একাডেমিতে অঞ্জন: স্মৃতির সরণী ধরে গান-থিয়েটারের এক অনিবার্য সমাপতন
সৌম্যা ঘোষ

একদিন বৃষ্টিতে নামে অঞ্জন দত্ত-র গানটি একাধিক প্রজন্মের প্রেমের থিম সং। আর সেই একই গানের নামে অনুষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছিল ৭ অগস্ট অঞ্জন দত্ত-র কনসার্টের। বর্ষাকাল বলে কথা! এদিকে, এ দিনের একাডেমিতে লোকের গিজগিজ ভরপুর। নানা বয়সী অঞ্জন-পাগল ভক্তরা ছিলেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে…
একাডেমিতে অঞ্জনের গান এই প্রথম। এর বহু বছর আগে অবশ্য প্রথম দিকের থিয়েটার করেছেন অঞ্জন এই হলে। আর তার অভিজ্ঞতাট ছিল ভয়াবহ! সে কথায় পড়ে আসছি। আপাতত অঞ্জনের গান…
অনুষ্ঠানের শুরুতেই অঞ্জন গাইলেন ‘আমার জানলা দিয়ে’। সেই চিরচেনা ও চির নতুন স্বর। ৭৩ চলছে অঞ্জনের। অথচ কে বলবে! নয়ের দশকের সেই পাগলাটে যুবকই যেন আজও তিনি! সেই নাগরিক একাকীত্ব আর বিষণ্ণ কলকাতা শহর ঘুরে এলো তাঁর গানে…
সেই শহরে পাওয়া উদ্ভট-পাগলাটে-অদ্ভুত কিছু প্রান্তিক মানুষও যেমন এলেন…

নতুন গানও গাইলেন অঞ্জন। সে গানে যেমন আছেন তাঁর শিক্ষক বাদল সরকার, তেমনই আছেন সোমনাথ নামের এক যুবক, যে আত্মহত্যা করতে যাওয়ার ঠিক আগে শরতকালের আলো দেখে ফেলে, তারপর আর সে আত্মহত্যা করে না। বাঁচার কথা ভাবে।
আর, নাট্যগুরু বাদল সরকারকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে একটি ছবিও তৈরি করেছেন অঞ্জন। আর সেই ছবিরই জন্য লেখা নতুন গানটি।
অনুষ্ঠানের ভিড়েই আলাপ হলো অঞ্জনের দীর্ঘদিনের থিয়েটারের বন্ধু পলাশরঞ্জন ভৌমিকের সঙ্গে। অঞ্জনের থিয়েটারের পুরোনো গল্প বলছিলেন তিনি। জানালেন, ‘গত সন্ধ্যায়, আমি পুরোপুরি আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম। গত ৪৫ বছরের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো একটু হলেও, ফিরে পেলাম…’
আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সঙ্গে পলাশ রঞ্জনবাবুর জড়িয়ে রয়েছে এক অন্য আবেগ। যৌবনে নাটকের সাথে জড়িয়ে ছিলেন তিনিও। সেভাবেই আলাপ হয় অঞ্জনের সাথে। বলছিলেন, অঞ্জন আমাদের নাটক দেখতে এসেছিল একবার। তারপর বলল, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে নাটক করবে?’ এরপরেই শুরু হল ওঁর সাথে এক অন্য জার্নি…
পরে, বাদলদা আসতেন আমাদের নাটক দেখতে। পরবর্তী পর্যায়ে সবাই আসতেন মৃণালদা আসতেন। অঞ্জন দার থিয়েটার দলের নাম ছিল ‘ওপেন থিয়েটার’।
পলাশরঞ্জনবাবু বলছিলেন, অঞ্জনের পরিচালনায় ‘মারা সাদ’ ১৯৮১ সালে অভিনীত হয়।
ম্যাক্স ম্যুলার ভবনে। আর,
১৯৭৮ সালের শেষের দিকে ‘আন্তিগোনে’ নাটকে যোগদান করতে পারাটা আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
এরপর ১৯৮১ সালে অঞ্জনদার সঙ্গে ‘মারা সাদ’ এ অভিনয় করা।
আমি হেরাল্ড এর চরিত্রে অভিনয় করতাম।
একটা সিনে পাঁচ ছয়টা চরিত্রে অভিনয় করেছি…
গান গাইতাম সারা স্টেজে নেচে নেচে। আর একাডেমিতে ইম্প্রোভাইসড করতে গিয়ে একটা সিনের ফাঁকে উঠে গেছি দোতলায়।
দোতলার থেকে ঝাঁপ দিয়ে নীচে নেমে দৌড়াতে দৌড়াতে গান গেয়ে স্টেজে উঠি। ওটা ১২ ফুট উঁচু।
এটা ফ্যানে ভর দিয়ে লাফ দিয়ে অন্ধকারে নেমেছিলাম।
আজ ৪৫ বছর পর সেই হলে এলাম। আর আজ সেই আমার ১২ ইঞ্চি উচ্চতার সিঁড়ি দিয়ে নামতে কষ্ট হল।…
অঞ্জনদার গান,
তাও আবার একাডেমিতে,
মিস করা যায়?
দোতলাটা আমায়
বেজায় টানলো!

কেমন ছিল মারা/সাদ-এর মঞ্চায়ন? পলাশবাবু জানালেন, নাটকটির ব্যাকগ্রাউন্ডটা ছিল অভিনব। একটা পাগলাগারদের বাথরুম, বিশাল একটা ডরমিটরির মতো বাথরুমের মধ্যেই নাটকটা ঘটেছিল। ভীষণ কঠিন নাটক। এবং আমার ডান্স থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল তাই,
আমার অভিনয়টা করতে সুবিধে হয়েছিল…
আমাদের সেই উত্তর আধুনিক প্রযোজনা সময়ের থেকে এগিয়ে ছিল আসলে। তাই নানা অজুহাতে তা বন্ধ করেও দিতে হয়। কিন্তু বিভাস চক্রবর্তীরা পরে আমাদের সমর্থনও করেন।
আজ, এত বছর পর এই আকাদেমিতেই সেই সব স্মৃতির সমাপতন হলো।
অঞ্জনের সঙ্গীতানুষ্ঠান মানেই দর্শকরা জানেন সেই আবহে থাকবে গান-কথা। অল্প কথায় কখনও সিরিয়াসনেসকে ভেঙে দেওয়া। আবার, কখনও সময়ের বাস্তবতাকে গানে ধরে দেওয়া। অঞ্জন স্পষ্ট জানালেন, সময়টা খারাপ ছিল। কিন্তু, আরও খারাপ হতে চলেছে।
বর্তমান সমাজচিত্র-সময়-পরিস্থিতি নিয়ে বাঁধা এইসব গানে দর্শকও গলা মেলালেন। হেরে যাওয়া নয়, উঠে দাঁড়াতে সবাইকেই হয়। অঞ্জন বললেন যেমন, ‘হ্যাঁ সম্ভব’। অর্থাৎ, এই পচা সময়েও বদল সম্ভব।
আর, শেষে, না বললেই নয়, ডি-ট্রায়োর বাকি দুই দত্ত অমিত আর নীলের কথা। কে না জানে, তাঁরা ছাড়া অঞ্জন পূর্ণ না। এ দিনও একই কথা মনে হলো, গানগুলো যত এগোতে থাকল…
থিয়েটার, অঞ্জন, বর্ষা— সব মিলে মনে থেকে যাবে এই অনুষ্ঠান, কোথাও যেন অন্য অনুষ্ঠানের থেকে একটু হলেও যেন আলাদা, অঞ্জনের গান সিনেমা নাটকের মতোই…