প্রয়াত ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার: ইতিহাসচর্চায় এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের অবসান
অরূপরতন চক্রবর্তী
প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার। বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। বৃহস্পতিবার দিল্লির বাসভবনে বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। ইতিহাসবিদ ও পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গৌরী অরুণিমা সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে এই খবর জানিয়েছেন। ঔপনিবেশিকতা, জাতীয়তাবাদ ও গণআন্দোলনের ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার আলোয় দেখেছিলেন তিনি।
অরুণিমা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন সুমিত সরকার। গত কয়েকদিন ধরে বয়সজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন। বছরখানেক আগে, পড়ে গিয়ে চোট পাওয়ার পর থেকেই তিনি জনসমক্ষে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না।
সুমিত সরকার রেখে গেলেন স্ত্রী, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ তনিকা সরকার এবং পুত্র আদিত্য সরকারকে।
ইতিহাসের পরিবারে জন্ম তাঁর
১৯৩৯ সালে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকারের পরিবারে জন্ম সুমিত সরকারের। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন করেন।
শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের সূচনা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে [ Calcutta University ] লেকচারার এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার হিসেবে কাজ করার পর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে [ Delhi University ] ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা করেন। ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পর্বেই তাঁর প্রভাব আরও সুদৃঢ় হয়।
স্বদেশি আন্দোলন থেকে সামাজিক ইতিহাস
সুমিত সরকারের গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল ঔপনিবেশিক ভারত, জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা আন্দোলন। তবে তাঁর ইতিহাসচর্চার বিশেষত্ব ছিল—স্বাধীনতার ইতিহাসকে শুধুমাত্র গান্ধী, নেহরু বা অন্যান্য জাতীয় নেতার কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি, কৃষক ও গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখা।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে The Swadeshi Movement in Bengal, Modern India: 1885–1947 এবং Writing Social History। এই বইগুলির মাধ্যমে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রচলিত নেতা-কেন্দ্রিক ব্যাখ্যাকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান।
মার্কসবাদী ইতিহাসচর্চার সঙ্গে যুক্ত সুমিত সরকার ছিলেন Subaltern Studies Collective-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। পরবর্তী সময়ে অবশ্য এই ইতিহাসচর্চার কিছু প্রবণতারও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর গবেষণায় শ্রেণি, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক চেতনা এবং সাধারণ মানুষের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
পুরস্কার ফিরিয়ে প্রতিবাদ
ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন সুমিত সরকার। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৩ সালে তিনি Indian History and Culture Society-এর Sarit Chatterjee Memorial Award পান।
এর পরের বছর তাঁর Writing Social History বইয়ের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় রবীন্দ্র পুরস্কার। কিন্তু ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সিপিআই(এম)-নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারের কৃষকদের প্রতি আচরণের প্রতিবাদে তিনি সেই পুরস্কার ফিরিয়ে দেন।
তাঁর এই সিদ্ধান্ত দেখিয়ে দিয়েছিল, ইতিহাসবিদ হিসেবে অতীতকে বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির প্রশ্নেও তিনি ছিলেন গভীরভাবে সচেতন।
সুমিত সরকারের প্রয়াণে ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হল। ঔপনিবেশিক ভারত, জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেখার যে ইতিহাসচর্চার ধারা তিনি শক্তিশালী করেছিলেন, তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি আগামী প্রজন্মের ইতিহাসবিদদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।