কিয়েসলস্কি থেকে তারকোভস্কি: কলকাতার সিনেমাপ্রেম আর KIFF-এর ৩২ বছর
অরূপরতন চক্রবর্তী

মেঘে ঢাকা বিকেল, নন্দনের লাইন, হাতে ফেস্টিভ্যালের ক্যাটালগ—আর অচেনা এক ছবির মধ্যে হঠাৎ নিজের পৃথিবীকে খুঁজে পাওয়া। কলকাতার সঙ্গে চলচ্চিত্র উৎসবের সম্পর্কটা নিছক উৎসবের নয়। এর মধ্যে আছে দীর্ঘদিনের অভ্যাস, কৌতূহল, আবিষ্কারের নেশা—আর সবচেয়ে বেশি আছে সিনেমাকে ভালোবাসার এক অদ্ভুত এক আবেগপ্রবণ ক্ষমতা। ১৯৯৫ সালে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও শহরের আন্তর্জাতিক সিনেমার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তার অনেক পুরোনো।
তখনও আজকের মতো KIFF-কে ঘিরে উন্মাদনা তৈরি হয়নি। তার একটা ঐতিহাসিক কারণও আছে। ১৯৫২ সালেই শুরু হয়েছিল International Film Festival of India (IFFI)। প্রথম দিকে তা মূলত দিল্লিকেন্দ্রিক হলেও পরে দেশের বিভিন্ন শহরে ঘুরেছে। এখন তার স্থায়ী ঠিকানা গোয়া। কলকাতাতেও IFFI বা তার বিশেষ আয়োজন হয়েছিল তিন বার—১৯৮২ সালের ‘ফিল্মোৎসব’, ১৯৯০ এবং ১৯৯৪ সালে যথাক্রমে।
৯৪-এর আয়োজনটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। কলকাতায় নিজের ছবির রেট্রোস্পেকটিভে হাজির হয়েছিলেন মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি। তাঁর মতো একজন বিশ্ববরেণ্য পরিচালকের সামনে বসে তাঁর ছবি দেখা—আজকের ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের যুগে বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, তখন তা ছিল প্রায় এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা!
তারও আগে শহরে ছিল ফিল্ম সোসাইটির আন্দোলন। বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেই সব ছোট ঘর, প্রেক্ষাগৃহ, আলোচনা সভা—সব মিলিয়েই কলকাতার এক বিশেষ সিনেমা-সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। সেই সংস্কৃতিরই বৃহত্তর, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বলা যায় কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালকে।
ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল মানেই আবিষ্কার
১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল দীর্ঘদিন শুধু ‘কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ নামেই পরিচিত ছিল। ২০১২তে, ১৮তম বর্ষে, নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল’। সেই বছর থিম ছিল ‘Africa (Now and Then)’। উদ্বোধনী ছবি ছিল ইরানি পরিচালক আসগর ফারহাদির Jodaeiye Nader az Simin (A Separation)।
প্রথম উৎসবের উদ্বোধনী ছবি ছিল দেব বেনেগালের English, August। রেট্রোস্পেকটিভে ছিল আকিরা কুরোসাওয়ার ১০টি ছবি, জ্যাঁ রেনোয়া এবং মার্তা মেসারোসের দুটি করে ছবি। উত্তমকুমারের ২০টি ছবিও ছিল সেই আয়োজনের অংশ। ‘হোমেজ’ বিভাগে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল সলিল চৌধুরীকে।
তবে, একটি চলচ্চিত্র উৎসবের আসল আকর্ষণ শুধু তালিকায় থাকা নামগুলিতে নয়। বরং সেই মুহূর্তে, যখন অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে আপনি এমন একটি ছবি দেখতে শুরু করলেন, যার পরিচালককে আগে কখনও দেখেননি, নামও শোনেননি—আর ছবি শেষ হওয়ার পর মনে হল, এই মানুষটির সিনেমা আমাকে আরও দেখতে হবে। এই ‘আবিষ্কার’-এর আনন্দটাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রাণ।

