনাটক, প্রেম, চিঠি আর পরশপাথরের গান মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক আলাদা সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
কিন্তু জনপ্রিয়তা সবসময় জীবনধারণের নিশ্চয়তা দেয় না। সংবাদমাধ্যমকে অয়ন জানিয়েছিলেন, তখন ব্যান্ডের যথেষ্ট অনুষ্ঠান হলেও উপার্জন দিয়ে সংসার চালানো সহজ ছিল না। সদস্যরা নিজেদের পেশাগত জীবনে ছড়িয়ে পড়েন; কেউ কলকাতার বাইরে কাজের সন্ধানে যান। ফলে ধীরে ধীরে থেমে যায় পরশপাথরের পথচলা। অয়ন যে কথাটি বলেছেন—‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’—তার মধ্যেই যেন সেই সময়ের বাংলা ব্যান্ডের বাস্তবতাও ধরা পড়ে।
দুই দশক পরে অবশ্য গল্প বদলেছে। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে পরশপাথরের প্রত্যাবর্তনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরনো শ্রোতাদের মধ্যে তৈরি হয় তীব্র উন্মাদনা। সম্ভবত অয়ন, ঋষি, চিরদীপ, কিংশুক, হামটু ও রাজা ফিরেছেন; সঙ্গে রয়েছেন কি-বোর্ডে বুটি এবং বেসে বাচস্পতি। কয়েকটি গানে সমিধও বাজিয়েছেন।
আর সেই প্রত্যাবর্তনের মঞ্চে বোঝা গেল, এই অপেক্ষা শুধু কয়েকজন পুরনো রক-সঙ্গীতশিল্পীর জন্য ছিল না; অপেক্ষা ছিল একটি প্রজন্মের নিজের যৌবনের কাছে ফিরে যাওয়ার। কেসিসির সেই রাতে, বহু মধ্যবয়স্ক শ্রোতা—কারও পাকধরা চুল, কারও বদলে যাওয়া শরীর—২০ বছর আগের তরুণটিকে যেন আবার খুঁজে পেলেন। ‘ছাদে রাখা টবের সারি’ দিয়ে শুরু হয়ে ‘ভালবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি’, ‘বন্ধু’, ‘সুজন’, ‘আজও আছে’, ‘পদ্মা’ পেরিয়ে যখন শেষ হল ‘ইচ্ছেডানা’-য়, তখন nostalgia আর নিছক স্মৃতি রইল না; তা হয়ে উঠল জীবন্ত মঞ্চ-অভিজ্ঞতা।
পরশপাথরের কামব্যাক তাই শুধু একটি ব্যান্ডের পুনর্মিলন নয়। এটি বাংলা ব্যান্ডের সেই সময়টিরও ফিরে দেখা—যে সময়ে গান মানে ছিল ক্যাসেট, কলেজ ফেস্ট, বন্ধুদের আড্ডা, গিটার হাতে স্বপ্ন দেখা, আর নজরুল মঞ্চের রাত। আজকের রিল-সংস্কৃতির দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে সেই গানগুলো এখনও যদি মানুষকে টানে, তার কারণ হয়তো সুরের চেয়েও বড় কিছু: তারা এক প্রজন্মের স্মৃতির অংশ।
বিশ বছর পরে পরশপাথর আবার মঞ্চে। আর সেই ইচ্ছেডানা, এতদিন পরে, আবারও উড়ছে। Kriti ও Fableworks অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে। গত কয়েক বছর ধরেই Kriti আমাদের প্রিয় শিল্পীদের নিয়ে ধারাবাহিক ভালো ভালো অনুষ্ঠান করে চলেছে ।
অনুষ্ঠানের টিকিটের জন্য নীচের লিংক ও নম্বরে কানেক্ট করুন-
Tickets at www.kriti-events.com
Enquiries 82406 26725