কিয়েসলস্কি, তারকোভস্কি এবং আমাদের সিনেমার প্রেম
একটা সময় ছিল, কলকাতার সিনেমাপাগল দর্শকের কাছে কিয়েসলস্কি, তারকোভস্কি, বেলা তার, বার্গম্যান কিংবা কুরোসাওয়ার নাম উচ্চারণ করলেই আলাদা একটা উত্তেজনা তৈরি হত।
এঁরা শুধু পরিচালক ছিলেন না; আমাদের সিনেমা দেখার চোখটাই বদলে দিয়েছিলেন তাঁরা।
একটি ছবির গল্প শেষ হয়ে গেলেই সিনেমা শেষ হয় না—তার ভিতরে থাকা নীরবতা, সময়, আলো, ফ্রেম, মানুষের একাকিত্ব, রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়েও যে সিনেমা কথা বলতে পারে, আন্তর্জাতিক ও সমান্তরাল ধারার ছবিগুলি আমাদের তা শিখিয়েছে।
একসময় ফেস্টিভ্যালের সবচেয়ে বড় উত্তেজনাই ছিল—গোদার, বুনওয়েলের পাশাপাশি কোন নতুন পরিচালককে আবিষ্কার করব? কোন ‘মাস্টার’-এর ছবি দেখব?
আজ সেই উন্মাদনা কিছুটা কমেছে। দর্শকের ধৈর্যও বদলেছে। দু’ঘণ্টার বেশি ছবি দেখলেই অনেকের অস্বস্তি হয়। তারকোভস্কি বা বেলা তারের দীর্ঘ, ধীর, ধৈর্য দাবি করা সিনেমা দেখার জন্য আজকের দর্শকের সময় কোথায়?
তবু সিনেমার এই ভাষা হারিয়ে যায়নি। কারণ এখনও এমন কিছু দর্শক আছেন, যাঁরা ছবির শেষে হল থেকে বেরিয়ে আলোচনায় বসতে চান। একটা দৃশ্য কেন এমন ছিল, পরিচালক কেন এত দীর্ঘ শট রাখলেন, কিংবা কোনও সংলাপ না থাকা সত্ত্বেও একটি দৃশ্য এত কথা বলল কীভাবে—এসব নিয়ে ভাবতে চান।
সিনেমা শুধু দেখা নয়, বোঝাও
চলচ্চিত্র উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। ছবি দেখার পাশাপাশি থাকে আলোচনা, মতবিনিময়, মাস্টারক্লাস, একাডেমিক সেশন, প্রেস মিট, ওয়ার্কশপ।
একজন পরিচালকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ কখনও কখনও তাঁর ছবির চেয়েও বেশি কিছু বুঝিয়ে দেয়। আবার কোনও আলোচনায় অন্য একজন দর্শকের ব্যাখ্যা শুনে একই ছবিকে নতুন করে দেখা যায়।
এই পারস্পরিক বিনিময়ই উৎসবকে সাধারণ সিনেমা প্রদর্শনের জায়গা থেকে আলাদা করে।
অবশ্য সময়ের সঙ্গে KIFF-এর দর্শকও বদলেছে। একসময় মূলত চলচ্চিত্রপ্রেমী ও ফিল্ম সোসাইটির দর্শকই উৎসবের প্রধান অংশ ছিলেন। পরে সাধারণ দর্শককে আরও বেশি করে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। সেটিও জরুরি। কারণ সিনেমা যদি শুধু বিশেষজ্ঞদের ঘরে বন্দি থাকে, তার প্রাণশক্তি কমে যায়।
তবু আন্তর্জাতিক ও সমান্তরাল সিনেমার জন্য একটা নির্দিষ্ট, নিবেদিত দর্শক সবসময় প্রয়োজন। এমন দর্শক, যিনি জনপ্রিয় ছবির পাশাপাশি অচেনা দেশের অচেনা পরিচালকের ছবির সামনে বসতেও রাজি।

কলকাতা, KIFF এবং সেই পুরোনো অপেক্ষা
বছরের পর বছর কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এসেছেন পল কক্স, ফার্নান্দো সোলানাস, পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, নুরি বিলগে জিলান, মারিয়ান হ্যানসেল, আমোস গিতাই, মিগেল লিতিন, জাফর পানাহি, মাজিদ মাজিদির মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব।
প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি করে সিনেমার পৃথিবী। আর কলকাতার দর্শক সেই পৃথিবীগুলির দরজা খুলে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
তাই KIFF শুধুই আট দিনের একটি উৎসব নয়। এটি কলকাতার সিনেমা-স্মৃতির অংশ। নন্দনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা, শেষ শো ধরতে দৌড়নো, পছন্দের ছবির টিকিট না পাওয়া, কোনও অচেনা ছবির সামনে গিয়ে বসা, বেরিয়ে এসে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করা—এইসব ছোট ছোট মুহূর্ত দিয়েই তৈরি হয়েছে শহরের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতি।
এ বছর ৩২তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। ১৬ থেকে ২৩ ডিসেম্বর উৎসব চলবে। সম্প্রতি নন্দনে এক অনুষ্ঠানে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় KIFF ২০২৬-এর তারিখ ঘোষণা করেছেন।
আবার হয়তো নন্দনের সামনে লাইন পড়বে। আবার কোনও অচেনা পরিচালকের ছবি দেখতে ঢুকব আমরা। হয়তো ছবিটি ভালো লাগবে না। হয়তো মাঝপথে মনে হবে—এ কী দেখছি!
কিন্তু হয়তো কোনও একটি ছবি শেষ হওয়ার পর মনে হবে—এই ছবিটা না দেখলে জীবনটা একটু অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
চলচ্চিত্র উৎসবের আসল সার্থকতা বোধহয় সেখানেই।
কারণ সিনেমা শুধু বিনোদন নয়। সিনেমা কখনও জানালা, কখনও আয়না, কখনও প্রশ্ন।
আর কলকাতা—এই শহরটি বরাবরই অচেনা জানালা খুলে ভিতরে তাকাতে ভালোবাসে।
